”মা, কাল একটা লোক অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে আমাদের খেলা দেখছিল!” চিনু বলল।
”আমিও লোকটাকে দেখেছি। কাঁচাপাকা চুল, সাইকেলে এসেছিল!” তন্ময় বললেন।
”তা হলে এই লোকটাই সহদেবদা। উনি সাইকেলেই কাছেপিঠে ঘোরেন।”
”বললে ছ’ মাইল, সেটা কি খুব কাছেপিঠে হল!” তন্ময় অবাক হলেন।
”ছ’ মাইলটা ওঁর কাছে নস্যি, কোনও ব্যাপারই নয়। বারো—চোদ্দো মাইল রেগুলার সাইকেলে ঘোরেন শরীরটাকে ফিট রাখার জন্য।”
”ঠাকুরপো, মিনু—চিনু সম্পর্কে কী বললেন উনি?” তপতী অধীর হয়ে উঠেছেন তাঁর ছেলেদের দেখে কী ধারণা হয়েছে জানার জন্য।
”সহদেবদা কম কথার মানুষ, শুধু বললেন, ‘গুড’। আর জিজ্ঞেস করলেন বাবা—মা লেগে থাকতে পারবে তো? আমি ওঁকে আপনাদের সম্পর্কে সবই বলেছি।”
”কত নেবেন?” ভয়ে ভয়ে তপতী জানতে চাইলেন।
রাজেন কিন্তু কিন্তু করে বলল,”এক একজনের জন্য একশো টাকা মাসে, একটু বেশিই হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু উনি এর কমে রাজি নন।”
তপতী চোখ বন্ধ করলেন। কী যেন ভেবে নিয়ে বললেন,”রাজি।”
”মাসে দুশো টাকা তো, হয়ে যাবে।” তন্ময় যোগ করলেন খুব সহজ গলায়।
তপতী দু’ হাতের তালু দুই ছেলের মাথায় রেখে হাসলেন। ওরা জড়িয়ে ধরল মাকে।
.
অতঃপর এক একটি ঋতু আসে আর চলে যায়, মিনু আর চিনু ধীরে ধীরে বড় হতে লাগল। দেখতে দেখতে কেটে গেল পাঁচটা বছর। সহদেব মিশ্রর কঠিন শিক্ষায় তারা ধাপে ধাপে খেলায় উন্নতি করে চলল। কোর্টের বাইরে তাদের প্রতিটি পদক্ষেপ স্নেহ আর শাসনের সতর্ক প্রহরার দ্বারা মসৃণ করে তোলার জন্য তপতী আর তন্ময় তাঁদের জীবনকে উৎসর্গ করে দিলেন। প্রতিদিন ভোরে কি শীতে কি বর্ষায় দুই ভাইকে ছুটতে দেখায় মহাদেবপুর অভ্যস্ত হয়ে গেছে। খরচ বেড়েছে। নতুন দু’ জোড়া র্যাকেট কিনতে হয়েছে। আর কিনতে হয় প্রতি মাসে দু’ ডজন বল। দু’ দিকের বেস লাইনের পেছনে ছ্যাঁচাবাঁশের দরমা দিয়ে দশ ফুট উঁচু বেড়া তোলার জন্য প্রায় পাঁচশো টাকা খরচ করতে হয়েছে তন্ময়কে। এই বেড়া দেওয়ার ব্যাপারে ছোটখাটো অশান্তিও ঘটে গেল ক্লাবে। কমিটির অনেকেই আপত্তি তুলেছিল এই বলে, টেনিস কোর্টের জমিটা ক্লাবের সম্পত্তি। সেটা প্রাইভেট কোচিংয়ের জন্য ব্যবহার করতে এবং বেড়া তুলতে দেওয়া যায় না।
প্রতিবাদ করেছিল রাজেন। তার বক্তব্য : মেম্বারদের ছেলেমেয়েদের যে কেউই চাঁদা দিয়ে খেলতে পারে, টাকা দিয়ে কোচিং নিতে পারে। কিন্তু দুটি ছেলে ছাড়া যদি আর কেউ না আসে তা হলে ক্লাব কী করতে পারে? ছেলে দুটিকে কি খেলা বন্ধ করে দিতে হবে? তা ছাড়া ক্লাবকে তো এখনও পর্যন্ত একটা পয়সাও খরচ করতে হয়নি? ক্লাব থেকে পাওয়া গেছে শুধু পুরনো ফুটোয় ভরা একটা নেট। কোর্টের ঘাসকাটা, জল দেওয়া, ঘাস লাগানো ইত্যাদি কাজ করে কান্তি। সেজন্য ক্লাবের কাছ থেকে সে বাড়তি পারিশ্রমিক কখনও চায়নি। তা হলে আপত্তি উঠছে কেন? রাজেন আরও বলেছিল, শুধু তাস আর ক্যারাম খেললেই ক্লাব হয় না, আউটডোর খেলারও ব্যবস্থা থাকা চাই। এর পরও রাজেন এম জে টি এম—এর ম্যানেজিং ডিরেক্টরের সঙ্গে দেখা করে সবিস্তার জানায় তপতী ও তন্ময়ের এই টেনিস কোর্টটিকে পুনরুজ্জীবিত করার কথা। এজন্য তাদের কত কষ্ট ও পরিশ্রম করতে হয়েছে এবং এখনও হচ্ছে, সে কথাও রাজেন বলে। খুব মনোযোগ দিয়ে শুনে এবং সেক্রেটারি কমল ভট্টাচার্যকে ডাকিয়ে এনে এম ডি নির্দেশ দেন ক্লাব মেম্বারদের ছেলেরা প্রাইভেট কোচিংয়ের জন্য কোর্ট ব্যবহার করতে এবং খেলার সুবিধার জন্য বেড়াও তুলতে পারবে। তিনি মনে করিয়ে দেন মহাদেবপুরের যাবতীয় জমির মালিকই এম জে টি এম।
এই ধরনের ছোটখাটো বাধা ছাড়া মিনু বা চিনুর খেলা তরতরিয়ে এগিয়েছে। তপতী ভোরে আর ছেলেদের সঙ্গে বেরোন না, তবে অতিরিক্ত ধকল এড়াতে দুই ছেলেকে বাড়ি থেকে স্কুলে আর স্কুল থেকে টেনিস কোর্টে পৌঁছে দেওয়ার জন্য তিনি গাড়ি নিয়ে বেরোন। শুধু দু’বারই সারাদিনে ভক্সহলকে ব্যবহার করা হয়। সাড়ে তিনটেয় স্কুল ছুটি হওয়ামাত্র দু’জনে ছুটতে ছুটতে এসে গাড়িতে ওঠে। যেতে যেতে গাড়ির মধ্যেই তপতীর হাতে গড়া চিজ স্যান্ডুইচ আর কলা খেয়ে নেয়, জুতো, শর্টস, জামা বদলে নেয় যাতে কোর্টে নামতে একমিনিটও দেরি না হয়। ‘সার’ ছ’ মাইল সাইকেল চালিয়ে এসে কোর্টের ধারে চেয়ারে অপেক্ষা করছেন তাদের জন্য। দেরি হলে বলবেন, ”পাঁচ মিনিট পিছিয়ে পড়লে,পঁচিশটা সার্ভিস কমে গেল।”
ভোর ঠিক পাঁচটায় বাংলোর ফটকে ‘ক্রিং ক্রিং’ দুবার সাইকেলের বেল বাজবে। অন্ধকার থাকতেই সহদেব ছ’ মাইল সাইকেল চালিয়ে এসে হাজির হয়ে যান। মিনু—চিনু অপেক্ষা করে থাকে, বেল বাজার সঙ্গেই বেরিয়ে আসে র্যাকেট হাতে। ওরা ছুটতে শুরু করে, ওদের পাশে পাশে একটা নির্দিষ্ট গতিতে সাইকেল চালান সহদেব। প্রথমে দৌড়ত তিন মাইল, এখন সেটা উঠেছে পাঁচ মাইল। সারা মহাদেবপুরটাকে তিনবার চক্কর দিয়ে ওরা আসে কোর্টে।
বালতি ভর্তি দু’ ডজন বল নিয়ে শুরু হয় প্র্যাকটিস। কোর্টের একদিক থেকে পরের পর সার্ভ করে যায় মিনু। অন্যদিক থেকে সেগুলো রিটার্ন করে চিনু। সহদেব কোর্টের ধারে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে শুধরে দেন কারোর কোনও ভুল হলে। নিজে পাশে গিয়ে দেখিয়েও দেন।
