রিপোর্টার চলে যাবার পর অন্তু, বলে, ”লোক বুঝে কথা বলবি। এখন ভারতে কম করে পাঁচ কোটি ক্রিকেট—পণ্ডিত রয়েছে যারা কখনও ব্যাটে বলে হাত দেয়নি। ইনি তাদেরই একজন। কাগজে এখন তোর সম্পর্কে যা বেরোবে একদম পড়বি না। প্রেসার বেড়ে যাবে।…শোন, আমি কিন্তু বাঙ্গালোর যাচ্ছি, খেলার আগের দিন পৌঁছব। হোটেল রামায় ঘর বুক করেছি। মাঠের কাছেই। তোরা তো থাকবি ফাইভ স্টার ওয়েস্ট এন্ড হোটেলে। আমার জন্য একটা টিকিট রাখবি, তোর হোটেলে গিয়ে নিয়ে নেব।”
।। তেরো ।।
অনন্তর প্লেন বাঙ্গালোরে নামল ঝিরঝির বৃষ্টির মধ্যে। এই ‘বাগান—শহরে’ তার দ্বিতীয়বার আসা। শুনেছে পরিচ্ছন্ন, সুশ্রী, প্রচুর গাছ আছে। ভারতের নামকরা যন্ত্রপাতির বড় বড় অনেক কারখানা এখানেই। প্লেন থেকে শুরু করে ঘড়ি—ওই সব কারখানায় তৈরি হয়। প্রায় ২৫ লক্ষ লোকের এই শহরের আসল নাম বেঙ্গলুর, সাহেবরা নামটা বদলে বাঙ্গালোর করে দিয়েছে। প্রায় পাঁচশো বছর আগে কাম্পে গৌড়া নামে এক রাজা শহরের পত্তন করেন।
এয়ারপোর্টে কর্ণাটক ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনের লোক ছিল। অনন্তকে তারাই হোটেলে নিয়ে যায়। যাবার পথে কৌতূহলী অনন্ত আবার দেখে নিল স্টেডিয়াম, কার্জন পার্ক, বিধান সৌধ, রাজভবন।
হোটেলের দোতলায় তার ঘর। রিসেপশনিস্ট জানিয়ে দিল তার রুমমেট দেশরাজ আনোখা। কিন্তু সে আসবে কাল দুপুরে দিল্লি থেকে। আবার দুজনে একসঙ্গে। দুজনেই পেস বোলার, তাই একসঙ্গে থাকার ব্যবস্থা, যাতে দুজনের মধ্যে ভাব জমে ‘সমঝওতা’ গড়ে ওঠে। এটা সব ক্রিকেট দলই করে। ওপেনিং ব্যাটসম্যানরা একই ঘরে থাকে, স্পিনাররাও তাই। শুধু অধিনায়ক আর ম্যানেজার আলাদা ঘর পায়।
কাম্বাট্টা দুপুরেই এসেছে। অনন্তর মনে হল ওর সঙ্গে সৌজন্যমূলক দেখা করে নিজেকে পরিচিত করিয়ে নেওয়া উচিত। কাম্বাট্টাকে সে শুধু ছবিতেই দেখেছে। দাড়িওলা, মাঝারি গড়নের লোক। চোখ ঈষৎ কটা এবং সন্ধিগ্ধ চাহনি। বাইশ টেস্টে একটি সেঞ্চুরি, ১,০৭২ রান, গড় প্রায় ৩০। আর রঞ্জি ট্রফিতে এখন ১৮ সেঞ্চুরি, ৫২১০ রান, গড় ৫৪। গত মরসুমে চারটি সেঞ্চুরি ও ৬১৯ রান আট ইনিংসে। এই মরসুমে রঞ্জিতে গত সপ্তাহে তৃতীয় সেঞ্চুরিটি পেয়েছে। এখন কাম্বাট্টা দারুণ ফর্মে রয়েছে।
কাম্বাট্টা সম্পর্কে সে শুনেছে, গম্ভীর, কম কথার মানুষ, ডিসিপ্লিনের ব্যাপারে অত্যন্ত কঠোর। চক্রান্ত করেই বোর্ডের তখনকার একটা উপদল আর অধিনায়ক মৃদুল শর্মা, এখন যে একজন নির্বাচক, তাকে টেস্ট খেলা থেকে হটিয়ে দেয়। ফাস্ট বল খেলতে পারে না, এমন একটা কথা তখন রটানো হয়েছিল।
দরজায় বেল না টিপে অনন্ত আঙুলের টোকা দিল। সঙ্গে সঙ্গেই ভিতর থেকে গম্ভীর স্বর ভেসে এল, ”কাম ইন।”
হাতল ঘুরিয়ে দরজা খুলে সে ঢুকল। মাঝারি আকারের স্যুইট। ছোট লিভিং রুমে সেন্টার টেবিলে পা তুলে সোফায় আধশোয়া হয়ে কাম্বাট্টা। পরনে সাদা লখনউ চিকনের কাজ—করা পাঞ্জাবি ও পাজামা। সাত আটটা খবরের কাগজ সোফায় ছড়ানো, হাতেও একটা। ঘাড়, গলা, চোয়ালের দৃঢ়তা এবং কাঁধ ও বুকের গড়ন থেকে বোঝা যায় নিয়মিত ব্যায়াম ও শরীরের যত্ন করে।
ঘরে ঢুকেই অনন্ত কোমর থেকে শরীর ঝুঁকিয়ে ‘বাও’ করল। পা নামিয়ে ডান হাত বাড়িয়ে কাম্বাট্টা সিধে হয়ে বসে বলল, ”তুমি অনন্ত সেন?”
”হ্যাঁ, সার।”
”ফাস্ট বোলারের ফিগার, তাই চিনতে অসুবিধে হয়নি। আমার টিমে রিয়্যাল পেসার তো একজনই…বোসো, কখন এলে?”
”আধ ঘণ্টা আগে।”
কাম্বাট্টা তীক্ষ্ন চোখে কয়েক সেকেন্ড তার মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, ”আমরা সম্পূর্ণ অপরিচিতি। টিমের বেশিরভাগই তাদের স্কিপারকে চেনে না। কিন্তু তাতে কোনও অসুবিধা হবে বলে মনে হয় না। কেননা, আমরা একটা উদ্দেশ্য নিয়ে এই ম্যাচ খেলতে নামব—নিজেদের প্রমাণ করতে। এই উদ্দেশ্যটাই আমাদের মিলিয়ে দেবে, প্রেরণা দেবে। আমরা ক্রিকেটের সর্বোচ্চচ পর্যায়ে উঠে এসেছি, কেউই আর অপরিণত নই। সুতরাং, বক্তৃতা দিয়ে কাউকেই বলে দিতে হবে না যে, নিজেকে হান্ড্রেড পারসেন্ট ঢেলে দাও, নিংড়ে দাও। নিজেদের প্রতিষ্ঠা করার সুযোগ তোমরা অপ্রত্যাশিত পেয়ে গেছো…অকল্পনীয়ভাবে এটা এসেছে। আগে, আমাদের সময়ে বাইশ—তেইশ বছর বয়সে টেস্ট খেলা অসাধারণ ট্যালেন্ট আর সিলেকশন—কমিটিতে গড ফাদার না থাকলে সম্ভব হত না।”
অনন্ত লক্ষ করল কাম্বাট্টার স্বরে সামান্য তিক্ততা উথলে ওঠামাত্র সে চমৎকারভাবে সেটা দমন করে নিল। হঠাৎ সামনে ঝুঁকে হাত বাড়িয়ে বলল, ”দেখি তোমার হাত।”
অনন্ত ডান হাত এগিয়ে দিল। সেটা ধরে কাম্বাট্টা মনোযোগ দিয়ে আঙুল, তালু টিপে টিপে পরীক্ষা করল।
”ওয়েট ট্রেনিং করো?”
”হ্যাঁ। বাড়িতে আমার সরঞ্জাম আছে।”
”ইস্ট জোন ম্যাচে তোমার পারফরম্যানসে অবাক হয়েছি। অস্ট্রেলিয়ানরা কি সিরিয়াস ছিল না?”
”প্রথমে ছিল না। তারপর যখন দেখল ট্যুরে তাদের প্রথম ডিফিট হতে যাচ্ছে, তখন চেষ্টা করেছিল।”
”উইকেট কেমন ছিল?”
”ঘাস ছিল। হার্ড উইকেট, লিফট হচ্ছিল। আমার পছন্দের উইকেট।”
”যদি অমন উইকেট এখানে পাও তা হলে কিছু করতে পারবে?”
কঠিন প্রশ্ন। হ্যাঁ বললে মনে হবে বড়াই করছে, বেশি আত্মপ্রত্যয়ী। আবার দ্বিধা দেখালে ভাবতে পারে প্রত্যয় কম, কিলার ইনসটিংকট নেই। চেষ্টা করব বলাটাও বোকামি হবে। ওটা তো করতেই হবে না হলে টেস্ট খেলতে আসা কেন?
