”কয়েকটা ব্যাপারের উপর তা নির্ভর করছে।”
কথাটা শুনেই কাম্বাট্টা সিধে হয়ে বসল। তীক্ষ্ন চাহনি আরও তীক্ষ্ন হল।
”কী রকম?”
”বিরুদ্ধ দলের মনোবল কেমন, ম্যাচের পরিস্থিতি তখন কী পর্যায়ে, আমার দলের মনোবল কেমন, প্রত্যেকটা সুযোগ নেওয়া হচ্ছে কি না, তা ছাড়া উইকেট আর আবহাওয়াও হঠাৎ চরিত্র—বদল করে ফেলতে পারে। সব থেকে বড় কথা আমার মানসিক আর শারীরিক অবস্থা সেই সময় কেমন থাকবে তার উপর পারফরম্যানস নির্ভর করবে।”
”তুমি জামশেদপুরে এগুলো পেয়েছিলে?”
অনন্ত উত্তর দিতে গিয়ে থমকে গেল। ভ্রমরার মুখটা চোখে ঝলসে উঠল। কিন্তু দ্রুত সেটা সরে গিয়ে সেখানে এসে গেল একটা কাটা হাত। কানে ফিসফিস শুনতে পেল, ‘অন্তু, অন্তু, আমি তোমাকে খুব বড় মনে করি। আমার বন্ধু বলে সেজন্য গর্বও হচ্ছে।’
”হ্যাঁ পেয়েছিলাম।”
”এখন তোমার শরীর?”
”পারফেক্ট কন্ডিশনে….পায়ের আঙুল থেকে চুল পর্যন্ত।”
কলিংবেল বাজল।
”কাম ইন।” কাম্বাট্টা দরজার দিকে তাকাল। টিম ম্যানেজার রাকেশ খান্না, লোকাল ম্যানেজার রঘু রাও ঘরে ঢুকল। কাম্বাট্টা অনন্তর সঙ্গে তাদের পরিচয় করিয়ে দিয়ে বলল, ”আমার মনে হয় শুধু লটন, ব্রাইট বা অ্যামরোজের কথা ভাবলেই আমাদের সমস্যা মিটবে না, কিছু সমস্যা অস্ট্রেলিয়াকেও দিতে হবে…সেন তুমি এখন যেতে পার। নিশ্চয় দশটার মধ্যেই বিছানা নেওয়া তোমার অভ্যাস।”
অনন্ত মাথা নেড়ে, সবাইকে বাও করে ঘর থেকে বেরোল। ডিনারের জন্য হোটেলের রেস্তরাঁয় যাবার সময় তার খটকা লাগল। অস্ট্রেলিয়ার জন্য সমস্যা দেওয়া সেটা কী ব্যাপার? সেই সমস্যাটা কি অনন্ত সেন? তা হলে কি সে টিমে আসছে? তবে কি সে টেস্ট খেলছে!
।। চোদ্দ ।।
জীবন তার হোটেলে চেক—ইন করেই চলে এসেছে ওয়েস্ট এন্ড—এ। অনন্তর কাছ থেকে টিকিটটা নিয়ে সে জিজ্ঞেস করল, ”আগে কখনও এখানে আসিনি। ভাল জায়গায় সিট তো?”
”ড্রেসিংরুম থেকে বেরিয়ে প্লেয়ারদের বসার জায়গা, তার বাঁ দিকে লম্বা লম্বা দশ—বারোটা সারি, সেখানে তোর সিট। ইডেনের মতো ব্যবস্থা নয়। ইচ্ছে করলে ড্রেসিংরুমেও যে কেউ চলে আসতে পারে। দোতলা থেকে একটা সরু সিঁড়ি সোজা মাঠে নেমে গেছে। সিঁড়ির পাশেই প্রেস এনক্লোজার।”
”কী বুঝছিস? কাল ফাইনাল টিম সিলেকশন, না আজ রাতেই?”
বাথরুমের দরজা খোলা। থুবিয়ে থুবিয়ে সাবান কাচার শব্দ আসছে। আনোখার ছোটবেলার অভ্যাস, নিজের কতকগুলো ছোটখাট ব্যবহারের জিনিস নিজে কাচা। রুমাল, সোয়েট—ব্যান্ড, মোজা, গেঞ্জি, জাঙ্গিয়া ইত্যাদি সে হোটেলের লন্ড্রিতে দেয় না। এসব নিজে হাতে না কাচলে সে নাকি স্বস্তি পায় না! তাই সে কয়েকটা জিনিস এখন সাবান দিয়ে কাচছে। কেচে, ঘরে পাখার নীচে চেয়ার—টেবিলের উপর মেলে দেবে।
জীবনের কথা শুনতে পেয়ে আনোখা বাথরুম থেকে চেঁচিয়ে বলল, ”সিলেকশন মিটিং এখন ম্যানেজারের ঘরে চলছে। আমার লোক ফিট করা আছে, প্রথম এগারোজনের নাম আমি আজই পেয়ে যাব।”
জীবন বাথরুমের দরজার কাছে গেল। শর্টস পরে, খালি গায়ে উবু হয়ে বসে আনোখা কাচছে। সাদা পাথরের মেঝেয় সাবানের ফেনা ছড়িয়ে। জীবন বলল, ”তা হলে আমি একটু বসেই যাই। তোমার লোক পাকা খবর দেবে তো?”
”ম্যানেজার খান্নাই তো আমার লোক। জীবন, তুমি ঘাবড়াচ্ছ কেন, সেন টিমে থাকবেই। এই দু’দিন নেটে স্কিপার ওকে যেভাবে খাটাচ্ছিল, ওর ওপর স্পেশাল নজর দিচ্ছিল, তাতে আমরা ধরেই নিয়েছি সেন আসছে।”
”যদি অন্তু টিমে আসে তোমাকে আমি কলকাতার যে রাবড়ি খাইয়েছি সেই শর্মার রাবড়ি, কিনে পাঠাব।”
”কতটা?”
”এক কিলো, দু’কিলো…।”
”তা হলে আজ রাতেই কলকাতায় ট্রাঙ্ককল করে এক কিলো রাবড়ি বুক করো। কালকের ফ্লাইটেই যেন পৌঁছয়।”
হালকা চালে কথা বলছে আনোখা। ঘরে টেলিফোন বেজে উঠল। অনন্ত ফোন ধরে চেঁচিয়ে বলল, ”আনোখা, ফোন।”
স্প্রিংয়ের মতো লাফিয়ে উঠে আনোখা ছুটে এসে ফোন ধরল।
”হ্যাঁ—হ্যাঁ, আমি এখনই আসছি।”
রিসিভার রেখে সে পরার জন্য প্যান্ট খুঁজতে চারধারে তাকাল। অনন্তর সোয়েট—সুটটা হাতের কাছেই। সেটাই দ্রুত পায়ে গলাতে গলাতে বলল, ”খান্নাসাব ডেকেছেন ওর ঘরে।”
আনোখা বেরিয়ে যেতে অনন্ত ও জীবন পরস্পরের মুখের দিকে অস্থির চোখে তাকাল।
”অন্তু আমি নার্ভাস ফিল করছি।”
”আমিও।”
আনোখার খাটের উপর টু—ইন—ওয়ানটা পড়ে রয়েছে। অনন্ত সেটা তুলে নিয়ে ক্যাসেট—প্লেয়ারের বোতাম টিপল। রক সঙ্গীতের চিৎকার আর ধূমধাম ড্রাম ও ঢাউস খত্তালের শব্দে ঘর ভরে উঠল। অনন্ত একদমই পছন্দ করে না এইসব গান। কিন্তু এই মুহূর্তে তার উত্তেজিত স্নায়ুতে এই শব্দের আঘাত যেন ভালই লাগছে।
জীবন ঘড়ি দেখল। অনন্ত দরজার দিকে মুখ ফেরাল।
”কখন ফিরবে?”
”কী জানি।”
”যদি ফিরে এসে বলে তোর নাম নেই?”
”নেই তো নেই! তাতে কি আমি মরে যাব?”
”আজ যেন বড্ড গরম, তুই ঘামছিস।”
”এ সি চলছে।”
”একটু বাড়িয়ে দে।”
অনন্ত উঠে গিয়ে এয়ার—কুলারের রেগুলেটার বাড়িয়ে দিল।
”অন্তু তুই ঘামছিস, মুখে জল দিয়ে আয়।”
”ঠিক আছে।”
”না না, যা বলছি শোন। মুখে—চোখে জলের ছিটে দে। ঠাণ্ডা হবে শরীর।”
অনিচ্ছা সত্ত্বেও অনন্ত হাওয়াই চটিটা পায়ে গলিয়ে বাথরুমের দিকে এগোল। সে বাথরুমে ঢুকেছে আর সেই সময়েই ঘরের দরজা দড়াম করে খুলে গেল। আনোখা দাঁড়িয়ে। জীবন ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকল তার দিকে।
