”তোমরা হয়তো ভাবতে পারো চার মাইল পর্যন্ত দৌড়বার ক্ষমতা তোমাদের আছে, কিন্তু একটা কথা শুনে রাখো,যদি একটা বন্দুক তোমাদের মাথায় ঠেকাই তা হলে আবিষ্কার করবে আরও একটা মাইলও দৌড়তে পারো। এটা টেনিস ম্যাচেও খাটাও। বড় বড় প্লেয়াররা যখন খেলে, তখন একে অপরকে যন্ত্রণায় বিঁধোয়, তখন শুধু একটাই প্রশ্ন, কে আর একটু বেশি যন্ত্রণা দিতে ইচ্ছুক আর কে প্রথম পালাবে। হারতে যতটা সময় লাগে জিততেও ততটা সময় লাগে। ব্যাপারটা যদি তাই হয় তা হলে না জিতে শুধু শুধু যন্ত্রণার শাস্তিটা নেবে কেন? জেতার জন্য নিজেদের তৈরি করো। জিরোবার সবচেয়ে সহজ উপায় কী জানো?” সহদেব ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসলেন। ”ওই চেয়ারটায় গিয়ে বসে পড়া। চলো, আমরা বসব এখন।”
”না।” মিনু তীক্ষ্ন স্বরে বলে উঠল,”আপনি গিয়ে বসুন…আয় চিনু।”
সহদেব চোখ কুঁচকে নেটের দু’ দিকে দুই ভাইকে এগিয়ে যেতে দেখলেন। কী ভেবে তিনি কোর্ট থেকে বেরিয়ে এসে তপতীর পাশের খালি চেয়ারে বসলেন।
”আজ গেছলাম হেডমাস্টারের সঙ্গে দেখা করতে।” তপতী প্রথম সুযোগেই কথাটা পাড়লেন। মিনু বা চিনু শুনুক এটা তিনি চান না। ”উনি বললেন, এক ঘণ্টা আগে ছুটি দিতে পারবেন না। ওরা শুধুমাত্র খেলে, তার বেশি কিছু নয়। মস্ত প্লেয়ার হবে এমন প্রতিশ্রুতির প্রমাণ না পেলে উনি ছুটি দিতে পারবেন না।”
”কী প্রমাণ চান উনি?” সহদেব ভ্রূকুটি করলেন।
”বলেছেন আগে একটা ট্রফি এনে দেখাক।…আমার মনে হয় হেডমাস্টার অন্যায্য কিছু বলেননি। সত্যিই তো, যে লোক খেলাধুলো বোঝেন না তিনি ট্রফি দিয়েই প্রমাণ চাইবেন।”
”তা হলে আমাদের এখন দরকার একটা ট্রফি। তার মানে ছেলেদুটোকে এবার বাইরে বেরোতে হবে।” সহদেব মাথা নিচু করে জমির দিকে তাকিয়ে রইলেন।
”আপনার কি মনে হয় আরও একটা—দুটো বছর—” ইতস্তত করে তপতী থেমে গেলেন।
”না, না, এই বয়সেই কম্পিটিশনের মুখে পড়া দরকার। কাল আমি বি এল টি এ অফিসে যাব কোথায় কী টুর্নামেন্ট হবে খোঁজখবর করতে।”
।।৭।।
দশদিন পর মিনু, চিনু এবং তপতী, বেলা বারোটায় সহদেবের সঙ্গে ট্রেন থেকে নামল হাওড়া স্টেশনে। তারা যাবে নর্থ ক্যালকাটা টেনিস ক্লাবের টুর্নামেন্টে। মিনু আর চিনু এন্ট্রি করেছে। প্রতিযোগিতাটা খুবই ছোট মাপের এবং বড়দের জন্য। সহদেব এন্ট্রি তালিকাটা আগেই দেখে নিয়েছেন। নামী খেলোয়াড় একজনও নেই। কিছু জুনিয়ার আর কিছু সদ্য খেলা ছেড়ে দেওয়া প্রাক্তন নাম দিয়েছে।
স্টেশন থেকে বেরিয়ে তারা ট্যাক্সি ধরে ক্লাবের ফটকে এসে নামল। বিরাট একটা পার্কের একধারে ক্লাব। ফটক থেকে মোরামের সরু পথ কিছুটা গিয়ে দু’ ভাগ হয়ে দুটো টেনিস কোর্টকে বেড় দিয়ে মিলেছে ক্লাব—তাঁবুর সামনে। তাঁবুর বাইরে কয়েকটা বেঞ্চ আর চেয়ার। দু—তিনজন কথা বলল সহদেবের সঙ্গে। তাঁবুর বাইরে অল্প কিছু লোক। ওদের চেয়ারে বসিয়ে সহদেব তাঁবুর ভেতরে ঢুকে গেলেন। দুই ভাই সাউথ ক্লাব দেখেছে। সেখানকার গ্যালারি, ভিড়, ক্লাববাড়ি আর টানা বারান্দা তাদের মনে যে ছাপ ফেলেছে তার সঙ্গে এখানকার কোনও মিলই তারা পাচ্ছে না। তারা ভেবেছিল স্কুল স্পোর্টসের মতো জমজমাট একটা ব্যাপার দেখবে।
চিনু ফিসফিস করে মিনুকে বলল,”খেলবে কে রে?”
মিনু দু’ধারে তাকিয়ে বলল,”বোধ হয় আমরা আগে এসে পড়েছি।”
তাঁবু থেকে বেরিয়ে এসে সহদেব জানালেন, মিনুর খেলা যার সঙ্গে পড়েছে সে আসতে পারবে না জানিয়েছে, পা মুচকে এখন সে বিছানায়। মিনু সেকেন্ড রাউন্ডে উঠে গেছে। চিনুর সঙ্গে খেলবে অদ্বৈত মল্লিক, এই ম্যাচটা দিয়েই টুর্নামেন্ট শুরু হবে এখনই। সহদেবের কথা শোনা মাত্রই মিনুর মুখ থেকে উদ্দীপনার চকচকে ভাবটা মুছে গেল। আর চিনু খুঁজতে লাগল অদ্বৈত মল্লিককে।
ইতিমধ্যে কোর্টের ধারে কিছু লোক জমা হয়েছে। মালি কয়েকটা টুল রেখে গেল সাইডলাইন আর বেসলাইনের ধারে লাইন্সম্যানদের জন্য। বকের মতো গলা, কোট, প্যান্ট, টাই পরা এক লম্বা লোক, চোখে পুরু কাচ দেওয়া চশমা, স্কোরশিট হাতে নিয়ে আম্পায়ারের উঁচু চেয়ারে বসলেন। তাঁর মুখের কাছে মাইক্রোফোন। লাইন্সম্যানরা টুলে বসল। দু’ দিকের বেসলাইনের এবং নেটের দু’ দিকে বলবয়রা হাজির হল। আম্পায়ার দু’ বার গলাখাঁকরি দিয়ে মাইক পরীক্ষা করে প্লেয়ারদের নাম ডাকলেন।
চিনু ঢোঁক গিলে সহদেবের কানে চুপিচুপি কী একটা বলতেই তিনি ব্যস্ত হয়ে বললেন, ”টেন্টের মধ্যে ঢুকে একেবারে শেষে গিয়ে ডান দিকে। দেখবে দরজায় ‘জেন্টস’ লেখা আছে।”
মিনু ফিসফিস করে তপতীকে বলল,”চিনুটা ঘাবড়ে গেছে।”
”জীবনের প্রথম ম্যাচে সবাই ঘাবড়ায়, তুইও ঘাবড়াবি।”
”দেখা যাবে।”
অদ্বৈত মল্লিক কোর্টে নেমে পড়েছেন। হৃষ্টপুষ্ট, মাথায় সামান্য টাক, বয়স প্রায় চল্লিশ। অ্যাডভোকেট। বছর পনেরো আগে পর্যন্ত নিয়মিত প্রতিদিন খেলতেন, এখন শুধু শনি—রবিবারে। নর্থ ক্যালকাটা টুর্নামেন্ট দু’ বার জিতেছেন। মল্লিক গেলেন বাঁ দিকের কোর্টে। গোটা ছয়েক নতুন বল একজন গড়িয়ে দিল। মল্লিক একটা বল তুলে নিয়ে সার্ভ করলেন ওধারের ফাঁকা কোর্টে। বলবয় বল ছুড়ে দিল তাঁকে। তিনি আবার একটা সার্ভ করে তাকালেন তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বীর দেখা পাওয়ার আশায়।
