”স্কুল ফাইনালের তো এখনও অনেক দেরি।”
”অনেক দেরি!” সুধা ঘোষাল আর্তনাদ করে উঠলেন। ”মাত্র চারটে বছর, দেখতে দেখতে কেটে যাবে। একে আপনি অনেক দেরি বলছেন?”
তপতীর মনে হল, সুধা ঘোষাল এমনভাবে তাঁর দিকে তাকিয়ে, যেন একটা মানুষকে হঠাৎ বনমানুষে রূপান্তরিত হতে দেখলেন। তিনি অপ্রতিভ বোধ করে সুধা ঘোষালকে তুষ্ট করার জন্য বললেন,”সুধেন্দু তো পড়াশোনায় খুবই ভাল, অমন ছেলে ক’টা আর হয়, এবারও তো ফার্স্ট হয়ে উঠল।”
”সেটা তো স্কুলের ফার্স্ট, কিন্তু গোটা বাংলার তো নয়। ওর বাবা এম এসসি—তে ফার্স্ট ক্লাস সেকেণ্ড হয়েছিল, আমি বি এ—তে ডিস্টিংশন পেয়েছি। সুধেন্দুকে ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট তো হতেই হবে। ওর বাবা তো বলে, ‘ছেলে বাপকে ছাড়িয়ে না গেলে সে আর ছেলে কীসের?’ তবে ছেলেও বাপ—মায়ের মন বোঝে, সবসময় পড়ার বই নিয়ে থাকে।”
”কিন্তু মিসেস ঘোষাল, আপনাদের যেমন ইচ্ছে তেমনি ছেলেরও তো কিছু ইচ্ছে থাকতে পারে।”
”ছেলের ইচ্ছে! সুধেন্দুর? ওর একটাই ইচ্ছে, বাপ—মার মুখ উজ্জ্বল করা, আই এ এস, কি আই পি এস হয়ে সমাজের একজন হওয়া। সেইভাবেই আমরা ওকে তৈরি করতে চাই।”
”ওর বয়স এখন কত, তেরো?”
”হ্যাঁ।”
”এই বয়সের ছেলেদের তো খেলতে ইচ্ছে করে, আর সেইজন্যই আপনার কাছে আসা।” সুধা ঘোষালকে কথা বলার কোনও সুযোগ না দিয়ে তপতী বলে চললেন, ”ক্লাবে যে টেনিস কোর্টটা পড়ে আছে সেটাকে সংস্কার করে ছেলে মেয়েদের খেলার ব্যবস্থা করতে চাই, সেজন্য কিছু টাকার দরকার, তাই আপনার কাছে এসেছি যদি দশটা টাকা চাঁদা দেন। সুধেন্দুর বিকেলে একটা কিছু খেলা তো দরকার।” তপতী শেষ বাক্যটির ওপর ভরসা করলেন। ছেলের খেলার একটা ব্যবস্থা হলে কোন মা আর টাকা না দিয়ে থাকতে পারবেন। কিন্তু ফল হল বিপরীত।
”বিকেলে খেলা? …পাঁচটার সময় সুধেন্দুর ইংলিশ টিউটর আসে। এই তো ভেতরের পড়বার ঘরে ও এখন পড়ছে। সকালে আমি পড়াই, বিকেলে টিউটর, অফিস থেকে ফিরে ওর বাবা ওকে নিয়ে বসেন। ওর খেলার সময় কোথায়? আমরা তো ওকে বারবার বলি জীবনে এখনই পড়ার সময়, যা কিছু জ্ঞান এখনই আহরণ করে নাও, খেলার জন্য পরে অনেক সময় পাবে, ঠিক কি না বলুন?”
তপতী ঢোঁক গিললেন। ”বলছিলাম কী, যদি দশটা টাকা চাঁদা—”
”না, না, না, সুধেন্দুকে পড়া ফেলে খেলতে আমরা পাঠাব না। এই দেখুন আপনাকে চা দেওয়া হল না।”
”চা খাব না, আমি এখন উঠি। আরও কয়েকজনের কাছে যেতে হবে।” তপতী চেয়ার থেকে উঠে পড়লেন।
.
”তপতীদি, আপনি যা করতে চাইছেন সেটা তো খুবই ভাল। ছেলে মেয়েদের সত্যিই এখানে নিয়মিত খেলার কোনও ব্যবস্থা নেই।” চন্দ্রিমা দত্ত তাঁর পাঁচ বছরের মেয়ে লঘিমাকে কোলের কাছে টেনে জড়িয়ে ধরে বললেন। ”আমি তো সেইজন্যই লঘুকে নাচের স্কুলে ভর্তি করিয়েছি।”
”খুব ভাল করেছ। তবে ফিজিক্যাল এক্সারসাইজটাও যদি ওই সঙ্গে করে, তা হলে নাচটা আরও ভাল হবে।”
”তা হয়তো হবে। কিন্তু তপতীদি, টেনিস আর নাচ দুটো চালানো ওর পক্ষে অসম্ভব! বাড়িতে রেগুলার নাচের প্র্যাকটিস, তার সঙ্গে টেনিস, এইটুকু বাচ্চচা, দেখছেনই তো শরীরের হাল, নিতে পারবে না।”
তপতী বুঝে গেলেন, চন্দ্রিমার কাছ থেকে কিছু পাওয়া যাবে না। নিজের ছেলে মেয়েরা না খেললে তারা চাঁদাও দেবে না। তবু তিনি বললেন, ”বেশ, লঘু নয় খেলতে পারবে না, কিন্তু অন্য অনেকের ছেলে মেয়ে তো খেলবে, তুমি চাঁদার দশটা টাকা দাও। স্রেফ চ্যারিটি।”
”উনি তো এখন নেই, বাড়ি আসুন, ওঁকে বলব।”
তপতী আর কথা বাড়ালেন না। ধরে নিলেন কিছু পাওয়া যাবে না।
.
সুভাষ সেন অমায়িক, মার্জিত এবং এম জে টি এম—এর অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ম্যানেজার। তপতীর কথা মন দিয়ে শুনে চশমার কাচ রুমালে মুছতে মুছতে বললেন, ”মিসেস বসুমল্লিক আপনার উদ্যোগের সঙ্গে আমি শতকরা একশো ভাগ একমত। কিন্তু মুশকিল একটাই, আর দু’মাস পর শঙ্কু শান্তিনিকেতন চলে যাচ্ছে। ওখানে পাঠভবনে পড়বে।”
”তা হলে তো আর কিছু বলার নেই।” তপতী মুখে হাসি টেনে আনলেন। বাংলোর সিঁড়ি দিয়ে যখন নামছেন, পেছন থেকে ডাক শুনে ঘুরে দাঁড়িয়ে দেখলেন সুভাষ সেনের হাতে মানিব্যাগ, তাই থেকে একটা দশ টাকার নোট বের করেছেন। ”এটা নিয়ে যান।”
তপতী বাড়ি ফিরলেন তিরিশ টাকা সংগ্রহ করে। অনিরুদ্ধ আর গৌতমের বাবা—মা খুব উৎসাহিত হয়েই চাঁদা দিয়েছেন। তন্ময় জানালেন কাল সকালে মেশিন শপের একজন যাবে লন—মোয়ারটা নিয়ে আসার জন্য। একদিনেই সম্ভবত সারানো যাবে।
”কিন্তু তিরিশ টাকায় কী হবে?” তন্ময় প্রশ্ন তুললেন।
”বাকিটা আমাদেরই দিতে হবে।” তপতী শান্ত স্বরে স্বামীর চোখে চোখ রেখে বললেন। ”আমাদের ছেলেদের মুখ চেয়েই খরচ করতে হবে। একদিন বলেছিলে, ওদের সুস্থ সবল রাখা, ভাল স্বাস্থ্য গড়ে দেওয়ার দায়িত্ব বাবা—মার। এজন্য শেষ কর্পদকটুকুও খরচ করবে।”
”বলেছিলাম।”
”তা হলে অমন চোখ করে তাকিয়ে আছ কেন?
”তাকিয়ে নেই, শুধু ভেবে যাচ্ছি। আমার অফিসের একটা ছেলের বিয়ে, নেমন্তন্ন করেছে। এগারোশো টাকা মাইনে থেকে সংসার খরচ, চিকিৎসা, গাড়ির পেট্রল, মেজ জ্যাঠার বাড়িতেও বিয়ে এই মাসেই। বিয়ের উপহার আর টেনিস কোর্ট—ম্যানেজ করব কী করে?”
