কান্তি থলি হাতে কোথায় যেন বেরোচ্ছিল। তপতীকে দেখে বলল ”মেমসাব, কোদালের বাঁশটা খুঁজে পেয়েছি। দোকানে যাচ্ছি। এসে লাগিয়ে দেব।”
তপতীর নজরে পড়ল, কোর্টের অসমান জায়গাগুলো। কোদাল দিয়ে তো সমান করে ফেলার কাজটা করা যায়! যেমন ভাবা তেমনই শুরু করে দেওয়া। ভেতরে গিয়ে কোদালটায় বাঁশের হাতল লাগাবার চেষ্টা শুরু করলেন। বাঁশটা একটু সরু, কোদালে লাগালে ঢলঢল করছে। একটা কাঠের গোঁজ দিলে টাইট হবে। তিনি রান্নার জায়গা থেকে চ্যালাকাঠের একটা টুকরো সংগ্রহ করে এনে সেটা কোদালে গুঁজলেন হাতলের সঙ্গে। একটা আধলা ইট দিয়ে ঘা মেরে মেরে কাঠটাকে বসালেন। হাতল ধরে কোদালটা নাড়িয়ে পরীক্ষা করলেন, টাইট হয়ে বসেছে কি না। মনে হল এবার ব্যবহার করা যাবে। তাঁর মুখে সাফল্যের হাসি ফুটল।
কোর্টের যে জায়গাটা উঁচু বেশি, তপতী সেটাকেই প্রথম লক্ষ্যবস্তু করলেন। ঘাসের নীচে কয়েকটা ইটের মাথা জেগে রয়েছে। মাটির নীচে ইটের অনেকটাই গাঁথা। তপতী একটু ঝুঁকে কোদালটা খানিকটা তুলে জমিতে ঘা দিতেই ‘ঠক’ আওয়াজ হল। শক্ত করে আঁচলটা কোমরে জড়িয়ে, ঠোঁট চেপে মনে মনে বললেন, ‘দেখাচ্ছি মজা, সবক’টাকে তুলব।’
প্রথমে তিনি কোদাল দিয়ে ঘাস চেঁছে জমির অনেকটা পরিষ্কার করলেন। গোটাপাঁচেক ইট, ভাঙা ভাঁড় মাটিতে গাঁথা। তপতী আড়চোখে দেখলেন, কাজ ফেলে বুড়ো আর নাতনি তাঁর দিকে তাকিয়ে অবাক চোখে। ‘দেখবেই তো, ওদের ধারণা এইসব মেহনতের কাজ শুধু ওরাই পারে … ফুঃ, করে দেখিয়ে দিচ্ছি।’ মনে মনে কথাগুলো বলে কোদালটা মাথার ওপর তুলে বড় একটা ইটের মাথা লক্ষ্য করে সজোরে কোদাল নামালেন। কোদালটার ধারালো দিকটা শক্ত ইটের ওপর পড়ে ছিটকে এসে তপতীর বাঁ পায়ের গোছের কাছে আঘাত করল জোরে। হাত থেকে কোদালটা পড়ে গেল।
তপতী কয়েক সেকেন্ড বিমূঢ় হয়ে রইলেন। ধীরে ধীরে শাড়ির প্রান্ত খানিকটা তুলে পায়ের দিকে তাকিয়েই তাঁর মাথা ঘুরে গেল। প্রায় পাঁচ ইঞ্চি লম্বা হয়ে পায়ের মাংস চেরা আর তার মধ্য থেকে উঁকি দিচ্ছে সাদা হাড়। মাথাটা ঝাঁকিয়ে নিয়ে বিমূঢ় ভাবটা কাটিয়ে তিনি খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে এগোলেন ক্লাবঘরের দিকে। বৃদ্ধ আর নাতনি তাঁর পায়ের দিকে তাকিয়েই ছুটে এল।
”হাসপাতাল যাব। তার আগে এটা ভাল করে বাঁধতে হবে, দেখছ কী রক্ত পড়ছে!”
”হাসপাতাল তো অনেকটা রাস্তা, যাবেন কী করে মা?” বৃদ্ধ বিশাল সমস্যার সামনে পড়ে গেল। ”এটা বাঁধার কাপড়ই বা এখানে পাব কোথায়?”
”দাদু, একটা গামছা শুকোচ্ছে।”
”না, না, না।” তপতী আঁতকে উঠলেন। ”আমার শাড়ির আঁচলটা থেকে বরং ছিঁড়ে বেঁধে নিচ্ছি।”
বৃদ্ধ নাতনিকে বলল, ”খানিকটা ঘাস চিবিয়ে জায়গাটায় চেপে ধর।” নাতনি ছুটে গিয়ে এক মুঠো ঘাস ছিঁড়ে মুখে পুরল।
তপতী বারণ করতে গিয়েও করলেন না। তিনি শুনেছেন, এইসব টোটকা চিকিৎসা খুব কাজ দেয়। মেয়েটি চিবোনো ঘাস তাঁর থেঁতলানো কাটা জায়গায় চেপে বসিয়ে দিল। তপতী শাড়িটা ছিঁড়লেন।
এইসময় দূরে দেখা গেল একটি ছেলে সাইকেল চালিয়ে যাচ্ছে। হ্যান্ডেলে ঝুলছে স্কুলব্যাগ, ”খুকি, দৌড়ে গিয়ে চেঁচিয়ে ডাক তো ছেলেটাকে।”
বৃদ্ধের নাতনি চিৎকার করতে করতে ছুটল। ”অ্যাই সাইকেল, অ্যাই সাইকেল…।”
ছেলেটি সাইকেল থেকে নেমে পড়ল। সেই সময় বৃদ্ধ তপতীকে বোঝাচ্ছিল, ”মা, যার কাজ তারে সাজে, অন্য লোকে লাঠি বাজে। … আপনি কেন মিছিমিছি কোদাল ধরতে গেলেন? আমাদের পয়সা দিতে তো আপনাদের কষ্ট লাগে, দর কষাকষি করে পয়সা কমান। … আমাকে বললে তো পারতেন, আমি করে দিতুম, তা হলে এই কাণ্ডটা ঘটত না।”
”তা হলে তো আবার টাকা চাইতে।” কাপড়ের পটি পায়ে জড়াতে জড়াতে তপতী বললেন।
”তা তো চাইতুমই।”
”আমার পুঁজি তিরিশ টাকা আর আমার চাঁদা দশ টাকা মোট চল্লিশ টাকা,…” তপতীর কথার মধ্যেই ছেলেটি এসে পড়ল।
”কী হয়েছে আপনার? মেয়েটা বলল পা নাকি দু—আধখানা হয়ে গেছে!” কিশোর ছেলেটির চোখে মুখে উৎকণ্ঠা।
”হতে পারত বাবা, কপালজোরে বেঁচে গেছি। আমাকে এখনই হাসপাতাল যেতে হবে।” পটিতে একটা গিঁট দিলেন তপতী। ”তুমি কি মহাদেব হাই স্কুলে পড়ো?”
”হ্যাঁ, ক্লাস টেন—এ। আপনি আমার সাইকেলের পেছনে বসবেন? তা হলে আমি সাইকেলটা ধরে হাঁটতে হাঁটতে নিয়ে যেতুম। … মাসিমা, আপনাকে আমি স্কুলের স্পোর্টসে দেখেছি। আপনার ছেলে তো অনেক প্রাইজ পেল! … সাতটা, তাই না?”
”হ্যাঁ, মৃন্ময়, ক্লাস থ্রিতে পড়ে।” যন্ত্রণা হচ্ছে, তার মধ্যেই তিনি আরাম পেলেন ‘অনেক প্রাইজ পেল’ শুনে। পড়ায় ফার্স্ট হলে মিনু কি এমন বিখ্যাত হত?
তপতীকে সাইকেলের পেছনের ক্যারিয়ারে উঠে বসতে সাহায্য করল ছেলেটি এবং বৃদ্ধ। দু’জনে সাইকেলের দু’দিকের হ্যান্ডেল ধরে সন্তর্পণে হাঁটতে শুরু করল। মিনিট পাঁচেক পরই থলি হাতে কান্তিকে দেখা গেল বাজার থেকে ফিরতে। চোখ কপালে তুলে ঘটনার কথা শুনে কান্তি বৃদ্ধকে বলল, ”তোমাকে আর হাসপাতাল যেতে হবে না, আমি সাইকেল ধরছি। থলিটা নিয়ে যাও আর গিয়ে কাজে লেগে পড়ো।”
সাইকেল এবার ধরল ছেলেটি আর কান্তি। কয়েক গজ এগোবার পর তপতী ব্যস্ত হয়ে বললেন, ”থামো, থামো, কান্তি, বুড়োকে জিজ্ঞেস করে এসো তো কোর্টটা সমান করে দিতে কত টাকা নেবে?”
