”সে আর এমন শক্ত কী, আমি এই বুড়োকেই বলে দিচ্ছি।” কান্তি কথাগুলো বলে ঘাসকাটা বৃদ্ধের কাছে গেল। দু—চারটে কথা বলে ফিরে এসে জানাল, ”বুড়ো বলল ও নিজেই করবে, নাতনিকে সঙ্গে আনবে। মাটি চেঁছে দেবে, গত্তে মাটি ফেলবে, দশ টাকা নেবে।”
”দঅশ!” তপতী হতাশ হলেন। ”এইটুকু কাজ, কোনও খাটুনিই নেই আর বলে কিনা দশ টাকা! দরকার নেই আমার।”
দুপুর দুটোর সময় ঘাস কাটা শেষ হল। তপতী কোর্টে ঘুরে ঘুরে দেখলেন। প্রায় একফুট লম্বা ঘাস চার ইঞ্চিতে নামিয়ে দিয়েছে। এরপর মোয়ার চালিয়ে আরও ছাঁটা হবে।
”এ কী! এখানে ঘাস তো একদমই কাটোনি।” তপতী দাঁড়িয়ে পড়ে আঙুল দেখালেন।
”কাটব কী মা! ওখানটায় তো মাটি উঁচু হয়ে রয়েছে। জমি সমান করতে গেলে তো আপনাকে মাটি তুলতেই হবে, সেইসঙ্গে ঘাসও।”
কথাটা সত্যি। মাটি তোলার মতো মাটি ফেলতেও হবে, তারপর সমান করা। সমান করতে তো জল ঢেলে মাটি নরম করে রোলার চালাতে হবে। কিন্তু রোলার কোথায় পাবেন?
”মা, আমার মজুরিটা দিয়ে দেন,” বৃদ্ধ গামছা দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে বলল, ”জমিতে ঢেলা বাছাইয়ের কাজ করাবেন তো কাল আসব।”
”দশ টাকা দিতে পারব না।”
”মা, ঘাসকাটার থেকেও এ কাজে খাটুনি বেশি। দেখছেন তো রোদ্দুর কেমন। দু’দিন তো লাগবেই।”
রোদে পোড়া বৃদ্ধের মুখ আর সারা দেহ দেখে তপতীর মায়া হল। তিনি বললেন, ”ঠিক আছে, কাল সকাল সকাল এসো।”
এবার তপতীর হুঁশ হল এখন তাকে বাড়ি যেতে হবে। বৃদ্ধকে টাকা দিয়ে, কান্তিকে নেটটা গুটিয়ে তুলে রাখতে বলে বাড়ির দিকে দ্রুত হাঁটতে শুরু করলেন। পঞ্চাশ গজ হেঁটেই থমকে দাঁড়িয়ে ফিরে এলেন।
”কান্তি, ওই যে ভাঙা র্যাকেটটা দেখলাম ওটা এনে দাও তো। দেখি সারানো যায় কি না।”
র্যাকেটটা নিয়ে ছাতা মাথায় বাড়ির দিকে হাঁটতে হাঁটতে তপতীর মনে হল এইমাত্র যেন টুর্নামেন্টের প্রথম রাউন্ডের খেলা জিতে দ্বিতীয় রাউন্ডে উঠলেন। এর পর আছে তৃতীয় রাউন্ড, চতুর্থ রাউন্ড…। এতক্ষণে তপতী অনুভব করলেন তাঁর ভীষণ খিদে পেয়েছে।
সন্ধ্যায় তপতী আজকের অভিজ্ঞতা তন্ময়কে জানিয়ে বললেন, ”এখন দরকার জালের জন্য মোটা সুতো আর জমিটাকে সমান করা। এখানকার বাজারে সুতোটা যদি না পাওয়া যায় তা হলে কলকাতা থেকে তোমায় কিন্তু আনিয়ে দিতে হবে, সেইসঙ্গে দুটো টেনিস বলও। আর জমি লেভেল করার জন্য তোমাদের একটা রোলার যদি পাঠিয়ে দাও।”
”দোব। কাল চিনুকে নিয়ে কলকাতা যাব, তোমার যা যা দরকার তার একটা লিস্ট করে ফেলো। যে র্যাকেটটা এনেছ তাতে তাঁত বাঁধাতে কোন দোকানে যেতে হবে সেটাই তো জানি না।” তন্ময়ের হঠাৎই এই সময় মনে পড়ে গেল একটা কথা। ”আচ্ছা, তোমার একটা র্যাকেট মনে হচ্ছে যেন আলমারিতে তোলা আছে দেখেছি!”
তপতীকে সচকিত দেখাল। তিনি ভুলেই গেছলেন ওটার কথা। বিয়ের দু’বছর পর একবার বাপের বাড়ি থেকে ফেরার সময় তাঁর দাদা র্যাকেটটা হাতে দিয়ে বলেছিলেন, ”মিছিমিছি এটা এখানে পড়ে আছে, তুই বরং সঙ্গে নিয়ে যা। যদি খেলার সুযোগ টুযোগ পাস তো দরকারে লাগবে।” র্যাকেটটা আলমারির ওপর তাকে জামাকাপড়ের তলায় সেই যে ঢুকেছে গত আট বছরে একবারও আর বেরোয়নি।
তপতী আলমারি খুলে জামাকাপড়ের স্তূপের তলা থেকে র্যাকেটটা বার করলেন। আট বছর আগের অবস্থাতেই রয়েছে। র্যাকেটের গায়ে সোনালি অক্ষরে ‘ডানলপ’ লেখাটা নতুনের মতোই ঝকঝকে। মুঠোয় ধরতেই অদ্ভুত একটা শিহরণ তিনি বোধ করলেন। তেরো বছর আগে পা ভাঙার পর আর খেলেননি। বাঁ হাতের তালুতে র্যাকেটের মাঝখানের তাঁত দিয়ে তিন—চারবার আঘাত করলেন পুরনো অভ্যাসবশে। এভাবে ঘা দিলে টানটান করে বাঁধা তাঁতে ‘পিং’ করে আওয়াজ ওঠে। আওয়াজটা শুনতে তাঁর ভাল লাগত। কিন্তু এখন আওয়াজের বদলে তিন—চারটে তাঁত ছিঁড়ে গেল। তিনি অপ্রতিভ হয়ে স্বামীর দিকে তাকালেন।
”ছিঁড়ে তো যাবেই। গোরু কি মোষের নাড়িভুঁড়ি দিয়ে তৈরি তাঁত এত বছর পরও কি পচবে না? ভালই হল দুটো র্যাকেটই নিয়ে যাব, কিন্তু কোথায় এসব বাঁধায় তা তো জানি না।”
তপতী কয়েক সেকেন্ড ভেবে বললেন, ”এ ব্যাপারে সেরা লোক রাজেন ঠাকুরপো। টেনিস খেলেছে, এখনও অভ্যাসটা ছাড়েনি। নিশ্চয় ও জানে কোথায় তাঁত বাঁধানো হয়।”
তন্ময় ঘড়ি দেখে বললেন, ”এখনি চলো।”
দু’জনের হাতে দুটো র্যাকেট, একটায় তাঁত নেই, রাজেন তো অবাক! ”কী ব্যাপার দাদা, খেলতে যাচ্ছেন কোথাও?”
”এই র্যাকেট নিয়ে খেলতে যাওয়া? ঠাট্টা হচ্ছে?” তন্ময় চেয়ারে বসলেন। ”তোমার বউদি তো টেনিস কোর্ট করার কাজ শুরু করে দিয়েছে। আজ ঘাস ছাঁটিয়েছে। নেটটা বার করে দেখে তাতে বড় বড় ছিদ্র, হাতি না হোক বেড়াল গলে যেতে পারে। সেটা সারাবার জন্য সুতো আনার হুকুম হয়েছে। উনি নিজে বসে বসে ছিদ্র বন্ধ করবেন। তারপর ইঁট পাথর বাছাই। পয়সা বাঁচাতে সেটাও বোধ হয় উনি নিজে করবেন। জমি লেভেলিং করার জন্য রোলার টানানোর অর্ডারও হয়েছে।”
”উরিব্বাস।” রাজেন চেয়ারের ওপর উবু হয়ে বসল। ”করেছেন কী! আপনি তো দেখছি যা ভাবেন তাই করেন।”
”তা করতেই হয়। এখানে এত শিক্ষিত লোক, সবাই ভাল চাকরিও করেন কিন্তু নিজেদের সন্তানদের জন্য ঠিকভাবে চিন্তা করেন না। আমার সন্দেহ হয় ছেলেমেয়েদের যথার্থই ওঁরা ভালবাসেন কি না। কিন্তু আমার সন্তানদের আমি ভালবাসি—অন্যদেরও।” বলে তপতী তাঁর চাঁদা তোলার অভিজ্ঞতার কথা রাজেনকে বললেন।
