”পঙ্গু হয়ে যেতে পার শুনেও?” তন্ময় বিরক্তি চাপতে পারলেন না।
”ঝুঁকি নেব দুটো বছর। খরচ যাই হোক, মিনু কি চিনুকে দেশের লোক চিনবে—আমি তাই চাই। তুমিও কি চাও না ওরা টেনিসের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠা পাক?…ঝুঁকির ভয়ে আমি পিছিয়ে যাব না।” ধীর অচঞ্চল স্বরে তপতী বললেন। সঙ্কল্পে তাঁর মুখ কঠিন হয়ে উঠেছে।
”ভোরে বেরোনো বন্ধ হয়ে রয়েছে, আমিই ওদের নিয়ে বেরোব।” তন্ময় উঠে দাঁড়ালেন। ঝুঁকি নিতে তিনি প্রস্তুত এমন একটা ভাব তাঁরও মুখে।
পরদিন ভোরে মিনু এক দুর্ঘটনা ঘটিয়ে ফেলল। বাথরুমে পা পিছলে মুখ থুবড়ে পড়ে গিয়ে তার কপাল কাটল, গালে কালশিটে পড়ল আর ডান হাঁটু ফুলে উঠল। দিন সাতেক লাগল তার সবগুলো আঘাত সেরে উঠতে।
অতঃপর এক ভোরে তন্ময় দুই ছেলের সঙ্গে ছুটতে বেরোলেন। যে পথ ধরে মিনু আর চিনু ফেরিঘাট পর্যন্ত গিয়ে ফিরে আসত, তিনজন সেই পথই ধরল। তন্ময়ের অভ্যাস নেই এতটা দৌড়বার। তিনি ফেরিঘাট পৌঁছবার আগেই কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন।
”হ্যাঁ রে তোদের মা এতটা ছুটত কী করে?”
”মা তো ছুটত না, জোরে হাঁটত। আমরা ছুটতাম।” চিনু বলল, ”তুমি হাঁটো আমরা ছুটটে ফেরিঘাট ছুঁয়ে ফিরে আসছি।” মিনু খুবই সহানুভূতির সঙ্গে জানিয়ে দিল ”দশ মিনিটেই ফিরব।”
”তাই যা, আমি একটু জিরোই।” দুই হাঁটুতে হাত রেখে তন্ময় ঝুঁকে পড়লেন।
বাড়িতে ফিরেই তিনি স্ত্রীকে বললেন, ”আমার দ্বারা ছোটা হবে না, রাজেনকে আজই বলব একজন কোচ ঠিক করে দিক।”
”বিকেলে মিনুকে কি স্কুল থেকে ক্লাবে নিয়ে যেতে পারবে?”
”পারব। কিন্তু খেলতে তো পারব না তোমার মতো।”
”তোমায় খেলতে হবে না, ওরাই খেলবে। নিজেদের মতো করে।…অফিস থেকে বাড়ি এসে চিনুকে নিয়ে গাড়িতে করেই যেয়ো।”
তন্ময় যথেষ্ট আগেই অফিস থেকে বেরিয়ে হেঁটে বাড়িতে এলেন। গাড়ি বার করে চিনুকে নিয়ে স্কুলে গেলেন, সেখান থেকে মিনুকে তুলে নিয়ে ক্লাবে। কোর্টের ধারে একটা চেয়ারে বসলেন।
নেটের দুধারে দুই ভাই, বয়স দশেরও কম। মিনু বলল,”আমি জোরে জোরে মারব তুই বল ধরে সঙ্গে সঙ্গে ছুড়ে ফেরত পাঠাবি। আমি আবার মারব।”
কথা মতোই চিনু কাজ করল। অবশ্য বল ধরতে তাকে কোর্টের নানা দিকে ছুটতে হল, কেননা মিনুর জোরালো মারের কোনও নিয়ন্ত্রণ ছিল না। একসময় চিনু হাঁফিয়ে পড়ল।
”দাদা, আমি আর পারব না। তুই একাই মারবি আর আমি বুঝি মারব না।”
”তা হলে তুই র্যাকেট ধর, আমি ছুড়ে ছুড়ে দিচ্ছি।”
ওরা যখন নিজেদের মধ্যে ফোরহ্যান্ড, ব্যাকহ্যান্ড, সার্ভিস ও ভলি মারায় ব্যস্ত সেই সময় নিমগাছের তলায় সাইকেল থেকে একটি বয়স্ক লোক নামলেন। এক হাতে সাইকেলটা ধরে তিনি দুটি ছেলের দিকে তীক্ষ্ন নজরে তাকিয়ে রইলেন।
লোকটির পরনে সাদা শর্টস আর নীল স্পোর্টস শার্ট। পায়ে সাদা ময়লা কেডস। লম্বায় ছ’ ফুটের ওপর, গড়ন ছিপছিপে হলেও পেশিগুলো শুকনো দরকচা নয়। বলিষ্ঠ দুটো পা দেখে বোঝা যায় লোকটি পরিশ্রমী, দুই কাঁধের পেশিতেও সেই আভাস। মুখ ঈষৎ লম্বাটে, নাকের পাশে গভীর ভাঁজ, গালেও। মুখখানি বহু অভিজ্ঞতায় পোড়খাওয়া। ছোট করে কাটা চুল কাঁচাপাকায় মেশানো। লোকটিকে ফিরে রয়েছে কঠিন এমন এক আবরণ, যা থেকে মনে হতে পারে তিনি লোকজনের সঙ্গে মেলামেশা পছন্দ করেন না। তাঁর বয়স অনুমান করা শক্ত, তবে পঞ্চাশের নীচে নয়, এইটুকু বলা যেতে পারে।
প্রায় আধ ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকে তিনি দুটি বাচ্চচার নিজেদের মধ্যে খেলা দেখলেন। দেখতে দেখতে তাঁর চোখে কখনও হাসি ফুটে উঠল, কখনও প্রসন্নতা, কখনও কুঁচকে উঠল কপাল। একটা বল তাঁর পায়ের কাছে এসে পড়লে তিনি বলটা হাতে তুলে দাঁড়িয়ে থাকেন। চিনু ছুটে এসেছিল।
”কার কাছে খেলা শিখছ?” লোকটি বললেন। মৃদু গম্ভীর অন্তরঙ্গ স্বর।
”মার কাছে।”
লোকটির ভ্রূ কুঁচকে উঠল। ”কোথায় মা, তোমরা তো একা একাই খেলছ!”
”মার পায়ে ব্যথা, আসেনি…বলটা দিন।”
”উনি কে, ওই যে চেয়ারে বসে?”
”বাবা।…দিন না।”
”নাম কী তোমার?”
”চিন্ময় বসুমল্লিক।”
চিনুর হাতে বলটা দেওয়ার সময় তিনি বললেন,”জুতোর ফিতেটা খুলে গেছে, বেঁধে নাও।”
পরের দিন সন্ধ্যায় রাজেন এল। তপতী তখন দুই ছেলেকে পড়াচ্ছিলেন।
”বউদি, একজনকে পেয়ে গেছি। সহদেব মিশ্র। আজ দুপুরে অফিসে এসে বলে গেলেন তিনি রাজি।…খুব অভিজ্ঞ, আমিও ওঁর কাছে কোচিং নিয়েছি কিছুদিন…খুব কড়া কোচ, সাউথ ক্লাবে অনেকদিন আছেন। এই মাইল ছয়েক দূরে হুগলিতে ওঁর বাড়ি, একা মানুষ, বউ মারা গেছে, মেয়ের বিয়ে দিয়ে দিয়েছেন, বাড়ির একটা ঘরে থাকেন, বাকিটা ভাড়া দিয়েছেন। কোচিং আর ভাল লাগছে না তাই ছেড়ে দেবেন ঠিক করেছেন। বড়লোকদের ছেলেমেয়ে, কেউ বড় প্লেয়ার হওয়ার জন্য তো কোচিং নেয় না, অত খাটুনি ওদের পোষাবে কেন? একশো—দুশো টাকা দিয়ে কোচ রেখেছি, হাতে র্যাকেট নিয়ে ঘুরছি, অভিজাত ক্লাবে যাচ্ছি, এইটে দেখাবার জন্যই তো ওদের খেলার ভান করা। সহদেব মিশ্র তাই বিরক্ত হয়ে ঠিক করেছেন আর কোচিং করে সময় নষ্ট করবেন না। তবে মাসকাবারে কিছু টাকা তো ওঁর দরকার, তাই বাড়িতে গিয়ে ওঁকে ধরে বললাম,’সহদেবদা; দুটো বাচ্চচা ছেলে আছে, আপনার বাড়ি থেকে বেশি দূরে নয়, নেবেন ওদের?’ রাজি হননি। অনেক বলার পর বললেন,’আগে ওদের দেখব, তারপর হ্যাঁ কি না জানাব।’ আমার কাছ থেকে ক্লাবের হদিসও নিলেন।”
