মিনুর তর সইছে না। আবার গাড়ি চলা মাত্র সে বলল ”তারপর?”
”তারপর তিনি চাকরি ছেড়ে দিয়ে সবকিছু বিক্রি করে যা টাকা পয়সা পেলেন তাই নিয়ে দিল্লি থেকে তামিলনাড়ুতে গ্রামের বাড়িতে ফিরে এলেন। সেখানে একটা ক্লে কোর্ট বানালেন, গ্রামে মাটি দিয়ে লেপা উঠোন দেখেছ তো?”
”না দেখিনি।” মিনু বলল।
”মহাদেবপুরের পাশেই তো গ্রাম, একদিন গিয়ে দেখে নিয়ো। গোবর জল আর মাটি দিয়ে লেপা, একেবারে সিমেন্টের মেঝের মতো তকতকে হয়। সেইরকম কোর্টে তিনি ছেলেকে দিনের পর দিন হাতে ধরে টেনিস শেখালেন। ছেলেও রোজ ঘণ্টার পর ঘণ্টা প্র্যাকটিস করল, সেই সঙ্গে লেখাপড়াও। তারপর এল মাদ্রাজ শহরে। তারপর একের পর এক চ্যাম্পিয়নশিপ জিতল। এখন কৃষ্ণন ভারতের সেরা।
”বুঝলে, মিনু, বাবা বিরাট ঝুঁকি নিয়ে ছিলেন ছেলেকে বড় প্লেয়ার বানাবার জন্য, ছেলেও সেটা বুঝেছিল। আর তাই সে মন প্রাণ দিয়ে খেটে গেছে বাবার স্বপ্নকে সত্যি করে তুলতে।”
”মাও খুব খাটে।” চিনু বলল।
কিছুক্ষণ কেউ কোনও কথা বলল না। একসময় রাজেন আড়চোখে দেখল মিনু তার ভাইয়ের কানের কাছে মুখ নিয়ে কথা বলছে। তার কানে এল দুটো কথা, ”মারও স্বপ্ন আছে।” চিনু বলল, ”বাবারও আছে।” শুনে রাজেনের মুখে হাসি ফুটে উঠল।
অধীর হয়ে তপতী অপেক্ষা করছিলেন ওদের ফেরার জন্য। ফিরে এসেই দুই ভাই কলকল করে শুরু করল যা দেখে এসেছে তার বর্ণনা দিতে। কৃষ্ণন আর হলস্ট্রোমের ভলি, লব, সার্ভিস, ফোরহ্যান্ড, ব্যাকহ্যান্ড যা কিছু দেখেছে, দুই ভাই র্যাকেট হাতে মাকে সেগুলো দেখাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। তন্ময় মুখে হাসি নিয়ে তপতীর মতোই চোখে বিস্ময় ফুটিয়ে দেখে গেলেন।
বেলা এসে তাড়া দিল রাতের খাবার খেয়ে নেবার জন্য। এই ব্যাপারে বাড়ির নিয়ম ভীষণ কড়া। অনিচ্ছুক দুই ভাই খাবার ঘরে চলে যেতেই তপতী বললেন, ”ঠাকুরপো, এদের উৎসাহ তো আপনি চাগিয়ে দিলেন, এবার আমি সামলাই কী করে।”
”উৎসাহের আগুন তো আপনিই জ্বালিয়েছেন, আমি শুধু একটু বাতাস দিলাম। কিন্তু সমস্যাটা সত্যিই এবার এসে পড়েছে। টপ ক্লাস টেনিস কী বস্তু, ওরা আজ তা দেখল; কিছু বুঝেছেও হয়তো। ওরা এবার চাইবে কৃষ্ণন কি হলস্ট্রোমের নকল করে বল মারতে। এবার তো সেই সুযোগগুলো ওদের জন্য করে দিতে হবে, অবশ্য যদি…” রাজেন থেমে গেল।
উৎকণ্ঠিত তন্ময় বললেন, ”যদিটা কী?”
”আগে ঠিক করুন ওদের বড় খেলোয়াড় বানাতে চান, না ডাক্তার, এঞ্জিনিয়ার,ব্যারিস্টার করতে চান? যদি ডাক্তার এঞ্জিনিয়ার করতে চান তা হলে খেলাটাকে সিরিয়াসলি নেবার দরকার নেই। দুজনে যেভাবে চালাচ্ছে চালাক, একটু আধটু ছুটুক আর মন দিয়ে পড়াশুনো করুক। কিন্তু দাদা, দেশে প্রচুর ডাক্তার, উকিল, জজ—ব্যারিস্টার আছে, কজনের নাম দেশের লোক জানে? কিন্তু কৃষ্ণনের নাম করুন, বহু লোক তাকে চিনবে। মিলখা সিং, শৈলেন মান্না, পঙ্কজ রায়, ভিনু মানকাদ, লক্ষ লক্ষ লোক এঁদের নাম জানে, ঠিক কি না?”
স্বামী—স্ত্রী দুজনেই মাথা নাড়লেন।
”আমি লক্ষ করেছি টেনিস ওরা ভালবাসে, খেলতেও চায়। বড় প্লেয়ার হওয়ার জন্য যে ইচ্ছাটা থাকা দরকার, এই বয়সেই ওদের মধ্যে সেটা ফুটে উঠছে। সেটাকে যদি আরও ফুটিয়ে তোলা যায়, আমার ধারণা ওরা টেনিসে কিছু একটা করে দেখাবে।”
”তুমি বলছ রাজেন?” তন্ময়ের চোখ জ্বলজ্বল করছে ভেতরের উত্তেজনায়।
”হ্যাঁ বলছি। বিরাট ঝুঁকি নেওয়া হবে ঠিকই, কিন্তু কোনও বড় কাজই ঝুঁকি না নিয়ে করা যায় না। আপনি দুটো বছর ওদের সময় দিন। যদি বোঝেন কিছু হবে না, ভস্মে ঘি ঢালা হচ্ছে, তখন নয় বন্ধ করে দেবেন, যদি বোঝেন হবে, তা হলে অল আউট ওদের পিছনে খরচ করবেন।”
”খরচ!” তপতী নড়েচড়ে সোজা হয়ে বসলেন।
”হ্যাঁ খরচ। ওদের জন্য কোচ রাখতে হবে, তাকে টাকা দিতে হবে।”
”কত টাকা।”
”এখনই বলতে পারব না। খোঁজখবর করে দেখি ভাল কাউকে পাই কি না। এতটুকু ছেলেদের কোচ করতে কলকাতা থেকে আসতে কেউ রাজি হবে কি না সেটাও তো দেখা দরকার। তবে দাদা—বউদি, আপনাদের একটা কথা বলে রাখি, ভেবেচিন্তে নামবেন। শুধু আমার কথা শুনে তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত নেবেন না।…টেনিস খেলে টাকা রোজগার করা যায় না ঠিকই, কিন্তু নাম করতে পারলে ভাল চাকরি, খ্যাতি, সম্মান এগুলো তো পাবে। …প্রতি বছর ভারতে লক্ষ লক্ষ ছেলে কলেজ থেকে বেরোচ্ছে, কিন্তু কৃষ্ণন তো একটাই।”
।।৬।।
রাজেন চলে যাবার পর তন্ময় ও তপতী অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইলেন। দুজনের মাথায় ঘুরছে একই চিন্তা আর কয়েকটা কথা—’দুটো বছর ওদের দিন’…’ওরা টেনিসে কিছু একটা করে দেখাবে’…কৃষ্ণন তো একটাই।’
”তা হলে কী করা যায়, কোচ রাখব?” তন্ময় স্ত্রীর কাছে পরামর্শর থেকে যেন সমর্থনই চাইলেন।
”খরচ বাড়বে, তা ছাড়া ঝুঁকিও রয়েছে।” তপতী চিন্তিত স্বরে মনে করিয়ে দিলেন।
”তোমার পায়ের যা অবস্থা তাতে ডাক্তার যা বলে গেলেন সেটাই করা উচিত, কোর্টে নামা একদম বন্ধ। আবার যদি ফুলে ওঠে কি যন্ত্রণা শুরু হয়, তা হলে কী হতে পারে সেটাও তো শুনলে ওঁর কাছে।”
”জন্মের মতো পঙ্গু হয়ে যেতে পারি। কিন্তু আমি কোর্টে না নামলে কে ওদের…।” তপতী থেমে গেলেন। স্বামীর মুখের দিকে অপলক কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে আচমকা বললেন, ”আমি ঝুঁকি নেব।”
