”ঠাকুরপো, সার্ভিস তো করব, রিসিভ করবে কে?”
”কেন, আমি! … র্যাকেট তো আমিও এনেছি, শুভা, দাও তো।”
বল হাতে তপতী দাঁড়ালেন বেস লাইনে। তাঁর পায়ে নতুন কেডস। বাঁ পায়ের পাতা লাইনের বাইরে রেখে বাঁ হাতের মুঠোয় বলটা চেপে ধরে সামনে তাকালেন এবং তাকিয়েই ভয় পেয়ে গেলেন। তাঁর মনে হচ্ছে নেটটা অনেক দূরে। জীবনে তিনি টেনিস কখনও খেলেননি। সার্ভ করে বলটাকে নেটের ওপারে তিনি কখনোই পাঠাতে পারবেন না। সবাই কত আগ্রহ আর কৌতূহল নিয়ে অপেক্ষা করছে। কিন্তু ওদের মুখগুলো ক্রমশ ঝাপসা হয়ে আসছে, পা কাঁপছে। খুব অন্যায় করতে চলেছেন বলে তাঁর মনে হল। এভাবে লোক হাসাতে কেন তিনি রাজি হলেন?
”মা,” তপতী চমকে পেছনে তাকালেন। গুটিগুটি চিনু কখন যেন তাঁর পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে। সে তার রুগণ দুটি হাতের মুঠি তুলে ঝাঁকাল, ”মা, পেরেছি বলো।”
বাঁ হাত সামনে বাড়িয়ে তিনি বলটা শূন্যে ছুড়লেন। হাতটা আকাশমুখো সোজা হল। বল থেকে চোখ সরালেন না। র্যাকেট ধরা ডান হাতটা পেছনে টানলেন। শিরদাঁড়া, পিঠ পেছনে বাঁকল। তারপর সামনের দিকে একটা ধাক্কায় র্যাকেটটা আছড়ে পড়ল নেমে আসা বলের ওপর।
সবাইকে অবাক করে বলটা নেটের মাথা ঘেঁষে ওপারে গিয়ে পড়ল। রাজেন বলটা রিটার্ন করার জন্য দু’পা এগিয়ে এসে থমকে দাঁড়াল। তপতী মুখ থুবড়ে পড়ে গেছেন,পায়ে জোর না থাকায়।
”মা পেরেছ, দেখো।”
।।৫।।
”হল না, হল না… আবার মারো। দেখালাম তো, কতবার বলেছি র্যাকেটটা এইভাবে উঁচু করে, কাঁধ পর্যন্ত তুলে পেছনে টানো, তারপর নীচের দিকে নামাও।”
তপতী একটা কাল্পনিক বল লক্ষ্য করে ধীরগতিতে ফোরহ্যান্ড মারলেন। নেটের ওধারে দুটি ছেলে গভীর মনোযোগে তাঁকে নকল করে র্যাকেট চালাল।
”অনিরুদ্ধ, তোমার চোখ বল থেকে কিন্তু সরে গেল আর মিনু ফোরহ্যান্ড মারার সময় বাঁ পায়ে ভর রেখে ফিনিশটা ঠিক হচ্ছে না। …আচ্ছা, আবার আমি বল দিচ্ছি।” তপতী বল মারলেন অনিরুদ্ধর ডান দিকে। বলটা তার পাঁচ গজ আগে পড়ে উঠে এল কাঁধের ওপর। অনিরুদ্ধর ফোরহ্যান্ড বলের নাগাল পেল না।
”মুভ। মুভ, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে টেনিস খেলা যায় না। … লক্ষ করো কোথায় বলটা পড়ছে, অনুমান করো কতটা লাফাবে, সেইমতো তুমিও এগিয়ে এসো। দু’পা এগোলেই বলটা পেয়ে যেতে… আচ্ছা, আবার …।”
গৌরবর্ণ, এগারো বছরের অনিরুদ্ধর মুখ লাল হয়ে উঠেছে। প্রায় আধঘণ্টা ধরে তাকে আর মিনুকে ফোরহ্যান্ড গুলে খাওয়াতে চেষ্টা করছেন তপতী। দু’জনকে অন্তত তিরিশবার করে তিনি ফোরহ্যান্ড মারিয়েছেন। মিনু তাঁর কাছে সমস্যা নয়, কিন্তু গোলগাল, ভারী দেহের অনিরুদ্ধ তাঁকে বিব্রত করছে। ছেলেটির চলাফেরা কিঞ্চিৎ গদাইলশকরি, চটপট মাথাটাও কাজ করে না। কোর্টের ধারে চেয়ারে অনিরুদ্ধর ঠাকুমা চোখ কুঁচকে বসে রয়েছেন।
চিনুর হাতে র্যাকেট। সে একাই খেলছে নিজের সঙ্গে। বল আকাশের দিকে মেরে ছুটে যাচ্ছে জমিতে পড়ার আগেই বলটাকে আবার আকাশে তুলে দেওয়ার জন্য। গৌতম আজ আসেনি। সে থাকলে চিনু তার সঙ্গে বল দেওয়া—নেওয়া করে, যখন তপতী ব্যস্ত থাকেন মিনু আর অনিরুদ্ধকে নিয়ে।
”এবার মিনু।”
তপতী একটু জোরেই বল পাঠালেন এবং তাঁকে অবাক করে মিনু সপাটে বলটা ফেরত দিল তিন ফুট উঁচু নেট ঘেঁষে, ফোরহ্যান্ডে। মারটাকে তারিফ জানাবার সুযোগ পাওয়ার আগেই তাঁর র্যাকেটের দু’গজ বাইরে দিয়ে বলটা বেরিয়ে গিয়ে ক্লাবের সুরকির রাস্তা পেরিয়ে একটা নিমগাছের গুঁড়িতে ধাক্কা দিল। তপতী বলটা পাওয়ার জন্য দু’পা দৌড়বার চেষ্টা করেই থেমে গিয়ে হতাশ চোখে বলটার দিকে তাকালেন। চিনু ছুটে গেল বলটা ফিরিয়ে আনতে।
বলটা হাতে নিয়ে চিনু আলতো করে আকাশের দিকে ছুড়ে নেমে আসার সময় র্যাকেট দিয়ে মাথার ওপর থেকে হিট করল। তপতী দেখে অবাক হয়ে গেলেন। প্রায় নিখুঁত সার্ভিস! ওইটুকু ছেলে। কী চমৎকার তাঁকে নকল করে ফেলেছে।
”চিনু, তুই দাদার পাশে গিয়ে দাঁড়া। যেরকম করে ফোরহ্যান্ড দেখিয়ে দিয়েছি, মারতে পারবি?”
অনেকখানি মাথা হেলিয়ে চিনু বলল, ”হ্যাঁ—আআ।”
তপতী পরপর দশটা বল চিনুকে দিলেন আর সদ্য ছ’বছর পার হওয়া বাচ্চচা ছেলেটি হুবহু মাকে নকল করে ফোরহ্যান্ড মারল। গায়ে জোর কম, দুটো বল নেটে আটকে গেল, বাকিগুলো এপারে এল দুর্বল গতিতে।
”অনিরুদ্ধ, দেখলে তো? ওইটুকু ছেলে কী সুন্দরভাবে শট নিল। তাও ওকে কিছুই শেখাইনি। আর তোমাকে কতবার দেখালাম তবু তুমি পারছ না। নাও, আবার করো।”
তপতী অনিরুদ্ধকে নিয়ে আবার শুরু করলেন। কোর্টের একধারে মিনু আর চিনুও ফোরহ্যান্ড আয়ত্ত করার কাজে মন দিল। রীতিমতো গরম পড়ে গেছে। বাতাস নেই,গাছের পাতা নড়ছে না। দরদর ঘামছে সবাই। মহাদেবপুরের একটা কিনারে নির্জন এলাকায় এই ক্লাব। সন্ধ্যার আগে ক্লাব মেম্বাররাও এদিক মাড়ান না। এদিকে লোকচলাচলও কম। তবু পথিকরা, সাইকেল আরোহীরা পথ দিয়ে যাওয়ার সময় টেনিস কোর্টের দিকে একবার তাকাবেই। তাদের দ্রষ্টব্য বিষয় হল তপতী। সাদা তাঁতের শাড়ি গাছকোমর করে বাঁধা, পায়ে কেডস জুতো, অবিরাম চেঁচিয়ে যাওয়া একটা বউ, আর চারটি বা তিনটি বাচ্চচা ছেলে প্রকাশ্যে একটা অপরিচিত খেলা খেলছে, হোক না শিল্পশহর বা কলকাতা থেকে মাত্র আটাশ মাইল দূরে, এখানে সেটা দেখার মতো ব্যাপার।
