”মা, চিনুর বোতামটা!” মিনু আঙুল দিয়ে দেখাল। তারপর চাপা গলায় বলল,”অ্যাই চিনু, কোমরের বোতাম লাগা।” কোমরে হাত দিয়ে চিনু জিভ কাটল।
কোর্টের ধারে একটা চেয়ারে নিরাসক্ত মুখ করে সহদেব একা বসে । চিনু মাকে প্রণাম করে, কপালে চুমু নিয়ে কোর্টের দিকে এগোতেই তপতী মনে করিয়ে দিলেন,”সারকে।”
সহদেব তাড়াতাড়ি দাঁড়িয়ে উঠে প্রণামে নত চিনুকে দু’ কাঁধ ধরে তুললেন। বুকে জড়িয়ে মৃদু স্বরে বললেন,”আমার দিকে তাকাবে না, মনে রেখো কোর্টের মধ্যে তুমি একা, নিজেকে নিজেই দেখতে হবে।”
অদ্বৈত মল্লিক হতভম্বের মতো তাকিয়ে রইলেন চিনুর দিকে অন্তত কুড়ি সেকেন্ড। তিনি ভাবতে পারেননি একটা বালকের সঙ্গে তাঁকে খেলতে হবে। টস করার সময় মল্লিক জিজ্ঞেস করলেন,”খোকা, তুমি কোন ক্লাসে পড়ো?”
চিনু গম্ভীর স্বরে বলল,”ক্লাস সিক্স।”
মল্লিক টস জিতে সার্ভিস নিলেন। ওয়ার্ম—আপের শুরুতে তিনি ফোরহ্যান্ডে প্রথম বলটা পাঠালেন নেটের ওধারে। চিনুর ফোরহ্যান্ড রিটার্ন লাগল নেটে। মল্লিক আবার বল পাঠালেন। চিনু আবার নেটে বল মারল।
মল্লিক নেটের কাছে এসে হাতছানি দিয়ে চিনুকে ডাকলেন। ”র্যাকেট কাঁধের আর একটু ওপরে তুলে এইভাবে নামিয়ে ফোরহ্যান্ড মারো।” তিনি র্যাকেট চালিয়ে দেখিয়ে দিলেন কীভাবে মারতে হবে। ”মনে থাকবে?”
চিনু বিনীতভাবে মাথা নাড়ল।
প্রথম সার্ভিস করলেন মল্লিক। চিনুর ফোরহ্যান্ড নেটের এক ইঞ্চি ওপর দিয়ে সাইডলাইন বরাবর বেসলাইনের কাছে পড়ল। জীবনের প্রথম ম্যাচে প্রথম পয়েন্ট! সে প্রথমে সহদেবের, তারপর মা আর দাদার দিকে জ্বলজ্বলে চোখে তাকাল। সহদেব মাথাটা সামান্য হেলালেন, মিনু দাঁড়িয়ে উঠে হাততালি দিল, তপতী দু’ হাত কপালে ঠেকিয়ে চোখ বুজলেন। মল্লিক দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়ে ধরলেন। পরের সার্ভিসটার সঙ্গে চিনু একই আচরণ করল। মল্লিকের চোখ আর ভ্রূ কুঁচকে উঠল। তৃতীয় সার্ভিসের ফোরহ্যান্ড রিটার্ন মল্লিকের বুকের কাছে এল, তিনি ভলি করে চিনুর ডান দিকে বল ফেলতেই ফোরহ্যান্ডে সে বাঁ দিকের ফাঁকা কোর্টে বল মারল। চিনু জীবনের প্রথম গেমটা পেল মল্লিক ডাবল—ফল্ট করায়। সময় লাগল দু’ মিনিট। ম্যাচ শেষ হল পঁচিশ মিনিটে : ৬—১, ৬—০। হ্যান্ডশেক করার সময় মল্লিক বললেন,”আমার কথাগুলো মনে রেখেছিলে তা হলে…গুড মেমারি।”
ঘড়ি দেখে সহদেব বললেন,”মাত্র দুটো বাজে। চলুন দিদি, একবার সাউথ ক্লাব ঘুরে আসি। বেঙ্গলের ভাল জুনিয়াররা ওখানে প্র্যাকটিস করছে। ওরা একবার দেখুক।”
বাইরে বেরিয়ে এসে সহদেব বললেন,”বাসে করে চলে যাই, মিছিমিছি কেন ট্যাক্সি ভাড়া দেবেন।”
তপতী বললেন,”দোব। এটা ছেলেদের ব্যাপার।”
কিন্তু ছেলেরা একসঙ্গে বায়না ধরল তারা জীবনে কখনও বাসে—ট্রামে চড়েনি, সুতরাং বাসেই যাবে। চিনু বলল,”সার ট্রামে যাব।” সহদেব বললেন,”এখান থেকে ট্রাম টানা এলগিন রোড পর্যন্ত যায় না, এসপ্ল্যানেডে নেমে আবার ট্রামে উঠতে হবে। তা ছাড়া বাস তাড়াতাড়ি যায় ট্রামের থেকে।”
বাসে উঠে কুড়ি মিনিট পর চৌরঙ্গি—এলগিন রোডের মোড়ে নেমে ওরা হেঁটে সাউথ ক্লাবে পৌঁছল। আটটা কোর্টে তখন খেলা চলছে। চারদিকে শুধু খলব খলব খলব শব্দ। তিনজন অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। একটা কোর্টের ধারে সহদেব ওদের নিয়ে গেলেন, মাঝবয়সি একটি লোক সুদর্শন, স্বাস্থ্যবান ষোলো—সতেরো বছরের একটি ছেলেকে নিয়ে খেলছে। সহদেব বললেন,”যে ট্রেনিং করাচ্ছে ওর নাম সৈদুল। আগে বলবয় ছিল, আমার চেনা।”
খুব জোরে মারা একটা ক্রশকোর্ট ফোরহ্যান্ডে সৈদুল র্যাকেট ছোঁয়াতে পারল না। বলটাকে কোর্টের বাইরে লুফল মিনু। সৈদুল বলটা চাইল র্যাকেট বাড়িয়ে ধরে, আর সেই সময় দেখতে পেল সহদেবকে। হাত তুলে সে চেনা দিল।
”সৈদু শোন,” সহদেব হাতছানি দিয়ে ডাকলেন।
”আরে দেবুদা, তুমি এতদিন কোথায় ছিলে?” একগাল হেসে সৈদুল হাত জড়িয়ে ধরল সহদেবের। ”কী করছ এখন? আছ কোথায়?”
”এই ছেলে দুটোকে নিয়ে আছি মহাদেবপুর বলে একটা জায়গায়, আমার বাড়ির কাছেই।”
সৈদুল হাসিমুখে মিনু—চিনুর দিকে তাকাল। ”এদের শেখাচ্ছ? ভাল।”
”তোর ওই ছেলেটা তো বেশ ভালই খেলে। নাম কী?”
”অরুণ, অরুণ মেটা। এখন জুনিয়ার বেঙ্গল চ্যাম্পিয়ান। লাস্ট ইয়ারে জুনিয়ার ন্যাশানাল রানার্স হয়েছে, ফাইনালে হেরেছিল ম্যাড্রাসের মুথান্নার কাছে।”
”সৈদু একটা কাজ করবি? তোর ওই ছেলেটার সঙ্গে একে একটা সেট খেলাবি?” সহদেব আঙুল দিয়ে মিনুকে দেখালেন,”ওর নাম মৃন্ময়।”
”বেশ তো, খেলুক। তুমি যখন চাইছ তখন নিশ্চয় ওর স্ট্যান্ডার্ড ভাল।”
”সেইটে দেখার জন্যই খেলাতে চাই। মিনু এখনও পর্যন্ত একটা গেমও বাইরের কারো সঙ্গে খেলেনি।”
সৈদুল নেটের কাছে গিয়ে অরুণের সঙ্গে কথা বলে হাতছানি দিয়ে মিনুকে কোর্টে নামতে বলল। সহদেব মিনুর কাঁধ ধরে সাইডলাইন পর্যন্ত গেলেন,”এটা ম্যাচ খেলা নয় ফ্রেন্ডলি খেলা, রিল্যাক্সড থাকবে। সঙ্কোচে গুটিয়ে যেয়ো না, মনে রেখো অরুণ তোমার মতই জুনিয়ার, ঘাবড়াবার কিছু নেই। খোলাখুলি সহজ মনে হিট করো।”
”দাদা,” চাপা স্বরে চিনু বলল,”তুই ‘জেন্টসে’ যাবি না?”
আগুনে—চোখে ভাইয়ের দিকে একবার তাকিয়ে মিনু কোর্টে নামল। ওয়ার্ম—আপ করার সময় কামানের গোলার মতো অরুণের প্রথম সার্ভিসটায় র্যাকেট ছোঁয়াতেই মিনুর মুঠোর মধ্যে র্যাকেটটা সামান্য ঘুরে গেল। সে দাঁতে ঠোঁট কামড়ে ধরল। মিনিট তিনেক পর সৈদুল নেটের পাশে দাঁড়িয়ে চেঁচিয়ে বলল,”নাউ স্টার্ট…সার্ভিস অরুণ মেটা, লাভ—অল।”
