কান্তি ছুটে গিয়ে বৃদ্ধকে ধরল এবং সঙ্গে সঙ্গে ফিরে এল। ”মেমসাব, বলল পাঁচ টাকা, দরাদরি চলবে না।”
”পাঁ—আ—আচ টাকা! বুড়োটা আমাকে মেরে ফেলবে কান্তি, ফতুর করে দেবে। চার টাকায় হয় না?”
”মনে তো হল, এক পয়সাও কমাবে না। বলল, মায়ের পা কেটেছে বলে পাঁচ টাকা, নয়তো ছ’টাকা চাইত।”
”কিন্তু টাকাটা তো আমার নিজের নয়, চাঁদার টাকা, পাঁচজনের টাকা। আমার তো অধিকার নেই নয়ছয় করে খরচ করার।” তপতী করুণ মুখে বললেন।
”মেমসাব, আপনার কী অত মাথাব্যথা খরচ বাঁচাবার! আমি বলে আসছি বুড়োকে,পাঁচ টাকাই পাবে।” কথাটা বলেই কান্তি উত্তরের অপেক্ষা না করে বৃদ্ধকে ধরার জন্য দৌড়ল।
ওরা যখন হাসপাতালে পৌঁছেছে, তন্ময় তখন চিনুকে এক্স—রে করিয়ে বেরোচ্ছেন। দ্রুত এমার্জেন্সিতে ভর্তি হলেন তপতী। তাঁর পায়ে আঠারোটা সেলাই হল এবং পর্যবেক্ষণের জন্য রাখা হল একটি কেবিনে।
”অতি অবশ্যই আজ চিনুকে নিয়ে কলকাতায় যাবে।” তন্ময়কে এই নির্দেশ দিয়ে চোখ বন্ধ করে তপতী ঘোষণা করলেন, ”না গেলে আমি মরে যাব।”
”উতলা হচ্ছ কেন, আমি অপূর্ব্বর কাছে আজই যাব।” উদ্বিগ্ন তন্ময় নিশ্চিন্ত করার চেষ্টা করলেন তপতীকে।
”সুতো আনবে। লন—মোয়ারটা আজ এসে পৌঁছয়নি। কালই যাতে আসে একটু দেখো। মিনুকে যদি পারো স্কুলে পৌঁছে দিয়ো আর বাড়ি এনো, গাড়ি করেই। এটা ব্যতিক্রম বলে ধরতে হবে। … যে বুড়োটা কাজ করছে তাকে টাকা দেওয়া হয়নি। দশটা টাকা এক্ষুনি কান্তির হাতে দিয়ে এসো, বেচারা গরিব মানুষ। আমি দিনকয়েক বোধ হয় হাঁটাচলা করতে পারব না। আজই আমি বাড়ি যাব।”
ডাক্তার রাজি হলেন না। আঘাতটা মোটেই হালকা ধরনের নয়। অন্তত তিনদিন তপতীকে পর্যবেক্ষণে থাকতেই হবে। তন্ময়ও ডাক্তারের সঙ্গে একমত। গম্ভীর স্বরে স্ত্রীকে তিনি শুধু বললেন, ”ডাক্তারবাবুর কথার ওপর আর একটা কথাও নয়।” কথা শেষ করেই তিনি কেবিন থেকে গটগট করে বেরিয়ে গেলেন।
তন্ময় কেবিনে আবার ঢুকলেন রাত আটটা নাগাদ, সঙ্গে দুই ছেলে। চোখ—মুখ উদ্ভাসিত, হাতে এক্স—রে প্লেটের খাম, কলকাতা থেকে গাড়ি চালিয়ে সোজা হাসপাতালে এসেছেন। ”চিনু কিওরড … চিনু সেরে গেছে!” তন্ময় দু’ হাত তুলে ঝাঁকালেন।
ধড়মড় করে তপতী খাটে উঠে বসলেন এবং ফ্যালফ্যাল করে চিনুর দিকে তাকিয়ে থাকতে—থাকতে তাঁর চোখ জলে ভরে উঠল। লাজুক মুখে চিনু মা’র দিকে এগিয়ে গেল। দু’ হাতে ছেলেকে বুকে চেপে, চুম্বনে—চুম্বনে, মুখ ভুরিয়ে দিয়ে তপতী বললেন, ”আমাদের একটা দুশ্চিন্তা দূর হল, এবার টেনিস খেলাটা শুরু করতে পারলেই হয়।” দু’ হাত কপালে ঠেকিয়ে তিনি ভগবানকে প্রণাম জানালেন।
গলাখাঁকারি দিয়ে তন্ময় বললেন, ”এখনও কিন্তু চিনু কমপ্লিটলি সেরে ওঠেনি। লাংয়ের ওপর স্পটটা প্রায় মিলিয়ে এসেছে, সেরে উঠেছেই বলা যায়, তবে ওষুধপত্তর আরও তিন মাস চালিয়ে যেতে বলল অপূর্ব।”
”তিনটে মাস তো দেখতে দেখতে কেটে যাবে।” তপতী চিনুর মাথায় হাত বুলোতে লাগলেন।
কিন্তু তিনটে মাস তপতীর পক্ষে দেখতে দেখতে কাটল না। তাঁর ক্ষতটা তিনদিনের মধ্যেই বিশ্রী দিকে মোড় নিল। পায়ের মাংস, হাড়, স্নায়ু, শিরা, সব মিলিয়ে জখমের জের মারাত্মক হয়ে উঠল। ইঞ্জেকশনে ঝাঁঝরা হলেন, মুঠো মুঠো ওষুধের ট্যাবলেট গিলতে হল এবং বাড়ি ফিরলেন পাঁচ সপ্তাহ পর। তাঁর উঠে দাঁড়াতে সময় লাগল আরও দু’ সপ্তাহ। ততদিন সংসার চালিয়েছে বেলা। আর দুই ছেলেকে দু’ হাতে আগলে রেখেছিলেন তন্ময়।
এই সময় প্রায় প্রতিদিনই রাজেন এসে দেখা করে যেত তপতীর সঙ্গে। কোর্ট তৈরি করার দায়িত্ব রাজেন নিজের ঘাড়ে তুলে নিয়ে এতদিনে প্রায় শেষ করে এনেছে, তাকে সহযোগিতা করেছে কান্তি। বুড়ো আর তার নাতনি ইট, পাথর, কাঁকর বেছে, জমি সমান করে দেয় মাটি ফেলে। লন—মোয়ার চালিয়ে কান্তি ঘাস ছেঁটে এক ইঞ্চি করে দিয়েছে। বহু জায়গায় জমিতে টাক দেখা দেয়, সেইসব জায়গায় নতুন করে ঘাস লাগানো হয়েছে। কোর্ট মেপে দড়ি বেঁধে সেই দড়ি বরাবর চুনগোলা দিয়ে লাইনগুলো টানার কাজও শেষ। নেটের ফুটোগুলো কান্তি লোক ধরে এনে সারিয়ে ফেলেছে। নিয়মিত জল দিয়ে জমি ভেজানো হয়। ক্লাবে যারাই আসে তকতকে সবুজ ঘাসে ঢাকা কোর্টটার দিকে প্রশংসাভরা চোখে তাকায়।
”কবে খেলা শুরু হবে রাজেন?” তন্ময় একদিন জানতে চাইলেন।
”বউদি সেরে উঠলে। উনি প্রথম সার্ভিস করে এই কোর্ট ওপেন করবেন। তার আগে এখানে কোনও খেলা হতে পারে না।”
অনিরুদ্ধ আর গৌতম, যাদের বাবা চাঁদা দিয়েছেন, তারা প্রায়ই উঁকি দিয়ে দেখে যায় তাদের তপতী কাকিমাকে। খেলার জন্য তারা অধৈর্য হয়ে পড়েছে। তপতীর র্যাকেটের তাঁত বাঁধিয়ে দিয়ে গেছে রাজেন, সেইসঙ্গে ছোট দুটি নতুন র্যাকেট আর কয়েকটা পুরনো বল।
তপতী সবকিছুই শোনেন বিছানা থেকে। এমনকী, বিকেলে খাওয়ার ঘরের দেওয়ালে লাগা টেনিস বলের শব্দ আর সেইসঙ্গে বেলার শাসানি। ”জিনিসপত্তর ভাঙলে কিন্তু দু’জনের ব্যাট—বল উনুনে দিয়ে দেব।”
”বেলামাসি, ব্যাট নয় র্যাকেট।” মিনুর গলা।
”ওই হল।”
মিনু দাবা খেলতে আর যায় না। এখন স্কুল থেকে ফিরেই তার নতুন নেশা র্যাকেট আর বল। আলমারির কাচ ভাঙা। আর দেওয়ালে বলের ছোপ ধরানোর পর এখন সে বাড়ির বাইরে গিয়ে দেওয়ালের সঙ্গে খেলে। চিনু স্কুলে যাচ্ছে না এখনও। তার কাজ বসে বসে দাদার খেলা দেখা। সে যথেষ্ট জোর দিয়ে মুঠোয় র্যাকেট ধরতে পারে না, কয়েকবার বল মারার জন্য চালালেই হাত ভার হয়ে যায়।
