”কিছু কিছু খরচ কমিয়ে ম্যানেজ করতে হবে। কমানোর প্রথম ধাপ হোক গাড়ি আর না চড়া। চিনু স্কুলে যায় না, মিনু হেঁটেই যাতায়াত করতে পারবে, আমি সঙ্গে যাব। তুমিও হেঁটে অফিস যাবে। কেউ জিজ্ঞেস করলে বলবে, ভুঁড়ি হয়ে যাচ্ছে তাই হাঁটছি।”
”পরশু এক্স—রে করিয়ে চিনুকে কলকাতা নিয়ে যেতে হবে। কীসে যাব, ট্রেনে?”
”মোটরে। এটা ব্যতিক্রম বলেই ধরতে হবে।”
পরদিন মিনুকে নিয়ে তপতী বেরোলেন স্কুলে পৌঁছে দিতে। দু’জনের মাথায় দুটো ছাতা। মিনু প্রথমে অবাক হয়েছিল হেঁটে স্কুলে যেতে হবে শুনে। তপতী তাকে বুঝিয়ে বললেন, ”আধ মাইল তো রাস্তা, এর জন্য গাড়িতে চড়ার কী দরকার? তুই তো রোজ এক মাইল হেঁটে ফেরিঘাট যাস আর দৌড়ে ফিরিস। পারবি না স্কুলে হেঁটে যেতে? অক্ষম তো নোস। তোর বাবা দু’মাইল হেঁটে স্কুলে যেতেন, দু’মাইল হেঁটে ফিরতেন।”
এই শেষ কথাটাতেই কাজ হয়ে গেল। ”মা আমি দৌড়ে স্কুলে যাব?” মিনু টগবগ করে উঠল।
”না, না, অত বাহাদুরিতে কাজ নেই।”
”জানো মা, আমাদের স্কুলের অনেক বড় ছেলে সাইকেলে আসে। আমাকে একটা সাইকেল কিনে দেবে?”
”দোব, যখন তুমি বড় ছেলে হবে।”
মিনুকে স্কুলে পৌঁছে দিয়ে তপতী ক্লাবে গেলেন। কান্তির কাছে শুনলেন, সায়েবের পাঠানো একটা লোক সাইকেল রিকশায় তুলে মোয়ারটা নিয়ে গেছে।
”কিন্তু কান্তি, ঘাস কাটার ব্যবস্থা তো তাড়াতাড়ি করতে হবে। আর কোদালের হাতলের জন্য একটা বাঁশ কিংবা ডাণ্ডা দরকার।”
”যে লোকটা দুধ আর ডিম দিয়ে যায় তাকে কালই আমি বলে দিয়েছি। ও থাকে এই মাইল দুয়েক দূরে বল্লভপুরে। বলেছিল আজ সকালে পাঠিয়ে দেবে লোক। তা এখনও তো এল না!” কান্তিকে বিব্রত দেখাল।
”ততক্ষণে একটা কাজ করা যাক। নেট—টা কোথায় আছে দেখো তো।”
”দেখেছি। সেক্রেটারির আপিস ঘরে যে কাঠের আলমারিটা তার পেছনে ডাঁই হয়ে পড়ে আছে। বার করব কী! যা ধুলো ঝুল ময়লা, হাত দিতে ঘেন্না করে?”
”দেখি তো।” তপতী একাই দেখতে গেলেন অফিস ঘরে।
তপতী আলমারির পেছনে উঁকি দিয়ে দেখলেন। কান্তি মোটেই বাড়িয়ে বলেনি। তালগোল পাকানো নেটটা যেন ধুলোর ঢিপি। তিনি ঝুঁকে হাত বাড়িয়ে নেটের খানিকটা আঁকড়ে টেনে বার করলেন। সেই সঙ্গে বেরিয়ে এল তাঁত ছেঁড়া একটা র্যাকেট, যার হাতলে মুঠো করে ধরার জায়গার কাঠটা ফাটা। এটাও বোধ হয় ক্লাবেরই সম্পত্তি। নেটটাকে ঘর থেকে টানতে টানতে বাইরের লনে এনে ফেললেন। হাঁ হাঁ করে কান্তি ছুটে এল। ”আপনি কেন, আপনি কেন… আমাকে বললেই তো পারতেন।”
”কান্তি তুমি একদিকের দড়ি ধরে দাঁড়িয়ে থাকো, আমি আর একদিক ধরে টেনে নিয়ে গিয়ে এটা খুলব।”
পুরো নেটটা খুলে তপতী হতবাক! অন্তত সাত—আট জায়গায় জালের সুতো ছিঁড়ে গর্ত হয়ে রয়েছে। সুতো কিনে ছেঁড়া গর্ত মেরামত করতে হলে যারা জাল বোনে তাদের কাউকে ডাকতে হবে। তার মানে খরচ! কিন্তু তার আগে নেটটাকে না ধুলে হাতই দেওয়া যাবে না। মহাদেবপুরে পানীয় জল সরবরাহ হয় উঁচু ট্যাঙ্ক থেকে। চব্বিশ ঘণ্টাই জল পাওয়া যায়। নেটটাকে তাঁরা দু’জন জলের কলের নীচে টেনে এনে কল খুলে দিলেন।
”এইভাবে থাকুক ঘণ্টাখানেক। ঝুল কালিটা অন্তত বেরিয়ে যাক।”
ইতিমধ্যে ঘাস কাটার লোক এসে গেছে। বৃদ্ধ এক চাষি। তপতী টেনিস কোর্টটা দেখিয়ে তাকে বললেন, ”এই যে জমিটা, এরই ঘাস মুড়োতে হবে, কত নেবে?”
চোখমুখ কুঁচকে জমিটার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে সে বলল, ”পাঁচ টাকা দিতে হবে।”
”পাঁ—আ—আচ!” তপতী যতটা বিস্মিত হওয়া দেখানো সম্ভব দেখালেন। ”পারব না। ঘণ্টা দুয়েকের কাজ, আর বলছ কিনা পাঁচ টাকা!”
”ঘণ্টা দুয়েকের কাজ নয় মা, খাটুনি আছে। সাড়ে চার টাকা হলে করব।”
শেষ পর্যন্ত রফা হল সাড়ে চার টাকায়। তপতী কিছু পয়সা তো বাঁচালেন। ঘাস কেটে দূরে নিয়ে গিয়ে ফেলার জন্য ঝুড়ি নেই। কান্তি রান্নাঘরের একটা বালতি এনে দিল। রান্না করে তার নিজের খাওয়ার ব্যবস্থা নিজেকেই করতে হয়। কান্তি সেইদিকে মন দিল। এরমধ্যেই ক্লাবের ক্যান্টিনের রাঁধুনিও এসে গেছে। সেও তার কাজ শুরু করে দিয়েছে। কল থেকে তোড়ে নেটের ওপর জল পড়ছে। তপতী শাড়িটা একটু তুলে নেটের ওপর দাঁড়িয়ে লেফট—রাইট শুরু করলেন। গলগল করে কালো জল বেরোতে লাগল। মিনিট দশেক পর তিনি হাঁফিয়ে উঠে থামলেন। এর পর নেটটাকে টেনে আনলেন ক্লাব লনের ওপর, ছড়িয়ে দিলেন শুকোবার জন্য।
মাথায় গামছা জড়িয়ে, খালি গায়ে বৃদ্ধ উবু হয়ে বসে ঘাস নিড়িয়ে চলেছে। কাটা ঘাস বালতিতে রেখে কিছুক্ষণ পরপর বালতিটা খালি করে আসছে দূরে গিয়ে। ছাতা মাথায় তপতী কোর্টের ধারে একটা চেয়ারে বসে। কান্তি এক কাপ চা নিয়ে এল।
”এভাবে কতক্ষণ বসে থাকবেন মেমসাব, বাড়ি গিয়ে খাওয়াদাওয়া করবেন না?”
”করব, ঘাসকাটাটা শেষ হোক আগে। না দেখলে তো যা—তা করে কাটবে। আর শোনো, নেটটা শুকিয়ে গেলে ভাঁজ করে পাকিয়ে তুলে রেখো। জালের মোটা সুতো কিনে এনে বুনে নেব।”
”আপনি বুনবেন? গঙ্গার ধারে ক’ঘর জেলে থাকে, ওদের বললে তো হয়?”
”লোক দিয়ে করাতে গেলে তো পয়সা লাগবে। কী আর এমন শক্ত কাজ! আর মাঠের ইঁট পাথর কাঁকর বাছার জন্য দুটো লোক চাই, জোগাড় করতে পারবে?”
