দশ মিনিটের মধ্যেই মিনুর সার্ভিস দু’বার ভেঙে অরুণ স্কোর নিয়ে গেল ৩—০। প্রচণ্ড জোরালো মারগুলো কোর্টের ঘাসগুলোকে নয়, যেন মিনুর মাথার মধ্যে আঘাত করে করে তাকে অসাড় করে দিয়েছে। তার র্যাকেট উঠছে না, দুটো পা চলছে না। শুধু দেখল তার দুপাশ দিয়ে বলগুলো ঘাসে পড়ে পিছলে বেরিয়ে যাচ্ছে।
অরুণ কোমরে হাত রেখে সৈদুলের দিকে প্রশ্নভরা চোখে তাকিয়ে। ‘আরও কি খেলতে হবে?’ এমন একটা ভাব তার দাঁড়াবার ভঙ্গিতে। মিনু তাকাল সহদেবের দিকে। ‘দেখি এবার তুমি কী করো’, এমন একটা ভাব সহদেবের মুখে।
চতুর্থ গেমে সার্ভিস করেই মিনু এতক্ষণ যা করেনি, নেটের দিকে ছুটে গেল। রিটার্নটা উঁচু হয়ে তার বাঁ দিকে এল। অরুণের নাগালের বাসরে সেটা ভলি করে মিনু পয়েন্ট পেল। তার পরের সার্ভিস পড়ল বক্সের কোণে। অরুণ দাঁড়িয়ে থেকে ‘এস’টা দেখল। পরের দুটো সার্ভিসও একই জায়গায় পড়ল। পরপর তিনটে সার্ভিস ‘এস’ হতে দেখে বিস্মিত সৈদুল হাততালি দিয়ে হাঁকল,”ওয়ান—থ্রি।”
চিনু ফিসফিস করে তার মায়ের কানে বলল,”সারের রুমালটাকে তিন বলে তিনবার হিট করল।”
মিনুর মাথার মধ্যে যে খিলটা পড়ে ছিল এবার সেটা খুলে গেছে। অরুণের জোরালো মারগুলো আর তাকে আড়ষ্ট করে দিচ্ছে না। সহজ বাতাস তার সারা শরীরের মধ্যে ভাসছে। সে স্বচ্ছন্দে এগোচ্ছে, পিছোচ্ছে, পাশে ছুটছে দ্রুতগতিতে। চার মিনিটের মধ্যে অরুণের সার্ভিস ভেঙে সে ৩—৩—এ স্কোর নিয়ে গেল। অরুণ তখন হাঁফাচ্ছে।
অরুণ সৈদুলের কাছে গিয়ে বলল,”আর খেলব না, পিঠের ব্যথাটা আবার শুরু হয়েছে।” র্যাকেট—ধরা হাতটা মিনুর দিকে একবার তুলে সে ক্লাবহাউসের দিকে হাঁটতে শুরু করল কোনওদিকে দৃকপাত না করে।
”বড়লোকের ছেলে কখন কী মর্জি হয়!” সৈদুল অপ্রতিভ স্বরে বলল। ”দিনে দেড়ঘণ্টার বেশি ট্রেনিং করে না। বলে বলেও ওকে দৌড় করাতে পারিনি। মৃন্ময়ের স্পিড, স্ট্যামিনা তো খুব ভাল!”
”অরুণের খেলা উচিত ছিল।” সহদেব বললেন। তাঁর মনে হয়েছে, অরুণের পিঠব্যথাটা অজুহাত, আসলে সে পালাল। যারা পালায় তারা কখনওই জেতে না। তবে মনে মনে তিনি খুশি। আজ একটা ব্যাপার তিনি জেনে গেলেন, মিনু বেঙ্গল চ্যাম্পিয়ান হওয়ার মতো খেলা খেলতে পারে।
.
নর্থ ক্যালকাটা টুর্নামেন্টে চিনু দ্বিতীয় রাউন্ডে স্ট্রেট সেটে হেরে গেল প্রদীপ ঘোষের কাছে। যে গত বছর সিনিয়ার স্টেট চ্যাম্পিয়ানশিপের কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছেছিল। তিনদিন পর রবিবারে মিনু ২—১ সেটে প্রদীপ ঘোষকে হারাল ফাইনালে। একটা বড় কাপ, একটা মেডেল আর তিনজন আরোহীকে ভক্সহলে বসিয়ে তন্ময় মহাদেবপুর ফিরলেন। সহদেবকে এক পুরনো বন্ধু বাড়িতে ধরে নিয়ে যাওয়ায় তিনি আর এদের সঙ্গে ফেরেননি।
বাড়ির কাছে এসে তন্ময়ের কী মনে হল, তিনি বললেন,”চলো একবার ক্লাবটা ঘুরে আসি। রোববারে অনেকেই থাকবে।”
ক্লাব—লনের প্রায় সবক’টা টেবলই ভরা। একটা বড় কাপ দু’ হাতে ধরে মিনু আর তার পেছনে তন্ময়, চিনু আর তপতীকে ঢুকতে দেখে সকলেই অবাক চোখে মুখ ঘুরিয়ে তাকিয়ে রইল।
তন্ময় একটু গলা চড়িয়ে বললেন,”আমাদের টেনিস কোর্টের প্রথম ফসল।” কাপটা তিনি মাথার ওপর তুললেন। ”মিনু আজ নর্থ ক্যালকাটা টুর্নামেন্ট থেকে জিতে আনল।”
হই—হইয়ের সঙ্গে হাততালির শব্দ উঠল। অবশ্য কেউ কেউ হাততালি দিলেন না, গলা থেকে আওয়াজও বার করলেন না। কান্তি চায়ের ট্রে নিয়ে আসছিল। একটা টেবলে ট্রে—টা রেখে ছুটে এসে কাপটা মাথায় তুলে এমনভাবে ঘুরতে শুরু করল, যেন সেটা সে নিজেই জিতেছে! টেনিস কোর্টটা প্রথম দিন থেকে তার হাতেই লালিত হয়েছে এবং এখনও হচ্ছে। উচ্ছ্বাস ধরে রাখা তার পক্ষে সত্যিই খুব কঠিন। প্রত্যেক টেবলে সে কাপটা দেখাতে দেখাতে অবশেষে প্রতিভা মজুমদারের টেবলে রাখল।
”দেখুন মেমসাব, সেই ছোট্ট মিনু কাপ জিতে এনেছে।”
”দেখেছি, এবার এটা টেবল থেকে সরাও, আর চায়ের একটা পট দিয়ে যাও।”
”দিচ্ছি। রুপোর কাপ তাই না? দাম কত হবে বলুন তো?”
”রুপো না ছাই। পেতলের ওপর রুপোর জল—করা।”
কান্তি অপ্রতিভ হয়ে কাপটা তুলে নিল।
”হোক পেতল, সবাইকে হারিয়ে জিতেছে তো!”
কান্তি চলে যেতেই সুধা ঘোষাল বললেন,”নর্থ ক্যালকাটা টুর্নামেন্টের নাম তো কখনও শুনিনি।”
”এরকম টুর্নামেন্ট কলকাতায় পাড়ায় পাড়ায় হয়, শুনবে কী করে?” প্রতিভা বললেন।
”প্রতিভাদি, দোকান থেকে কিনে এনে দেখাচ্ছে না তো?” চন্দ্রিমা দত্ত ফোড়ন কাটলেন।
”ওহহো, একটা কথা তো বলা হয়নি।” সুধা ঘোষাল টেবলে ঝুঁকে পড়লেন। সঙ্গে সঙ্গে আরও দুটো মাথা। ”মিসেস বসুমল্লিক ছেলেদের খেলার প্র্যাকটিসের জন্য এক ঘণ্টা আগে স্কুল থেকে ছুটি করাতে হেডমাস্টার আচার্যর হাতে পায়ে ধরেছিলেন,জানেন কি?”
”না তো! তারপর কী হল?” প্রতিভার দমবন্ধ হয়ে এল এমন একটা খবরের সন্ধান পেয়ে। ”কে বলল তোমায়?”
”রমু বলল। ওর ক্লাসেই তো পড়ে হেডমাস্টারের ভাগ্নে। কিন্তু হেডমাস্টারকে জানেন তো, খুব কড়া লোক। তিনি ওসব হাতে পায়ে ধরাধরি, কান্নাকাটিতে গলে যাওয়ার পাত্র নন। দিলেন এককথায় তাড়িয়ে। বললেন,’কী এমন করেছে আপনার ছেলে। ইন্ডিয়া চ্যাম্পিয়ান হয়েছে কি? একটাও বড় টুর্নামেন্ট জিতেছে কি? কী দেখে আমি ছুটি অ্যালাও করব?’ শুনেই মুখ চুন করে উনি ঘর থেকে বেরিয়ে যান।”
