”মা, ফোরহ্যান্ড তো এইভাবে মারে।” মিনু শোওয়ার ঘরে একটা কাল্পনিক বলের দিকে র্যাকেট চালাল।
”হ্যাঁ, কে শেখাল?” বালিশে ঠেস দিয়ে পা ছড়িয়ে বসে তপতী খাটের ওপর। মিনুর উৎসাহ তাঁকে তাজা করে তুলল।
”রাজেনকাকা দেখিয়ে দিয়েছে। … সার্ভিস করা দেখবে মা?”
”ঘরের মধ্যে সার্ভিস—ফোরহ্যান্ড কিচ্ছু নয়। সবকিছু বাড়ির বাইরে।”
”তুমি কবে সেরে উঠবে মা?”
তপতীর বুকের মধ্যে মোচড় দিয়ে ওঠে। তাড়াতাড়ি তাঁকে সেরে উঠতেই হবে। ডাক্তার বলেছেন, দিন সাতেকের মধ্যেই শোওয়ার ঘর থেকে বসার ঘর পর্যন্ত হাঁটার অনুমতি দেবেন।
অবশেষে তিনি এক বিকেলে হাঁটলেন দুই ছেলের কাঁধে হাত রেখে। এক—পা এক—পা করে বসার ঘরে পৌঁছতেই হাততালি দিয়ে উঠল মিনু আর চিনু। দু’হাত তুলে তপতী মুঠো ঝাঁকালেন। ”পেরেছি।” কথাটা দুই ছেলের মাথার মধ্যে ঢুকে গেল মায়ের দুই হাত তোলা ছবিটাকে সঙ্গে নিয়ে।
কোর্টের উদ্বোধনের জন্য ঠিক হল রবিবারের বিকেল। তন্ময়, রাজেন আর শুভা শনিবার সন্ধ্যায় ক্লাবে গিয়ে টেবল ঘুরে—ঘুরে সবাইকে উপস্থিত থাকার জন্য অনুরোধ জানাল। নোটিশ বোর্ডেও একটা বিজ্ঞপ্তি শুভা সেঁটে দিল। প্রত্যেকেই তাঁরা আসবেন। প্রতিভা মজুমদার প্রশংসায় পঞ্চমুখ হলেন তপতী সম্পর্কে। ”দেখাল বটে তপতী! একা মেয়েমানুষ সাহস করে শুরু করেছিল বলেই তো আজ ছেলেমেয়েদের জন্য একটা খেলার ব্যবস্থা হল। তার ওপর ভাবো কী ঝঞ্ঝাটাই না পোয়াতে হল, প্রথমে ছোট ছেলেটা, তারপর নিজে পড়ল বিছানায়। অবশ্য রাজেন আর তন্ময়বাবু যে পরিশ্রম করে শেষ করলেন, সেটাও বলতে হবে।”
আর—একজন বললেন, ”কত খরচ হল বলুন তো? ক্লাব থেকে একটা পয়সাও তো দেওয়া হয়নি!”
”আচ্ছা, টেনিস তো খেলা হবে, কিন্তু খেলাটা তো শিখতে হবে, নাকি ছেলেমেয়েরা আপনাআপনিই শিখে যাবে?”
”তা বটে! মিসেস ঘোষাল তো মোক্ষম প্রশ্ন করেছেন!” প্রতিভা ঝুঁকে বসলেন। ”খেলা শেখাতে তো মাস্টার লাগবে।”
”মাস্টার নয়, মাস্টার নয়, কোচ লাগবে বলুন।” শুধরে দিলেন চন্দ্রিমা দত্ত।
”ওই হল। তা বাপু কোচ কোত্থেকে আসবে? তাকে তো পয়সা দিতে হবে।”
”কেন, মিসেস বসুমল্লিক নিজেই কোচিং করবেন। শুনেছি তো একসময় খেলতেন—টেলতেন, অনেক কাপ—মেডেলও পেয়েছেন।”
”আরে রাখো তো তোমার কাপ—মেডেল, অমন কাপ—মেডেল অনেকের ঘরেই পাবে।” প্রতিভা চাপা ধমক দিলেন। ”একটু খুঁড়িয়ে হাঁটে সেটা কি লক্ষ করেছ? বিয়ের আগে একটা পা ভেঙেছিল, এবার আর—একটা পা—ও গেছে। ও শেখাবে খেলা!”
”প্রতিভাদি, কাল আসছেন তো?”
”কাল তো রোববার। কখন লোকজন এসে পড়ে তার কি ঠিক আছে?”
”যা বলেছেন। আমাকেও কাল দিদির বাড়ি যেতে হবে।” মিসেস ঘোষাল হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন।
পরদিন বিকেল পাঁচটায় ভক্সহল থেকে ওঁরা নামলেন ক্লাবের সামনে। তন্ময়ের হাত ধরে তপতী গাড়ির বাইরে পা রেখেই টলে পড়েছিলেন। মিনু তাড়াতাড়ি মায়ের হাত চেপে ধরল।
”আমি ঠিক আছি মিনু … হাত ছেড়ে দে।”
রাজেন এগিয়ে এল, সঙ্গে শুভা। কোর্টের ধারে একটা টেবল। তাতে রাখা হয়েছে দুটো র্যাকেট আর দুটো বল। চেয়ারে বসে আছেন ছ’—সাতজন। নেট খাটানো রয়েছে। চুনের দাগ দুপুরে টানা হয়েছে। শুভা হাত ধরে এনে তপতীকে টেবলের পেছনে একটা চেয়ারে বসিয়ে বলল, ”বউদি আপনার র্যাকেট কই?”
”গাড়িতে আছে।”
তপতী আজই প্রথম দেখলেন তাঁর বহু কাঙ্ক্ষিত টেনিস কোর্টটিকে। তাঁর মুখ প্রসন্নতায় ভরে উঠল। গৌতম, অনিরুদ্ধর হাফশার্ট, শর্টস, মোজা, কেডস মিনুর মতোই সাদা। ওদের বাবা ও মায়েরাও এসেছেন। কিন্তু কোর্টের ধারেকাছে কোনও লোক নেই, শুধু কান্তি ছাড়া।
”আজ আমাদের টেনিস কোর্টের উদ্বোধন হবে।” রাজেন এবার টেবলের ধারে দাঁড়িয়ে স্বরটা একটু উঁচু করে বলল, ”বক্তৃতা শোনাতে গেলে যত শ্রোতার দরকার হয়, তত লোক এখানে নেই। সুতরাং বেশি কথা বলব না। ছোটদের নিয়মিত খেলা দরকার, তারা খেলতে চায়। এই সত্যি কথাটা আমরা, বড়রা, বুঝতে চাই না। কিন্তু ছোটরা নিজেরা খেলার ব্যবস্থা করতে পারে না, পারার কথাও নয়। সংগঠন না থাকলে খেলা যায় না, আর এইটুকু—টুকু ছেলেমেয়ের পক্ষে একটা সংগঠন গড়ে তোলাও সম্ভব নয়। এটা গড়ে দেয় বড়রা।
”এখানে ছোটদের খেলাধুলার কোনও ব্যবস্থা নেই, এই অভাবটা লক্ষ করেই শ্রীমতী তপতী বসুমল্লিক প্রথম উদ্যোগী হয়ে এগিয়ে আসেন। কাজ শুরুও করেন, কিন্তু একটা দুর্ঘটনায় তাঁকে শয্যাশায়ী হয়ে পড়তে হয়। তিনি যে—কাজ শুরু করেছিলেন, অবশেষে আমরা তাকে সম্পূর্ণ করতে পেরেছি। আমি বিশেষ করে ধন্যবাদ দেব গৌতম আর অনিরুদ্ধর অভিভাবকদের। তাঁরা তাঁদের ছেলেদের খেলার জন্য এখানে পাঠিয়ে আমাদের সঙ্গে সহযোগিতা করেছেন। আর ধন্যবাদ জানাব অফিসার্স ক্লাবের কর্মী কান্তি সাঁতরাকে। সে তদারক না করলে এই কোর্ট তৈরি হয়ে উঠতে পারত না। যাই হোক, বেশি কথা বলব না বলেও বলে ফেললাম। এবার অনুরোধ করব বউদি আপনি কোর্টে এসে প্রথম সার্ভিসটা করুন।”
তপতী চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াতেই কান্তি ছুটে এল সাত—আটটা জবাফুলে গড়া একটা স্তবক নিয়ে। ”মেমসাব, আপনার জন্য।”
স্তবকটা হাতে নিয়ে টেবলে রাখলেন। গাড়ি থেকে তন্ময় তপতীর ডানলপ র্যাকেটটা নিয়ে এসেছেন, সেটা স্ত্রীর হাতে ধরিয়ে দিলেন।
