”কিন্তু শুধু চাঁদা দিলেই তো টেনিস খেলা যায় না, বউদি নিজের র্যাকেটও থাকা দরকার। বাচ্চচার বাবারা কি সেটা কিনে দেবে? … তবে দিক বা না দিক আমি দুটো র্যাকেট ডোনেট করব। ওদের জন্য দরকার হালকা ছোট মাপের র্যাকেট।”
”তা হলে আমাদের এই দুটোরও ব্যবস্থা করে দাও রাজেন।”
রাজেন ক্লাবের র্যাকেটটা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে বলল, ”এটার যা অবস্থা, উনুনে দেওয়া ছাড়া আর কিছু করার নেই।” তারপর দ্বিতীয় র্যাকেটটা তুলে ”ওরে বাবা এটা তো দেখছি ডানলপ! পেলেন কোথায়?”
”তোমার বউদির … এক সময় খেলত। ইলাহাবাদ ইউনিভার্সিটি চ্যাম্পিয়ানও হয়েছিল।”
রাজেনের বিস্ফারিত চোখ দুটি তপতীকে লজ্জায় ফেলে দিল। পা নামিয়ে বসে রাজেন সিরিয়াস গলায় বলল, ”এবার বুঝলাম কেন আপনি টেনিস চালু করার জন্য উঠেপড়ে লেগেছেন। নিজে খেলাধুলো না করলে কেউ খেলার মর্ম বোঝে না। কথা দিচ্ছি সাধ্যে যতটা কুলোয় আপনাকে আমি সাহায্য করব।”
”তা হলে কোর্টটা যাতে ভালভাবে তৈরি করা যায় সেই ব্যাপারে পরামর্শ দিন।” তপতী সাগ্রহে বললেন।
”বউদি, এখানে খেলবে সেইসব বাচ্চচা, যারা জীবনে কখনও র্যাকেট ধরেনি। ওদের জন্য উইম্বলডনের কি সাউথ ক্লাবের মতো সারফেস এখনই দরকার নেই। বলটাকে নেটের এপার ওপার করাটাই আগে শিখুক, র্যাকেটের সঙ্গে বলের সম্পর্কটা আগে গড়ে তুলুক, তারপর গ্রাউণ্ড স্ট্রোক শিখবে। নেটে বড় বড় ছ্যাঁদা থাকলেও কিছু আসে—যায় না। আপনি মাঠটাকে সমান করে দিন তারপর আমি মাপজোক করে চুনের দাগ কেটে দেব। সাউথ ক্লাবে পুরনো বল পাওয়া যাবে, এনে দেব। আপনার প্রধান যেটা দরকার সেটা হল খেলার লোক। খেলার জন্য দু’জনের প্রতিশ্রুতি পেয়েছেন আর আপনার বড় ছেলে, মোট তিনজন।”
”চারজন। আমার ছোট ছেলের কথাটা ঠাকুরপো ভুলে যাচ্ছেন। আসলে সবাই চিনুকে ভুলে যায় ওর রুগণ দুর্বল শরীরের জন্য। শরীরটা তৈরি করানোর জন্যও ওকে খেলায় আনব।” তপতীর স্বরে ফুটে উঠল প্রত্যয় আর জেদ। ”একবার যখন ঠিক করে নিয়েছি কী করতে চাই, তখন যত পরিশ্রমই হোক, যত অর্থকষ্টই হোক কাজটা আমরা করবই।”
তপতী কথাটা বলে তন্ময়ের দিকে তাকালেন। সায় জানিয়ে তন্ময় মাথা নাড়লেন।
রাজেন অস্ফুটে বলল, ”অদ্ভুত আপনারা!”
।।৪।।
সকালে তপতী মিনুকে পৌঁছে দিয়ে হেডমিস্ট্রেস জয়ন্তী বসুর সঙ্গে দেখা করলেন।
”চিন্ময় তো ক্লাস করতে পারছে না, পড়াশুনোয় পিছিয়ে পড়ছে। আমি অবশ্য রোজ সন্ধ্যায় ওকে নিয়ে পড়াতে বসি। তা হলেও যেভাবে লেসনগুলো স্কুলে করানো হচ্ছে সেটা ফলো করা দরকার। বাড়িতে আমার পড়ানো আর স্কুলের পড়ানো একই হওয়া উচিত। তাই বলছিলাম কী, আমি যদি ক্লাসে বসে নোট নিই, তা হলে কি আপনার আপত্তি হবে? আপত্তি না থাকলে যদি অনুমতি দেন।” তপতী আবেদন জানালেন।
”নিশ্চয়, নিশ্চয়, আপত্তি হবে কেন। তবে ক্লাস ওয়ানে এমন কিছু পড়া হয় না যে, আপনাকে নোট নিতে হবে। যাই হোক আপনি চলুন এখন মিসেস বসাক ইংলিশ ক্লাস নিচ্ছেন, আপনাকে ক্লাসে বসিয়ে দিয়ে আসি।” জয়ন্তী বসু চেয়ার ছেড়ে উঠলেন, ”চিন্ময় এখন আছে কেমন?”
”ভালই। আজ ডাক্তার ওর এক্স—রে দেখে জানাবেন সেরে উঠেছে কি না।”
”কমপ্লিটলি সেরে উঠলে ডাক্তারের সার্টিফিকেট দিয়ে ওকে স্কুলে পাঠাবেন। বুঝলেন তো অনেক গার্জিয়ান আবার খুব খুঁতখুঁতে হন। মিসেস বসুমল্লিক আপনার বড় ছেলেটি কিন্তু দারুণ অ্যাথলিট, পড়াশুনাতেও তেমনই ভাল।”
”হুঁ” বলা ছাড়া তপতী কোনও উত্তর দেননি। ‘খুঁতখুঁতে’ শব্দটিকে তিনি প্রসন্ন মনে নিতে পারেননি। সংক্রামক বিপজ্জনক রোগ কি শুধু তাঁর ছেলেরই হল? কত তো ছেলেমেয়ে রোগজীবাণু শরীরে বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে। সবাইকে যদি পরীক্ষা করা যেত!
পরপর দুটি ক্লাসে পেছনের বেঞ্চে বসে তিনি পড়া বুঝে নিলেন। তাঁর মনে হল বাড়িতে তিনি চিনুকে যা পড়ান তার থেকে স্কুলের পড়া অনেক পিছিয়ে রয়েছে। এখানে একটা নির্দিষ্ট পদ্ধতি মেনে পড়ায়, তাই গতিটা প্রথম দিকে মন্থরই হয়, এটা তপতী জানেন। এখন তাঁর মনে হচ্ছে, চিনুকে তিনি একটু বেশিই এগিয়ে দিয়েছেন, এটা ভাল না মন্দ হচ্ছে তিনি বুঝে উঠতে পারলেন না।
ক্লাবের কাছাকাছি এসে দেখলেন, সেই বুড়ো আর একটা বছর দশেকের মেয়ে কোর্টের এক প্রান্তে উবু হয়ে বসে। তাদের সামনে বালতিটা। কান্তি জানাল, ঘণ্টাখানেক হল ওরা এসে কাজ শুরু করেছে। তপতী কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে ওদের দেখলেন। দু’জনে ইঁট—পাথর বাছাই করে জড়ো করছে নিজেদের পাশে, পরে মেয়েটি দু’ হাতে সেগুলো তুলে বালতিতে ফেলছে। বালতি ভরে গেলে বুড়ো ফেলে দিয়ে আসছে কোর্টের অন্তত তিরিশ হাত দূরে।
তপতীর মনে হল, চুপচাপ দাঁড়িয়ে বা বসে থাকার চেয়ে যদি তিনি নিজেও হাত লাগান তা হলে কাজগুলো এগিয়ে থাকবে, সময়ও বাঁচবে। কী কাজ করা যায়? সুতো থাকলে জালটার ফুটোগুলো বোনার কাজ করতে পারতেন। রাজেন ঠাকুরপো অবশ্য বলেছেন, ফুটোগুলো এখন তেমন অসুবিধে করবে না। কোর্টটার মাঝে উঁচু একটা বাধা তুলে দু’ভাগ করা, আপাতত এটাই হবে নেটের কাজ। বাচ্চচারা এখন প্রচণ্ড জোরে বল হিট করবে না। লন—মোয়ারটা যদি মেরামত করে দিয়ে যেত তা হলে সেটা দিয়ে ঘাস ছাঁটার কাজ শুরু করে দিতে পারতেন। কিন্তু মোয়ারটা এখনও ফেরত আসেনি।
