কিন্তু ক্লাব মেম্বারদের বাড়ির কেউ কৌতূহলবশে বা নিছক উৎসাহ দিতেও বিকেলে আসেন না। রাজেনের কাজের ছুটি যখন হয় তখন তপতী ছেলেদের নিয়ে বাড়ির পথে। তবু ছুটির দিনে কলকাতার আড্ডা ফেলে দু’—তিনবার সে এসেছে।
”বউদি, বাচ্চচাদের আমি ঠিক হ্যান্ডল করতে পারি না, আমার ধৈর্যটা একটু কম। তা ছাড়া ছুটির পর এত টায়ার্ড লাগে!” রাজেন বলেছিল। ”কিন্তু প্রাথমিক যা করা দরকার, অ আ ক খ শেখানো, সেটা তো আপনি ভালভাবেই শেখাচ্ছেন।”
”ইলাহাবাদে যার কাছে প্রথম শিখেছিলাম, তিনি যা—যা করেছিলেন আমি সেটাই করে যাচ্ছি ঠাকুরপো। কিন্তু আমারও তো বিদ্যের একটা সীমা আছে। ওপরের দিকের খেলার কিছুই জানি না। খেলার বই কি ম্যাগাজিন, বিশেষ করে টেনিসের, কিছুই আমাদের দেশে নেই যে, পড়ে—পড়ে শিখব। বিদেশ থেকে হয়তো বইটই আসে, কিন্তু কোথায় পাওয়া যায় তাও জানি না।
”ছোটবেলায় আমরা খবরের কাগজে উইম্বলডনের রেজাল্ট কি দু—একটা ছবি দেখতাম। বিয়ের আগে দাদার কাছে অনেকের নাম শুনতাম। এখনও কয়েকটা নাম মনে আছে—ডোনাল্ড বাজ, ববি রিগস, ক্র্যামার, বরোত্রা, পাঞ্চো গঞ্জালেস; মেয়েদের মধ্যে লুই ব্রাও, মুডি, হার্ট। বিয়ের পর খেলা থেকে এতদূরে চলে গেলাম যে, খবরের কাগজের খেলার পাতাটাও আর দেখতাম না।” তপতীর স্বর ছেলেবেলার স্মৃতি আর বর্তমানের মাঝামাঝি জায়গায় দাঁড়িয়ে যেন বিষণ্ণতায় ভরে রয়েছে।
”বউদি, ছোটদের খেলা শেখানোর সবচেয়ে ভাল পদ্ধতি কী জানেন? ভাল প্লেয়ারদের খেলা ওদের নিজের চোখে দেখানো। ওরা তা হলে নিজেরাই বুঝে নিতে পারবে কোনটা করতে হবে আর কোনটা করতে হবে না। একটা ছেলে দশটা বই পড়ে যা জানবে,মাত্র একটা ভাল ম্যাচ দেখেই সেটা সে শিখে নিতে পারবে। অবশ্য যদি তার মনে ইচ্ছা আর ঘটে কিছু বুদ্ধি থাকে। আর কিছুদিন পরই তো সাউথ ক্লাবে ইস্ট ইন্ডিয়া চ্যাম্পিয়ানশিপ হবে। সুইডেনের হলস্ট্রোম ইন্ডিয়ান সার্কিটে এখন খেলছে,ওকে আনার চেষ্টা চলছে। আমাদের কৃষ্ণন, প্রেমজিত, জয়দীপ তো থাকবেই। ফাইনালের দিন ছেলেদের নিয়ে চলুন।” রাজেন অনুরোধ করেছিল খুব আন্তরিকভাবে। ”আমি আপনাদের সবাইকে নিয়ে যাব। এই বয়সে ওদের খেলা দেখাটা খুব দরকার।”
কিন্তু এখন তিনি অনিরুদ্ধকে বারবার বল দিয়ে দেখিয়ে এবং মুখে বলেও, ফোরহ্যান্ড মারার সঙ্গে সঙ্গে বাঁ কাঁধ কতটা ঘুরবে আর র্যাকেট কতটা উঠবে ফলো—থ্রুতে সেটা ঠিক করাতে পারলেন না।
”মা, অনিরুদ্ধটা একটা ভোঁদা।” মিনু বলে উঠল। চিনুর সঙ্গে খেলতে খেলতে সে লক্ষ করছিল তপতীর নাকাল অবস্থাটা।
”তুমি বরং আমাদের সঙ্গে খেলো।”
তপতীও তাই ভাবছিলেন,শুধুই পণ্ডশ্রম করে যাচ্ছেন। বাড়ির আদুরে এই ছেলেটির টেনিস কেন, কোনও খেলাই হবে না। বরং চিনু—মিনুকে বল দিয়ে গেলে ওরা ঝালাই করার কাজে এগোতে পারবে।
”ঠিক আছে অনিরুদ্ধ, তুমি এখন একটু রেস্ট নাও, আর দেখো ওরা কীভাবে স্ট্রোক করছে।”
তপতীর কথা সবে শেষ হয়েছে তখন একটা গম্ভীর গলা বলে উঠল, ”অনি, চলে আয়। আর তোকে খেলতে হবে না।” গলাটা অনিরুদ্ধর ঠাকুমার। তিনি মিনুর কথা শুনতে পেয়েছেন।
বাধ্য নাতির মতো অনিরুদ্ধ ঠাকুমার কাছে হাজির হল।
”বাড়ি চল।” ঠাকুমা উঠে দাঁড়ালেন। তপতী ছুটে গেলেন ওদের কাছে।
”সে কী মাসিমা, অনিরুদ্ধকে যে আবার প্র্যাকটিস করাব।
”করিয়ে কাজ নেই, ভোঁদা ছেলের পেছনে সময় নষ্ট না করে বরং নিজের ছেলেদেরই দেখো।” ঠাকুমা আর রাগ চাপতে পারলেন না। ”আমার নাতিটাকেই শুধু খাটিয়ে যাচ্ছ, যেন ও একটা কুলিমজুর। কই, নিজের ছেলেদের তো খাটাচ্ছ না। আমি তখন থেকে বসে বসে লক্ষ করে যাচ্ছি তুমি খালি ওর পেছনেই লাগছ।…দরকার নেই বাপু অমন খেলায়…এমন একচোখামি জম্মে কখনও দেখিনি, আয়।” ঠাকুমা অনিরুদ্ধর হাত ধরে হ্যাঁচকা টান দিলেন।
”আমি তো ওর ভালর জন্যই খাটাচ্ছি মাসিমা।” তপতীর গলায় করুণ মিনতি। যাও—বা দুটো ছেলে পেয়েছেন, তার একটি যদি চলে যায় তা হলে মিনু—চিনু ছাড়া তো কিছুই থাকবে না!
”না, না, আর ভাল করতে হবে না, দেখেছ বাছার মুখটা কেমন শুকিয়ে গেছে। আয়, খেলে তো চোদ্দোপুরুষ উদ্ধার করবি।”
”ঠাকুমা, বাবা গাড়ি নিয়ে আসবে যে!” অনিরুদ্ধ নিরস্ত করার চেষ্টা করল। অফিস থেকে বাড়ি ফেরার সময় অনিরুদ্ধর বাবা ওদের তুলে নিয়ে যান। নাতির কথা শুনে ঠাকুমা বসে পড়লেন।
কয়েক সেকেন্ড তপতীর নিজেকেই ভোঁদা মনে হল। তারপর ধীরে—ধীরে তাঁর দৃষ্টি কঠিন হয়ে উঠল। চোয়ালের পেশি দপদপ করে উঠল কয়েকবার। তিনি দ্বিতীয়বার অনুরোধ করলেন না।
”মিনু, এবার ভলি…দেখছিস তো আমার দুটো পা—ই পঙ্গু, তুই কি আমাকে কষ্ট দিবি? যদি কষ্ট না দিতে চাস, তা হলে এমনভাবে ভলিতে রিটার্ন করবি যেন আমাকে এক পা—ও নড়তে না হয়, সব বল যেন আমার র্যাকেটে আসে।…চিনু, যা বললাম শুনলি?”
দুই ভাই মাথা হেলাল। আড়চোখে পরস্পরের মুখের দিকে তাকিয়ে নিল। তপতী সহজ করে বল জোগাতে লাগলেন। একবার মিনুকে, তারপর চিনুকে। মুখের সামনে, বুকের সামনে, কাঁধের পাশে, মাথার ওপর থেকে আসা জমি না ছোঁয়া বলগুলো দুই ভাই নেটের ওধারে মায়ের র্যাকেটে পৌঁছে দিতে লাগল। যদি কোনও রিটার্ন তপতীর থেকে একটু আগে বা একটু বেশি দূর হয়ে যায় তা হলে অন্য ভাই উৎকণ্ঠিত চোখে পাশের দিকে তাকায়।
