হলস্ট্রোম সার্ভ করছে। রাজেন আড়চোখে তার ডানপাশে বসা চিনুর ডান হাতের আঙুলগুলোর দিকে তাকাল। হলস্ট্রোম বলধরা বাঁ হাত সামনে বাড়িয়ে উঁচুতে তুলতে—তুলতে বলটাকে শূন্যে ছুড়ে দিল। রাজেন দেখল, বাচ্চচা ছেলেটার বাঁ হাত গলার কাছে উঠে ফুলের পাপড়ির মতো আঙুলগুলো খুলে গিয়ে কাল্পনিক বলটাকে শূন্যে ভাসিয়ে দিল। ডান হাতের মুঠো কাঁধের কাছে, র্যাকেট ধরা কব্জিটা মোচড়ানো, পিঠটা ধনুকের মতো বাঁকিয়ে চেয়ারে কাঁধ ঠেকে গেছে। তারপরই চিনুর কোমর থেকে ঊর্ধ্বাঙ্গ হলস্ট্রোমের সার্ভিসের সঙ্গে সঙ্গে সামনের দিকে ঝুঁকল আর ডান কব্জিটা চাবুক মারার মতো সামনে ঝাপটা দিল।
রাজেনের অবাক চোখ হঠাৎ চিনুর নজরে আসতেই সে লজ্জা পেয়ে হাত দুটো কোলের কাছে গুটিয়ে নিল। হলস্ট্রোমের সার্ভিস কৃষ্ণনের ডান দিকে সার্ভিস কোর্টের মাঝামাঝি পড়েছে, সে ডান দিকে সামান্য হেলে সপাটে ফোরহ্যান্ড রিটার্ন মারল ডাউন দ্য লাইন। বেস লাইনের ছ’ ইঞ্চি আগে সাইড লাইনে বল পড়ল। উত্তেজনায় মিনু উঠে দাঁড়িয়েছে।
”লাভ ফার্টি।” মাইকে ঘোষণা করলেন আম্পায়ার।
”মারটা মনে থাকবে তো?” রাজেন ফিসফিস করে বলল। মিনু মাথা হেলাল। ”কৃষ্ণনের ব্যাক হ্যান্ড মনে থাকবে তো?”
”হ্যাঁ। আর একটু হলেই বলটা বাইরে পড়ত।…রাজেনকাকা, কৃষ্ণন খুব প্র্যাকটিস করে?”
”করে, আর সেজন্যই মারগুলো এত মাপা হয়।”
”ফিফটিন ফর্টি।”
হলস্ট্রোমের লব কৃষ্ণনের মাথার ওপর দিয়ে বেস লাইনের কাছে পড়েছিল, কৃষ্ণন পিছু হটতে পারেনি।
”দেখলে মিনু, ফিজিক্যাল ফিটনেসে কৃষ্ণন কত পিছিয়ে। শুধু শট নিতে পারলেই হয় না, খুব চটপটে খুব ফাস্ট মুভ করার জন্য শরীরও তৈরি করতে হবে।”
”দৌড়লে হবে?” চিনুর প্রশ্ন।
”বড় প্লেয়াররা রোজ সাত—আট মাইল দৌড়য়! ব্যায়ামও করে।” রাজেন ফিসফিসিয়ে বলল।
”দাদা, আমরা কতটা দৌড়ই রে?”
”চুপ, চুপ।” রাজেন ঠোঁটে আঙুল দিল। হলস্ট্রোম সার্ভ করছে। ম্যাচে এই নিয়ে প্রায় আশিবার। এত সার্ভিস দেখার পর, রাজেনের মনে হল, বাচ্চচা দুটো নিশ্চয় এর ছবি মনের মধ্যে তুলে রেখে দেবে। প্রচণ্ড জোরালো সার্ভিস করে এই সুইড। কিন্তু শুধু জোরে সার্ভ করতে পারলেই যে ম্যাচ জেতা যায় না, কৃষ্ণন সেটা আজ বুঝিয়ে দিয়েছে।
”থার্টি ফর্টি।” হলস্ট্রোমের সার্ভিস এস হয়েছে।
আবার সার্ভ করল। ফোরহ্যান্ড রিটার্ন কৃষ্ণনের। বলটা উঁচু হয়ে মাঝ কোর্টে। ডান দিকে ভলি মারল হলস্ট্রোম। কৃষ্ণন যেন আগাম জানতই বল কোথায় আসবে। বাঁ দিকে সরে গিয়ে সে অপেক্ষা করছিল। হলস্ট্রোমের কোমরের পাশ দিয়ে আড়াআড়ি মারা একটা ঝলসানো ব্যাকহ্যান্ডে বলটা বেস লাইনের কাছে পড়ে বেরিয়ে গেল। বিস্ফারিত চোখে হলস্ট্রোম একবার তাকিয়ে দেখে নেটের দিকে এগিয়ে গেল হাত বাড়িয়ে। হাজার দুয়েক লোক দাঁড়িয়ে উঠে হাততালি দিচ্ছে, তাদের সঙ্গে মিনু—চিনুও। উত্তেজনায় দু’জনের মুখ টসটস করছে।
মহাদেবপুরে ফেরার সময় গাড়ি চালাবার ফাঁকে রাজেন পাশে বসা দুই ভাইকে বলল, ”আজ যা—যা দেখলে সব যেন মনে থাকে।”
”অত জোরে জোরে মারলে যদি মায়ের পাশ দিয়ে বল বেরিয়ে যায়!” চিনুর সামনে এখন এটাই প্রকাণ্ড সমস্যা।
”তুমি কি এখনই অত জোরে জোরে মারতে পারবে?” হালকা সুরে রাজেন বলল।
”না। তবে দাদা জোরে মারতে পারে।”
”ধ্যাত, জোরে মারি নাকি? জোরে মারলে বল এধার—ওধার চলে যায়, মার তাতে অসুবিধে হবে না? জানেন রাজেনকাকা, মা যেখানে দাঁড়ায় ঠিক সেই জায়গাটা লক্ষ্য করে আমরা দু’জনেই বল মারি। আস্তে না মারলে কি ঠিক জায়গায় বল পাঠানো যায়?” বিচক্ষণের মতো মিনু বলল।
”তা বটে, আস্তে আস্তে মেরেই শুরু করতে হয়। কিন্তু মিনু, মার অসুবিধের কথা ভেবে কতদিন তুমি আস্তে মারবে? জোরে জোরে না মারলে বড় প্লেয়ার হবে কী করে? তুমি তো বড়ই হতে চাও, চাও না?”
রাজেনের কথাগুলো এবার মিনুকে সমস্যায় ফেলে দিল। মাকে সে ভালবাসে, আবার বড় প্লেয়ার হওয়ার ইচ্ছাটাও কৃষ্ণনকে দেখার পর তার মধ্যে আলোড়ন তুলছে। তার ছোট্ট মাথা এমন একটা কঠিন অবস্থায় আগে কখনও পড়েনি।
”তুমি তো দাবা খেলেছ। রাজার কিস্তি হতে পারে এমন একটা অবস্থা তো খেলায় একসময় আসবেই। সেজন্য তুমি আগে থেকে নিশ্চয়ই ভেবে রাখো কী কী চাল দেবে, রাখো না কি?” রাজেন সামনের ভিড়—রাস্তায় রাখা সতর্ক দৃষ্টিটা পলকের জন্য ঘুরিয়ে মিনুর মুখটা দেখার চেষ্টা করল। তার মনে হল ছেলেটি উত্তর খোঁজার চেষ্টা করছে।
হঠাৎ চিনু বলে উঠল, ”আচ্ছা রাজেনকাকা, কৃষ্ণন কি মায়ের সঙ্গে খেলত?”
হো হো করে হেসে ওঠার ইচ্ছেটা দমন করতে হল রাজেনকে। জি টি রোডের সালকিয়া, লিলুয়া, বেলুড়ের দিকটায় গাড়ি চালাতে চালাতে সন্ধ্যার মুখে হেসে ওঠা যায় না। সরু রাস্তা, রাস্তায় দোকান, গাঁক গাঁক করা ট্রাক আর বাস এবং ছুটির দিনের বিশৃঙ্খল ভিড় ঠেলে মোটর গাড়িকে এগোতে হয় চোখ কান খুলে।
”চিনু, তুমি কিন্তু নিজের অজান্তেই একটা ভাল বিষয় তুলেছ। কৃষ্ণন ছোট বেলায় মায়ের সঙ্গে নয়, বাবার সঙ্গে খেলত। ভদ্রলোক দিল্লিতে চাকরি করতেন। ঠিক করলেন ছেলেকে বড় টেনিস প্লেয়ার করবেন।” রাজেন ব্রেক কষল। এক স্ত্রীলোক ছুটে রাস্তা পার হচ্ছিল কোমরে একটা শিশুকে নিয়ে। হঠাৎ গায়ের পাশে গাড়ি দেখে দিশাহারা হয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছে।
