সহদেব মাথা নামিয়ে জবাবটা গুছিয়ে নিতে সময় নিলেন। তিনি আবেগপ্রবণ নন। শুকনো স্বরে বললেন, ”আজ যদি বলেন আর আপনাকে টাকা দিতে পারব না আপনি বিদায় হোন, তা হলেও আধপেটা খেয়ে সাইকেল চালিয়ে এসে ভোরবেলায় আমি বেল বাজাব…।”
কথা অসমাপ্ত রাখলেন সহদেব, মিনু—চিনু পিঠে ব্যাগ আর ওয়াটারবটল হাতে হাজির হয়েছে। তপতী উঠলেন গাড়ি বার করার জন্য। এখান থেকে সহদেব আবার ফিরে যাবেন ক্লাবে। সেখানে দুপুরে দুটো টেবল জোড়া দিয়ে টানটান শুয়ে থাকেন চিত হয়ে। কান্তি তার মাথার বালিশটা দিতে চেয়েছিল, নেননি।
তপতীকে চল্লিশ মিনিট অপেক্ষা করতে হল হেডমাস্টার আচার্যের দেখা পেতে। একজন শিক্ষক আসেননি, তাঁর ক্লাসটা নিয়ে নিজের ঘরে ফিরে তিনি তপতীকে ডেকে পাঠালেন।
তিন মিনিটেই তপতী তাঁর আবেদন শেষ করলেন।
”তা কী করে হয়!”হেডমাস্টার চেয়ারে পিঠ এলিয়ে দিলেন। ”একঘণ্টা আগে ছুটি দিতে হবে খেলার জন্য? এ তো বড় অবাস্তব কথা। আপনার ছেলেরা শুধু খেলে, তার বেশি কিছু নয়। ওরকম তো শত শত ছেলে খেলে। তারা সবাই এসে যদি ছুটি চায় তা হলে স্কুল থেকে লেখাপড়ার পাট তো তুলে দিতে হয়। হ্যাঁ, যদি বুঝতাম ওরা কিছু একটা করেছে, এবার নিজেদের উন্নতির জন্য আরও বেশি ট্রেনিং দরকার, সেজন্য সময় দরকার, তা হলে কনসিডার করে দেখতে পারি। কিন্তু আপনার ছেলেরা যে মস্ত প্লেয়ার হবে সেই প্রতিশ্রুতির প্রমাণ তো চাই। একটা ট্রফি ফ্রফি এনে আগে তো দেখাক। মাপ করবেন মিসেস বসুমল্লিক, আমি ছুটি দিতে পারব না।”
পাংশু মুখে তপতী একটি কথাও না বলে হেডমাস্টারের ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন। বিকেলে দুই ছেলেকে নিয়ে গেলেন ক্লাবে। সহদেব একটা বালতিতে চব্বিশটা বল নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন ডানদিকের কোর্টের বেস লাইনের কাছে। নেটের ওধারে সার্ভিস বক্সের বাঁ কোণে একটা নীল রুমাল পাতা।
”মিনু, সার্ভিসগুলো ওই রুমালটায় ফেলতে হবে,…যাও শুরু করো।”
মিনু বালতি থেকে একের পর এক বল তুলে সার্ভ করে যেতে লাগল। শুধু দ্বাদশ সার্ভটা রুমালের কানা ছুঁয়ে গেল, তা ছাড়া পাঁচটা সার্ভ নেটে লাগল, চারটে পড়ল বাইরে। ওধারের বেস লাইন থেকে চিনু এগারোটা বল রিটার্ন পাঠাল। তার মধ্যে মিনু পাঁচটা ভলি করল চিনুর নাগালের বাইরে। সহদেব মাথা নাড়তে নাড়তে বললেন, ”কিসসু হয়নি। রুমালে মাত্র একবার পড়ল, অন্তত দশবার ফেলতে হবে।…আবার।”
চিবুক থেকে ঘাম ঝরছে, মিনুর মুখ থমথমে। আড়চোখে চেয়ারে বসা মায়ের দিকে তাকাতেই তপতী মুখটা আকাশের দিকে তুললেন। দাঁতে ঠোঁট কামড়ে মিনু আবার শুরু করল। এবার রুমালে বল পড়ল তিনবার। তোয়ালে দিয়ে মুখের ঘাম আর র্যাকেটের হাতল মুছে, মাটিতে তালু ঘষে মিনু বলল, ”আবার।”
নেটের কাছে এগিয়ে এসে চিনু বলল, ”স্যার, আমি সার্ভ করব না?”
”না। যতক্ষণ না চব্বিশটায় বারোটা বল ফেলছে, মিনু সার্ভ করে যাবে।”
মিনুর ছিয়ানব্বইটা সার্ভ শেষে সহদেব বললেন,”মোট তেরোবার, ফিফটিন পার্সেন্টও নয়। মিনু, তুমি সার্ভ করতে শিখেছ?”
”না সার। আমি আবার করব।” জেদি গলায় দাঁত চেপে মিনু বলল।
”হাত ভেরে গেছে তোমার, এবার চিনু।”
”না সার, আবার সার্ভ করব।”
”এখন থাক। তুমি কনসেনট্রেট করতে পারছ না। রুমালটা ছাড়া আর সব কিছু চোখ থেকে মুছে ফেলতে হবে মিনু। ওইখানে চুপ করে দাঁড়িয়ে জায়গাটার দিকে তাকিয়ে থাকো পাঁচ মিনিট।”
সহদেব রুমালটা তুলে এনে এধারের সার্ভিস বক্সের মাঝামাঝি জায়গায় পাতলেন। ”শুরু করো।” রিটার্ন করার জন্য মিনুর বদলে র্যাকেট হাতে তিনি বেস লাইনে দাঁড়ালেন।
চিনু সার্ভ করল চব্বিশটা, তার মধ্যে আটটা পড়ল রুমালে। সহদেবের মুখে পলকের জন্য খুশির ছোঁয়া লেগেই মিলিয়ে গেল।
”মিনু এবার ওধারে যাও, চিনু আমার পাশে এসো।” সহদেব আর চিনু ডানদিকের কোর্টে বেস লাইনের মাঝামাঝি দাঁড়াল, নেটের ওধারে মিনু। দু’ জনে সোজাসুজি বল মারছে তার দিকে। মিনু ব্যাকহ্যান্ড বা ফোরহ্যান্ডে বল ফেরত দিতে লাগল। সহদেব ক্রমশ একটু দূরে বল পাঠিয়ে তাকে বাধ্য করলেন যাতে ছুটে গিয়ে বল মারতে হয়। এর পর তিনি মারের তীব্রতা বাড়ালেন। সারা কোর্ট চষে ফেলে, এগিয়ে—পিছিয়ে দু’ পাশে ছুটে গিয়ে মুহূর্তের জন্যও থামার অবকাশ না পেয়ে মিনুকে বল ফেরাতে হচ্ছে। কখনও ডানদিকে ছুটে লম্বা করে হাত বাড়িয়ে, তার থেকে ভলি করে বা বেস লাইন থেকে কুড়ি গজের ব্যাকহ্যান্ড মেরে। এলোপাতাড়ি ফেরানো নয়, যতটা সম্ভব চিনু আর সহদেবের নাগালের মধ্যে তাকে বল রাখতে হচ্ছে।
পাঁচ মিনিট পরই মিনু দাঁড়িয়ে পড়ল। হাপরের মতো ওঠানামা করছে তার বুক। র্যাকেট কোর্টের ওপর ঠেকিয়ে তাতে শরীরের ভার দু’ হাতে রেখে মুখ নামিয়ে। সহদেব দু’ মিনিট মিনুর দিকে তাকিয়ে থেকে কঠিন স্বরে বললেন,”আবার।”
”একটু জিরোই সার।”
”না।” সহদেব চেঁচিয়ে বললেন,”ম্যাচ খেলতে খেলতে হাঁপিয়ে পড়লে কি পেটে যন্ত্রণা শুরু হলে, তখন কি তুমি খেলা বন্ধ করে জিরিয়ে নেবে?…যন্ত্রণার সঙ্গে সড়গড় হও। যন্ত্রণাকে হেসে উড়িয়ে দাও।”
”সার, আমি তো এখন ম্যাচ খেলছি না।” মিনু কাতর স্বরে বলল।
”না খেললেই বা! মনে মনে নিজেকে দেখো একটা শক্ত ম্যাচ খেলছ। তুমি পাঁচ মাইল দৌড়েছ, হাজারবার বল মেরেছ, শরীরের প্রতিটি ইঞ্চি যন্ত্রণায় টাটাচ্ছে। এগুলো সহজ করে দিতে পারবে যদি আগেই যন্ত্রণার সঙ্গে পরিচয় হয়ে যায়, যদি বুঝে নাও এটা কোনও বড় ব্যাপার নয়, এটা থাকবে না।” সহদেব কথা বলতে বলতে নেটের কাছে এলেন। ওয়ার্ক আউট থামিয়ে দিয়ে মাঝে মাঝে তিনি কথা বলেন দুই ভাইকে কাছে ডেকে নিয়ে। হাতছানি দিয়ে তিনি চিনুকে ডাকলেন।
