”অন্তু এসে বলেছিল, তুমি অনেকটা ওর বাবার মতো কথা বলো, এখন দেখছি ঠিকই বলেছে।”
”তাই বুঝি!” ভ্রমরা হাসল।
”উনি বলতেন স্বপ্ন না দেখলে বড় হওয়া যায় না। এখনকার ছেলেমেয়েদের মধ্যে স্বপ্ন দেখার সাহসটা আগের থেকে বেড়েছে। এরা বুঝেছে স্বপ্নটাকে ধরার জন্য তাড়া করতে হবে, সেজন্য ধৈর্য আর পরিশ্রম দরকার। অন্তু পরিশ্রম করে, ইচ্ছেটাও আছে। যদি মানুষকে ইন্সপায়ার করতে পারে, তা হলে জীবনের শ্রেষ্ঠ পুরস্কার ও পাবে।”
”কিন্তু মা, ওর এই ব্যবসায় নামার কথায় আমিও কিন্তু ইন্সপায়ার্ড হচ্ছি।”
”ব্যবসা শুরু করবেন নাকি?”
”না, না, বোলিং। যার যা কাজ।”
সন্ধে ঘনিয়ে এসেছে। ভ্রমরাকে অনেক দূরে যেতে হবে। সে বিদায় নিল। তাকে এগিয়ে দিতে অনন্ত তার সঙ্গ নিল।
চলতে চলতে ভ্রমরা বলল, ”আমাদের কাগজটার জন্য অনেকের অনেকরকম সাহায্য দরকার হবে, আপনার সাহায্যও চাইব।”
”আমার! কীভাবে করতে পারি?”
”নাম দিয়ে। আপনি যদি আমাদের জন্য কয়েকটা জায়গায় পার্সোনালি বলেন, তা হলে কেউ ফেরাতে পারবে না।”
অনন্ত সশব্দে হেসে উঠল। ”সেরকম নাম এখনও হয়নি। টেস্ট—লেভেলে নাম করতে হবে, তবেই তাকে খাতির করবে। আর আমি তো এখনও টেস্টেই খেললাম না।”
”খেলবেন।”
”কী করে জানলেন?”
”আমার মন বলছে।”
বাসে তুলে দেওয়া পর্যন্ত অনন্ত আর একটাও কথা বলেনি। বাস ছাড়ার সময় সে হাত তুলে হঠাৎই বলে, ”আমি খেলব।”
।। বারো ।।
চতুর্থ দিন শুধু উসমানিই কিছু লড়াই করল। সে শেষপর্যন্ত অপরাজিত রইল ৩০ রান করে। লটন ৩৭ রান দিয়ে ছ’টি উইকেট পেয়েছে। ভারতের ইনিংস শেষ হয়েছে ৯৪ রানে। ইনিংস আর ৪৬ রানে অস্ট্রেলিয়া জিতল।
ক্লাব—হাউসের দু’ধারের স্ট্যান্ড থেকে ধিক্কার, গালিগালাজ আর তার সঙ্গে উড়ে আসছে কাগজের কাপ ও গ্লাস, কমলা লেবুর আর কলার খোসা। কয়েকটা ইটও এসে পড়ল। গ্যালারির নানান জায়গা থেকে আগুনের শিখা জ্বলে উঠল। হাজার—হাজার মুখ ক্রোধে বিকৃত। পরাজয়ের থেকেও বেশি লজ্জা বিনা যুদ্ধে আত্মসমর্পণের জন্য। ভারতের ড্রেসিং—রুমের দরজা বন্ধ। বোলান হাসিমুখে দল নিয়ে মাঠ থেকে ফিরল। ভারতের শেষ দুই ব্যাটসম্যানের মাথায় থুথু পড়ল। ক্লাব—হাউসের সামনের রাস্তায় মারমুখো জনতা অপেক্ষা করছে, বাসে করে ভারতীয় দল কখন বেরোবে হোটেলে ফেরার জন্য। অবশেষে পুলিশকে লাঠি চালিয়ে বাস বেরোবার জন্য পথ করাতে হল। বাসের বন্ধ জানলায় এক—একটা শ্রান্ত, হতাশ, বিরক্ত মুখ। রাস্তাতেও বাস লক্ষ্য করে ইট ছোঁড়া হয়।
ভারতের দ্বিতীয় ইনিংস শেষ হবার আগেই সি এ বি—র এক কর্তা প্রেসবক্সে এসে বলে যান, চতুর্থ টেস্টের জন্য নির্বাচকরা এখন সভায় বসবেন। বোর্ড—প্রেসিডেন্ট ক্লাব—হাউসের লাঞ্চ—রুমে সাংবাদিক বৈঠক ডেকেছেন একটায়। সেই বৈঠকেই তিনি নিজে দলের নাম ঘোষণা করবেন।
জীবন এক রিপোর্টারের কাছ থেকে খবরটা পেয়ে বলল, ”অন্তু, আমি এইখানেই রইলাম, নামগুলো শুনে তারপর যাব। নীচ থেকে চা খেয়ে আসি, যাবি?”
ক্লাব—হাউসের উঁচুতে কমপ্লিমেন্টারি আসন থেকে অনন্ত মাঠের দিকে তাকিয়ে। মাথা নেড়ে বলল, ”তুই যা।”
মাঠে ছড়িয়ে রয়েছে কাগজ আর লেবুর খোসা। মালিরা সেগুলো পরিষ্কারে ব্যস্ত। মাঝখানে উইকেট ঘিরে দাঁড়িয়ে রয়েছে পুলিশ। স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে বহু মানুষ, এখন এই দুপুরে তাদের বাড়ি ফেরার জন্য ব্যস্ততা নেই। ভারতের পরাজয়ে তারা যেন নিস্পৃহ। যেন জানতই এমন হবে।
অনন্ত একদৃষ্টে মাঠের দিকে তাকিয়ে। মনের মধ্যে তোলপাড় হচ্ছে আশা—নিরাশার তরঙ্গ। আর একঘণ্টা পরেই জানা যাবে তার ভাগ্যে কী আছে। সে টেস্ট টিমে আসবে, কি উপেক্ষিত হবে। কালই সে বলেছে ‘আমি খেলব।’ কিন্তু কবে?
তিন বছর আগেও সে টেস্ট—খেলার কথায় হেসে বলেছে, ‘এখনই অত উচ্চচাশা করছি না। আগে বাংলা তারপর আঞ্চলিক … ধাপে ধাপে ভাবব।’
কিন্তু জীবন তখনই টেস্ট খেলার আকাঙ্ক্ষা নিয়ে স্বপ্ন দেখেছিল। অনন্তর চোখ আকাশে আটকে রইল। তার মনে হল ঘন মেঘ দ্রুত ধেয়ে আসছে সেদিনের মতো। চারদিকে অন্ধকারের ছায়া ঘিরে ধরছে। গাছের মাথা পাগলের মতো দুলছে। পাখিরা ডানা ঝাপটাতে ঝাপটাতে হাওয়ায় ভেসে যাচ্ছে। অনন্তর বুক কেঁপে উঠল অজানা ভয়ে।
তারপর!
শব্দ করে বৃষ্টির বড়—বড় ফোঁটা পড়তে শুরু করল। এলোমেলো হাওয়ার ঝাপটায় জলকণা এসে লাগছিল তাদের অনাবৃত শরীরে। জীবন জ্বলজ্বলে চোখে দু’হাত তুলে ‘ইয়া হুউউ’ বলে চিৎকার করে ছুটেছিল সিঁড়ির দিকে। লোহার দরজাটা দড়াম করে খুলে প্লেয়ারদের মাঠে যাওয়ার সিঁড়ি দিয়ে তরতর করে একতলার নামল। ছুটতে—ছুটতে মাঠে গিয়ে ঘাসের উপর গিয়ে দাঁড়াল। মুখ তুলে অনন্তর দিকে তাকিয়ে দু’হাত তুলে বলেছিল…’অন্তু, আমি টেস্ট খেলব।’ আবার বলল ‘শুনতে পাচ্ছিস অন্তু, আমি টেস্ট খেলব। ঈশ্বর খবর পাঠিয়েছেন, আমি টেস্ট খেলব।’
বৃষ্টিতে ঝাপসা হয়ে গেছল চরাচর। জীবন মাঠে গড়াগড়ি দিচ্ছিল আনন্দে। তখন মোহনদাকে অনন্ত বলেছিল, ‘দেখো, জীবন একদিন টেস্ট খেলবেই।’ অঝোর বৃষ্টির মধ্যে সে তখন দেখেছিল, জীবন চিত হয়ে আকাশের দিক মুখ করে দু’হাত ছড়িয়ে। নিথর একটা মৃতদেহের মতো। তার বুকটা তখন ধক করে উঠেছিল।
