মিনুর একটা সার্ভ রিটার্ন করতে গিয়ে চিনুর র্যাকেটের কাঠে লাগল। বলটা অবশ্য মিস হিট সত্ত্বেও ফিরে এল নেটের এধারে।
”এখন তুমি নিজেকে কী বলবে?” সহদেব প্রশ্ন করলেন চিনুকে।
”বলটাকে নজর করো, বলটাকে নজর করো।”
”জোরে জোরে বলো যাতে শোনা যায়। ম্যাচ খেলার সময় তোমার হয়ে এই কথাগুলো আমি তো আর বলতে পারব না। তোমাকেই এটা সবসময় নিজেকে মনে করাতে হবে। জোরে বলো, কেউ শুনতে পেল কি না তাতে বয়েই গেল, নিজেকে শোনানোটাই আসল কথা।”
পরের বলটা যখন চিনুর দিকে আসছে সে চেঁচিয়ে বলল, ”বলটাকে নজর করো।” বলের দিকে চোখ রেখে সে মারল র্যাকেটের ঠিক মাঝখান দিয়ে। এর পর আবার একটা বল মিস হিট করতেই সারের শেখানো মতো সে চেঁচিয়ে নিজেকে ধমকাল,”বলটাকে নজর করছিস?”
সহদেব লক্ষ করেছেন মারের পেছনে জোর দেওয়ার জন্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গের প্রয়োগের মধ্যে যে সামঞ্জস্য দরকার, চিনুর সেটা চমৎকারভাবে রয়েছে। ফলে সে তার শরীরের ওজন প্রতিটি স্ট্রোকে চাপিয়ে দিয়ে যে জোরটা বার করে আনে সেটা তার চেয়ে বেশি বলবান মিনুরই সমান বা তার চেয়েও বেশি। তিনি মাঝে মাঝে অবাক হয়ে যান ছোটভাইটির দৈহিক পরিবর্তন দেখে। পাঁচ বছর আগে দেখা রোগা, ছোটখাটো, দুর্বল গড়নের ছেলেটি কোথায় যেন হারিয়ে গেছে। তার বদলে সতেজ চারার মতো বাহু ও পায়ের পেশি নিয়ে পাঁচ ফুটের কাছাকাছি লম্বা ছেলেটি যেন মহীরুহ হয়ে ওঠার আভাস দিচ্ছে। তিনি জানেন এর জন্য দায়ী হাড়ভাঙা নিয়মিত পরিশ্রম আর ছেলেটির মা।
সকালের কাজ, সহদেব বলেন, ‘ওয়ার্ক আউট’, চলে দেড়ঘণ্টা। কোর্টের দু’ধার থেকে অবিরাম একজন ব্যাকহ্যান্ড অন্যজন রিটার্নে ফোরহ্যান্ড মেরে যায় সহদেবের নির্দেশিত জায়গাগুলোয়। তিনি মনে মনে গোনেন।
হাত ব্যথা করায় কেউ যদি র্যাকেট নামিয়ে নেয় অমনই গর্জন ওঠে, ”ডোন্ট স্টপ, কন্টিনিউ, কন্টিনিউ…এখনও তেরোটা বাকি।”
ঘড়ি ধরে ঠিক আটটায় ওরা তিনজন বাড়ির পথ ধরে। মিনু জিজ্ঞেস করে, ”সার,আজ বিকেলে ভলি না সার্ভিস?”
”দুটোই। সার্ভ, রিটার্ন অ্যান্ড ভলি।…তিনবার বল হিট করার জন্য যদি কুড়ি সেকেন্ড ধরি, তা হলে মিনিটে তিনটে সার্ভ হলে দু’ ঘণ্টায় ক’টা হয়?” সহদেব নিরাসক্ত স্বরে সাইকেল ধরে হাঁটতে হাঁটতে বলেন। দুই ভাই আমতা আমতা করছে দেখে বললেন, ”দু’ ঘণ্টায় হয় তিনশো ষাট…এত জানি পারবে না। আমাদের পাঁচ—ছ’ ডজন বল নেই যে মেশিনগানের মতো ফায়ার করে যাবে। তার চেয়েও বড় কথা, এজন্য যে স্ট্যামিনা আর পাওয়ার দরকার, সেটাও এখনও তোমাদের গড়ে ওঠেনি…কিন্তু না উঠলেই বা, খাটতে খাটতেই গড়ে উঠবে। আজ দেখব কতখানি তোমরা পারো।”
দুই ভাই মুখ চাওয়াচাওয়ি করে।
”একটা ভাল ম্যাচ পাঁচ সেট গড়ালে কম করে পাঁচ মাইল কোর্টে ছোটাছুটি, বল হিট করতে হয়। এজন্য সবার আগে দরকার দুটো পায়ের জোর, শক্তি। যদি না বলের কাছেই যেতে পারো তা হলে বল মারবে কী করে?…যখন খুব টায়ার্ড হয়ে পড়ো তখন শরীরের কোন জায়গাটায় প্রথম ব্যথা শুরু হয়? তলপেটে। দৌড়লে তলপেটের মাসল মজবুত হয়। তোমরা এখন যতটা দৌড়চ্ছ সেটা আস্তে আস্তে এবার বাড়াতে হবে।”
”সার, স্কুলে যে ন’টার মধ্যে যেতে হবে!” দুই ভাইয়ের মধ্যে চিনু কিঞ্চিৎ অলস। সহদেবের দৌড় বাড়াবার পরিকল্পনাতে রাশ টানার চেষ্টায় সে বলল।
”ওইটেই তো হয়েছে মুশকিল…তোমাদের আর একটু বেশিক্ষণ কোর্টে থাকা দরকার।”
বাড়ি ফিরে স্নান সেরে খাওয়ার টেবলে বসে তিনজন। সহদেব আবার ছ’ মাইল সাইকেল চালিয়ে বাড়ি না গিয়ে, তন্ময় ও তপতীর অনুরোধে ছেলেদের ভাত খাওয়ার সঙ্গে ব্রেকফাস্ট করে নেন। চারখানা হাতে—গড়া রুটি, ডাল, তরকারি আর সামান্য আচার। মাছ—মাংস খান না। খেতে খেতে তিনি নজর রাখেন মিনু—চিনুর পাতের দিকে। ছেলেদুটির খিদে অসম্ভব বেড়ে গেছে, কিন্তু সেজন্য গোগ্রাসে পেট ভরিয়ে খাওয়া সহদেবের চোখের সামনে অন্তত চলবে না। তাঁর কথায়,”খাদ্যগুলোকে হজম হওয়ার জন্য নড়াচড়ার জায়গা দরকার, পেটটা একটু খালি রাখো। বলটা গায়ের কাছে এসে পড়লে স্ট্রোক নেওয়ার জন্য জায়গা করে নিতে হয়। মিনু, কথাটা বুঝলে?”
”বেলামাসি, আর ভাত নেব না।”
”নেবে না কেন? ভাত না খেলে গতর হবে কী করে?” বেলা ভাতের থালা হাতে কটমটিয়ে সহদেবের নির্বিকার মুখের দিকে তাকাল।
”গতর হবে, তবে গণেশ মার্কা নয়।”
”তবে কী মার্কা, মহিষাসুর?”
”হোক না মহিষাসুর! তবে ও নয়, ওর র্যাকেটটা।” সহদেব মুচকি হাসলেন, যেটা কদাচিৎ দেখা যায়। টেবল থেকে দুই ভাই উঠে পড়ল।
”দিদি, একটা কথা।” সহদেব তাকালেন এতক্ষণ চুপ করে বসে থাকা তপতীর দিকে। ”ওদের ওয়ার্ক আউটের সময় বাড়াতে হবে। স্কুল থেকে কি একঘণ্টা আগে ওদের ছুটি করানো যায়?”
”বলা মুশকিল। ওদের এখনকার হেডমাস্টার মিস্টার আচার্য চান মাধ্যমিকে ওঁর স্কুল থেকে নাইন্টি পারসেন্ট ফার্স্ট ডিভিশনে পাশ করুক। ছাত্ররা খেলাধুলো করুক, এটার ঘোর বিরোধী তিনি।”
”দুই ভাই স্কুল স্পোর্টসে এত যে ট্রফি জেতে, তার কোনও মূল্য নেই? ওদের জন্য স্পেশ্যাল কনসিডার করা উচিত, শুধু ওদেরই জন্য।”
”আজ বলব, জানি না কনসিডার করবেন কি না। …একটা কথা সহদেববাবু, আমরা দু’ বছরের জন্য মিনু—চিনুর টেনিসের পেছনে টাকা খরচ করব ঠিক করেছিলাম। কিন্তু আপনার হাতে পড়ে ওদের উৎসাহ আর খেলার মান এমন বাড়তে শুরু করল যে,আমরা আর বন্ধ করতে পারলাম না। এতে আমাদের আর্থিক দিক থেকে খুবই অসুবিধে হচ্ছে। ওদের ভাল জামা জুতো কিনে দিতে পারি না, প্রায়ই কলকাতায় বেড়াতে নিয়ে যেতাম, কিন্তু খরচের কথা ভেবে এখন আর তাও যেতে পারি না। বছরে একবার বাইরে কোথাও—দার্জিলিং, কি পুরী, কি জয়পুর বেড়াতে গেছি, কিন্তু গত পাঁচ বছর এই মহাদেবপুর ছেড়ে কোথাও আমরা যাইনি। খরচের ভয়ে অনেক সামাজিক কাজেও আমরা মিথ্যা অজুহাত দিয়ে যাইনি। আড়ালে অনেকেই আমাদের কঞ্জুস বলে থাকে। এই সবই আমরা সয়েছি একটা লক্ষ্য সামনে রেখে—আমাদের ছেলে দুটোর দিকে একদিন দেশের লোক তাকিয়ে থাকবে। এখন বলুন আমাদের আশা, আমাদের স্বপ্ন সফল হতে পারবে কি না, মিথ্যা মরীচিকার পেছনে ছুটছি কি না?” তপতী আবেগ চাপতে চাপতে একটানা কথাগুলো বলে উন্মুখ হয়ে সহদেবের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
