এক জায়গায় দাঁড়িয়ে ওরা বল ফেরাচ্ছে। তপতী এবার বলগুলো ফোরহ্যান্ডের দিকে একটু—একটু করে সরাতে লাগলেন। ডান হাত লম্বা করে পাশে বাড়িয়ে ওদের ভলি করতে হবে। দু’বার চিনু পারল না, ওর থেকে বলিষ্ঠ মিনু পারল। তপতী একটা ব্যাপারে সচেতন হলেন, গায়ের জোর না বাড়ালে তাঁর ছেলেরা খেলোয়াড় হতে পারবে না। এই প্র্যাকটিস বেশিক্ষণ নেওয়ার মতো গায়ের তাগদ চিনুর নেই, মিনুর কিছুটা আছে। কিন্তু যথেষ্ট নয়।
নিমগাছের সামনে অনিরুদ্ধর বাবার গাড়ি এসে থামল। তিনি গাড়ি থেকে নেমে দেখলেন, ছেলে চেয়ারে বসে তার ঠাকুমার সঙ্গে। অন্য দুটি ছেলে তাদের মায়ের সঙ্গে খেলছে। ভ্রূ কুঁচকে গেল তাঁর।
”অনি খেলছ না?” বাবা জানতে চাইলেন।
অনিরুদ্ধ ঠাকুমার দিকে তাকাল। ঠাকুমা ব্যাজার মুখে বললেন,”ওঠ।” নাতি চেয়ার থেকে উঠল র্যাকেট হাতে।
”কী ব্যাপার!” বিস্মিত বাবা তাঁর মায়ের দিকে তাকালেন।
”খেলবে না অনি।” ঠাকুমা নাতিকে টানতে টানতে গাড়ির দিকে রওনা হলেন।
”কী ব্যাপার মিসেস বসুমল্লিক, অনি খেলবে না কেন?”
তপতী ঘামে ভেজা মুখ আঁচল দিয়ে মুছতে মুছতে বললেন,”আমি ঠিক বলতে পারব না, তবে মাসিমার কথা থেকে মনে হল উনি পছন্দ করছেন না অনিরুদ্ধর ওপর কোনওরকম চাপ দিই। ওর ফোরহ্যান্ডটা ঠিক করার জন্য বারবার ওকে বল দিচ্ছিলাম। মাসিমা সেটাকে কুলিমজুরের মতো খাটানো মনে করলেন।”
অনিরুদ্ধর বাবার মুখ অপ্রতিভ দেখাল। তিনি আড়ষ্ট স্বরে বললেন, ”খেলাধুলো করতে গেলে তো খাটতেই হবে। আর খাটবার জন্যই তো ওকে এখানে পাঠিয়েছি। দিন—দিন কী রকম মোটা হয়ে যাচ্ছে!”
তপতীর মনে হল ভদ্রলোক তাঁর মায়ের উলটোটি। ছেলেকে মাত্রাতিরিক্ত যত্ন—আদর দিয়ে নষ্ট করতে চান না।
”অনিরুদ্ধর শরীর যথেষ্ট ফিট নয় বলেই ওর বডি কোঅর্ডিনেশন খারাপ। ওর হাত, পা, মাথা, কোমর একসঙ্গে কাজ করে না। সেটাই যথাসম্ভব করাবার চেষ্টা করছিলাম।”
”ঠিকই করেছেন। আমি ওকে পাঠিয়ে দিচ্ছি। তবে কী জানেন, আমার মার আবার নাতি—অন্ত প্রাণ, আমার স্ত্রীও একমাত্র ছেলেকে নয়নের মণি করে রেখেছেন। মার ইচ্ছার বিরুদ্ধে কিছু বলাও যায় না। অনি সম্পর্কে একটু কড়া হলেই সংসারে অশান্তি বেধে যায়, তাই আমি আর কিছু বলি না। যাই, ওকে খেলতে আসার জন্য বলি গিয়ে।” হতাশ এবং তিক্ত মুখ করে তিনি গাড়ির দিকে এগোলেন।
ওরা তিনজন গাড়ির দিকে তাকিয়ে। অনিরুদ্ধর বাবা তাঁর মার সঙ্গে কথা বলছেন। মা হাত নেড়ে ক্রুদ্ধ ভঙ্গিতে কিছু বলতে শুরু করলেন। তারপর গাড়ির দরজা খুলে নাতিকে নিয়ে উঠে বসলেন। তপতীদের দিকে একবার তাকিয়ে অনিরুদ্ধর বাবা মাথা নামিয়ে গাড়িতে উঠে স্টিয়ারিং ধরলেন।
”মা, অনি বোধহয় আর আসবে না।” মিনু বলল।
”না।”
”ভালই হল, মা শুধু গৌতম আর আমাদেরই এবার থেকে শেখাবে।” চিনু তারিয়ে মন্তব্য করল।
”গৌতমও আসবে না,” মিনু বলল, ”জানো মা, গৌতম আমাকে বলেছে টেনিস ওর ভাল লাগে না, ওর ভাল লাগে ক্রিকেট। ও বলেছে টেস্ট ম্যাচ খেলবে। হাফ প্যান্ট পরে খেলার থেকে ফুলপ্যান্ট পরে খেললে দেখতে সুন্দর লাগে।”
”মিনু আয়, ভলি এখনও বাকি।” তপতী কোর্টের দিকে এগোলেন।
”মা আমি?” চিনুর চোখে ভীরু আবেদন। তপতী ছোট ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে হেসে ফেললেন।
”তোর শরীরের সামর্থ্যের থেকে বেশি হয়ে যাচ্ছে না? একদিনেই এতটা করা ভাল নয়।” কথাগুলো বলে কী ভেবে তিনি মত বদলালেন, ”আচ্ছা আয়।”
রোদ পড়ে আসছে। আকাশ ম্লান, দূরের গাছপালা,বাড়ির রং ধূসর—কালো হয়ে উঠেছে। তপতী এইরকম সময়েই খেলা বন্ধ করে ছেলেদের নিয়ে হেঁটে বাড়ি ফেরেন।
”মা, আর পাঁচটা।” মিনু বলল।
তপতী পাঁচবার ভলির জন্য বল দিলেন। ”আর নয়, এবার বাড়ি।”
”মা, আরও পাঁচটা, এই শেষ, আর বলব না।” মিনু মিনতি জানাল।
তপতী দু’বার দিলেন চিনুকে। ব্যাডমিন্টনের শাটলকক ফেরাবার মতো করে মুখের সামনে থেকে ভলি মেরে সে উৎকণ্ঠা নিয়ে তাকিয়ে রইল। মাকে এক পাও নড়তে হল না দেখে আনন্দে ভরা চোখে সে দাদার দিকে তাকাল।
”মিনু, লাস্ট বল।” তপতী ইচ্ছে করেই বলটা মিনুর ডান দিকে প্রায় পাঁচ গজ দূরে উঁচু করে ফেললেন। দেখা যাক ছেলেটা পারে কি না। মিনু আশা করেনি তার অতদূরে বল আসবে। হুঁশ হওয়া মাত্র সে ডান দিকে দ্রুত দু’পা ছুটে ঝুঁকে র্যাকেট বাড়িয়ে দিল। কোর্ট প্রায় ছুঁয়েছে সেই অবস্থা থেকে সে বলটাকে তুলে দিল। আর নিজে হুমড়ি খেয়ে পড়ল। আলতো হয়ে উঁচুতে উঠে নেট পেরিয়ে বলটা অবাক তপতীর মাথার ওপর নেমে এল।
ধড়মড়িয়ে কোর্ট থেকে দাঁড়িয়ে উঠে দু’হাত তুলে মিনু লাফাল। ”পেরেছি…মা, আমি পেরেছি।”
.
ইস্ট ইন্ডিয়া চ্যাম্পিয়ানশিপের ফাইনাল। হলস্ট্রোম খেলছে রামনাথন কৃষ্ণনের সঙ্গে।
মিনু আর চিনু বসেছে রাজেনের দু’পাশে। তপতী ও তন্ময় আসেননি। তপতীর বাঁ পায়ে যেখানে কোদালের আঘাতটা লেগেছিল সেই জায়গাটা গত রাতে ফুলে উঠে যন্ত্রণা শুরু হয়। ডাক্তার এসে ইঞ্জেকশন, ওষুধ দিয়ে গেছেন। তাঁর অবস্থা হাঁটাচলার মতো নয়। তন্ময় তাঁর জন্যেই বাড়িতে রয়ে গেছেন।
চতুর্থ সেট, নবম গেম। হলস্ট্রোম ৩—৫ এবং নিজের সার্ভিসে ০—৩০ পিছিয়ে। সে প্রথম সেট জিতেছিল ৬—৪, পরের দুটি সেট হেরেছে ১—৬; ২—৬। খেলা প্রায় দু’ ঘণ্টা গড়িয়েছে, জয়ের জন্য কৃষ্ণনের দরকার আর মাত্র দুটি পয়েন্ট।
