”আহ—হ—হ।” অনন্ত বুকে হাত দিয়ে ঝুঁকে পড়ল। ফিসফিস করে স্বগতোক্তি করল, ”তোর টেস্ট খেলা আর হল না। আমিই শেষ করে দিয়েছি। আমাকে ক্ষমা কর জীবন। আমি পারব না, পারব না। আমি বুকের মধ্যে এই কাঁটা নিয়ে খেলতে পারব না।”
”অন্তু…অন্তু…অন্তু…!”
পাগলের মতো কমপ্লিমেন্টারি এনক্লোজারের সিঁড়ি দিয়ে ছুটে উপরে উঠতে উঠতে জীবন পাগলের মতো চেঁচাচ্ছে।
”অন্তু তুই…।” সিঁড়ির ধাপে ঠোক্কর লেগে জীবন হুমড়ি খেয়ে পড়ল।
অনন্ত দাঁড়িয়ে উঠল। জীবনের দিকে হাত বাড়িয়ে সে ”কী হল” বলে উদ্বিগ্ন দৃষ্টিতে ছুটে গেল। একটা সিমেন্টের চেয়ারের কোণ জীবনের কপালে লেগেছে। কেটে গিয়ে রক্ত বেরোচ্ছে। আবার সে উঠে ছুটতে ছুটতে অনন্তর কাছে পৌঁছেই প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়ল বুকে।
”অন্তু—উউ…।”
দীর্ঘদেহী অনন্তর বুকের নীচে মুখ চেপে হাউহাউ করে কেঁদে উঠল জীবন।
”অন্তু, আমি টেস্ট খেলব…তুই বলেছিলি না, আমি খেলব, তুই আমাকে খেলাবি। মনে পড়ে?”
জীবন মুখ তুলল। কপাল থেকে রক্তধারা গাল বেয়ে নেমে চোখের জলের সঙ্গে মাখামাখি হয়ে রয়েছে। দুটি আয়ত চোখে প্রগাঢ় শান্তি। অনন্তর প্রথমেই মনে হল, ঈশ্বরের মুখ বোধহয় এইরকমই।
”অন্তু, তুই চোদ্দজনের মধ্যে রয়েছিস। এইমাত্র টিম অ্যানাউন্স করল পাণিগ্রাহী।”
বাবা! অনন্তর চোখ আকাশের দিকে ছুটে গেল। একবার থরথরিয়ে কেঁপে গেল তার দেহ। নিজেকে সংযত করে সে বলল, ”নীচে মেডিকেল ইউনিটে চল শিগ্গির।”
”না।” ছেলেমানুষের মতো জিদ ধরে জীবন বলল, ”তোর কি আনন্দ হচ্ছে না? আমার বাসনা পূরণ হল, আর তুই কিনা এই সামান্য একটা ছড়ে—যাওয়া নিয়ে এখন ভাবছিস?” জীবনের দু’চোখ আবার জলে ভরে গেল।
ক্লাব—হাউসের মাথায়, সার—দেওয়া আসনগুলো শূন্য। সারা স্টেডিয়ামে বসার ধাপগুলো জনহীন। শুধু দুটি মানুষ মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। একসময় দেখা গেল লম্বা মানুষটি ধীরে—ধীরে নিচু হয়ে হাঁটু গেড়ে বসে দু’হাতে বেঁটে মানুষটির কোমর জড়িয়ে বুকে মাথা রাখল।
.
পরদিন ভারতের প্রতিটি খবরের কাগজের প্রথম পাতায়, ভারতের টানা তৃতীয় পরাজয়ের কথা নয়, বড় অক্ষরের হেডিংয়ে বেরোল অন্য খবর।
”ভারতীয় ক্রিকেটে ইতিহাস সৃষ্টি।” একটি কাগজের হেডিং।
”টেস্ট—দল থেকে আটজন ছাঁটাই।” আর—একটি কাগজের হেডিং।
”ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের দুঃসাহসিক সিদ্ধান্ত।” একটি হেডিং।
”বোর্ড শোধ তুলল।” একটি হেডিং।
”বোর্ড বুঝিয়ে দিল তার মেরুদণ্ড সবল।” একটি হেডিং।
তারপর খবর। প্রায় প্রতিটি কাগজেরই শুরুতে ‘চমকপ্রদ’, ‘নাটকীয়’, ‘অকল্পনীয়’, ‘চাঞ্চল্যকর’ প্রভৃতি শব্দ যথেচ্ছ ব্যবহার করে লেখা হয়েছে : ”বোর্ড প্রেসিডেন্ট এস পানিগ্রাহি সাংবাদিক সম্মেলনে চতুর্থ টেস্টের জন্য নির্বাচিত ভারতীয় দলের চোদ্দজনের যে নামগুলি পড়ে শোনান তাতে কলকাতা টেস্টে খেলেছেন যে এগারোজন তাদের মধ্যে অধিনায়ক ভার্দে সহ আটজনের নাম নেই। বাকি তিনজন হলেন উসমানি, নবর ও বেঙ্গটরঙ্গন। নতুন অধিনায়ক হয়েছেন আট বছর আগে ভারত দল থেকে বাদ—পড়া গুজরাটের বর্তমান রঞ্জি দলের অধিনায়ক, ৩৯ বছর বয়সী ফিরোজ নওরোজি কাম্বাট্টা। বাইশটি টেস্ট খেলেছেন। যেসব খেলোয়াড় বোর্ডের চুক্তিপত্রের তিনটি ধারা কেটে দিয়ে সই করেছিলেন তারা সবাই বাদ পড়েছেন। শুধু নবর, আনোখা, উসমানি ও গৌড়া—এই চারজন তরুণ, যারা চুক্তিপত্রের সব শর্ত মেনে সই করেছিলেন তাঁদের এবং বেঙ্কটরঙ্গনকে টেস্ট দলের চোদ্দজনের মধ্যে রাখা হয়েছে।
”বাঙ্গালোর টেস্টের জন্য কাম্বাট্টা সহ উক্ত ছয়জন ছাড়া আর রয়েছেন দু’জন উইকেট কিপার, সঞ্জয় শুক্ল (মধ্যপ্রদেশ), ও বিনয় মারাঠে (মহারাষ্ট্র), ব্যাটসম্যান দুর্গা দাস (দিল্লি), ও সাম্মি সারিন (হরিয়ানা), দুই স্পিনার তারসেম কুমার (পঞ্জাব), জ্যোতি পটেল (বোম্বাই) এবং দুজন পেসার ফারুক মির্জা (হায়দরাবাদ) ও অনন্ত সেন (বাংলা)।”
পাঁচদিন পরই বাঙ্গালোরে টেস্ট ম্যাচ শুরু হবে। অনন্ত রওনা হবে বিকেলের ফ্লাইটে, খেলার তিনদিন আগে। তার আগের দু’দিন সে নাজেহাল হল রিপোর্টার আর ফোটোগ্রাফারদের তাড়ায়। সকাল থেকে তারা বাড়িতে আসছে। নামী, অনামী খবরের কাগজ, ম্যাগাজিন, এমনকী মফস্বলের কাগজের লোকও এসে হাস্যকর প্রশ্ন করে তাকে বিরক্ত করেছে। অবশেষে তনিমাই বললেন, ”তুই বাপু সারাদিন জীবনের বাড়িতে গিয়ে থাক। ওরা এলে বলে দেব মামার বাড়ি গেছিস, পরশু রাতে আসবি। পরশু রাতে তখন তো তুই বাঙ্গালোরে পৌঁছে গেছিস!”
”মা, মিথ্যা বলা মহাপাপ কিন্তু!”
”অনেক মিথ্যা আছে, যা বললে পুণ্যি হয়। এটা সেই পর্যায়ের। এখন তোর মানসিক বিশ্রাম দরকার।”
অনন্ত অবশ্য জীবনের বাড়িতে গেল না, জীবনই এল। এক রিপোর্টার যখন অনন্তকে জিজ্ঞেস করল, ”আপনি ইনসুইং না আউট সুইং কোন বল করেন?” তখন জীবনই উত্তরটা দিয়েছিল: ”উনি কোনওটাই করেন না, উনি করেন ইন স্পিন আর আউট স্পিন।” রিপোর্টার তাড়াতাড়ি টুকে নিচ্ছিল আর অনন্ত মুচকি মুচকি হাসছিল। তারপর প্রশ্ন করেছিল, ”আপনি কখন বাম্পার দিতে পছন্দ করেন?” অনন্ত উত্তর দেবার আগেই জীবন বলে, ”শুটার বল দিয়েও যখন উইকেট পায় না তখন বাম্প করায়। শুটার কাকে বলে জানেন তো?” রিপোর্টার মুচকি হেসে বলে, ”তা আর জানি না। লং হপেরই তো আর এক নাম শুটার। ক্রিকেটে একই জিনিসের যে কত নাম!”
