”অবশ্যই। যদি দায়িত্ব নিয়ে কোর্টটাকে উদ্ধার করতে পারেন তা হলে সত্যিই একটা কাজের কাজ হবে। কিন্তু মিসেস বসুমল্লিক—” কমল ভটচায থেমে গলা নামিয়ে বললেন, ”খেলার জন্য লোক পাবেন তো?”
”নেটের দু’ধারে দাঁড়াবার জন্য ইতিমধ্যেই দু’জনকে পেয়ে গেছি—আমার বড় ছেলে আর আমি।”
।।৩।।
পরদিন ভোরে ফেরিঘাট থেকে মিনু ও চিনু দৌড় শুরু করার পর তপতী হাঁটতে শুরু করলেন বাড়ির বদলে ক্লাবের দিকে। উদ্দেশ্য, দিনের আলোয় ভাল করে কোর্টের অবস্থাটা দেখে নেওয়া।
মিনিট কুড়ি পর তিনি পৌঁছলেন। রাত্রে ক্লাবঘরে শোয় বেয়ারা কান্তি। তার দেশ নদিয়া জেলার এক গ্রামে। বাড়িতে বউ, ছেলে মেয়ে আছে। বয়স্ক লোক, মানুষ ভাল। সে তপতীকে চেনে। এত সকালে ‘মেমসায়েব’কে ক্লাবে দেখে কান্তি হতভম্ব।
”মালি তার জিনিসপত্র কোথায় রাখে কান্তি, আমি একটু দেখব।”
ক্লাবঘরের পেছনে একটা ঢাকা জায়গায় মোয়ারটা দেয়ালে ঠেস দেওয়া। একটা চাকা খোলা, তবে ভাঙেনি। ছাঁটাই হওয়া ঘাস যে লোহার ডালাটায় পড়ে, সেটা ঝুলে রয়েছে। ঘাস ছাঁটাই করার একটা ব্লেড ভাঙা। কোদাল একটা আছে বটে, তার বাঁশের হাতলটা নেই। একটা শাবলও রয়েছে। কোনও ঝুড়ি নেই। টেনিসের নেটটা খুঁজে পাওয়া গেল না।
”আপনি কী করবেন এসব দিয়ে?” কান্তি তো অবাক!
”মাঠ বানাব। ওই টেনিস কোর্টটাকে খেলার যোগ্য করে তুলতে হবে।”
”আপনি করবেন?”
”লোক দিয়ে করাতে হবে।”
কোর্টের অবস্থা দেখে তপতীর কপালে দু—তিনটে ভাঁজ পড়ল। ঘাস এত লম্বা যে, প্রথমে হেঁসো দিয়ে না কাটলে মোয়ার চালানো যাবে না। জমিতে কয়েকটা জায়গায় মাটি ফেলতে হবে, গর্ত বোজাতে হবে, ঢিপির মতো উঁচু জায়গায় মাটি চাঁছতে হবে আর ভাঙা ইটের টুকরো, কাঁকর বাছতে হবে। এত ‘হবে’ কিন্তু তাঁকে দমাতে পারল না। প্রথমেই মোয়ারটা সারাতে হবে, একটা কি দুটো মাটি ফেলার ও তোলার ঝুড়ি চাই, কোদালের জন্য হাতলও।
”কান্তি, একজন কি দু’জন মজুর জোগাড় করতে পারবে? আর একজন ঘেসুড়ে?”
”তা পারা যাবে।”
”তোমাকে আমি পরশু বলব।”
তপতী যখন বাড়ি ফিরলেন সবাই তখন খাওয়ার টেবলে তাঁর জন্য অপেক্ষা করছিল।
”কেমন দেখলে?” তন্ময় জানতে চাইলেন।
”যা দেখব ভেবেছিলাম তাই দেখলাম। তবে হয়ে যাবে। তোমার একটু সাহায্য চাই। মোয়ারটা ভাঙাচোরা, ওটাকে সারাতে হবে। তোমার তো অনেক মিস্ত্রি আছে, একজনকে পাঠিয়ে দাও না ওটা ঠিক করে দেবে।”
”পাঠাব। আর কী দেখলে?”
”দেখলাম বেশ কিছু টাকা খরচ করতে হবে, মিস্ত্রি লাগাতে হবে।”
”টাকা!” তন্ময় নড়েচড়ে বসলেন। চিনুর চিকিৎসা আর সুষম পুষ্টিকর খাদ্য চালু হয়ে সংসার খরচ যথেষ্ট বেড়ে গেছে। মাইনের টাকা হিসেব করে খরচ করতে হচ্ছে এবং খরচটা করে তপতী। সুতরাং টেনিস কোর্ট সংস্কারের জন্য খরচের টাকা যে তাঁদের পক্ষে দেওয়া কষ্টকর হবে, এটা তপতী জানেন।
”টাকা আমাদের খরচ করতে হবে নাকি! ক্লাব দেবে। মেম্বারদের ছেলেমেয়েরাই তো খেলবে।” তন্ময় মৃদু স্বরে আপত্তি জানালেন।
”মনে রেখো মেম্বারদের ছেলে মেয়েদের মধ্যে আমদেরও দুটো ছেলে আছে। ওদের মুখ চেয়ে একাজ আমায় করতেই হবে। আমি মেম্বারদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে চাঁদা তুলব।” তপতীর চোখ জ্বলজ্বলে, কণ্ঠস্বরে আবেগ এবং দৃঢ়তা।
”চাঁদা তুলবে! কত করে চাঁদা?”
”দশ টাকা প্রতি ফ্যামিলি। একবারই শুধু দিতে হবে।”
”দঅঅশ টাকা!” তন্ময়ের চোয়াল ঝুলে পড়ল। ”জানো, এই দশ টাকায় বারো সের চাল পাওয়া যায়, আড়াই মাস খবরের কাগজ কেনা যায়…।”
”দুটো হরলিকস কেনা যায়, চার সের সর্ষের তেল কেনা যায়, চার সের পাঁঠার মাংস কেনা যায়… তাতে কী হল?” তপতীর চোখে চ্যালেঞ্জ।
”এত টাকা কী কেউ বাচ্চচার খেলার জন্য দেবে?” তন্ময় স্পষ্টতই সন্দেহ প্রকাশ করলেন। ”প্রাইভেট টিউটর রাখার জন্য টাকা খরচ করতে বললে করবে কিন্তু ছেলে মেয়ের খেলার জন্য…।” তন্ময় কথা অসম্পূর্ণ রেখে মাথা নাড়লেন।
”এসব হতাশার কথা। আগে সবাইকে বলে তো দেখি।”
”ঠিক আছে, বলে দেখো।” তন্ময়ের মুখ দেখে মনে হল না তিনি হতাশা কাটাতে পেরেছেন।
মিনু—চিনু চুপ করে খেয়ে যাচ্ছিল আর বাবা—মার কথা শুনছিল। এবার মিনু বলল,”মা, আমি টেনিস খেলব?”
”হ্যাঁ।”
”আর কে খেলবে?”
”এখানকার সবাই খেলবে।”
চিনু ফিসফিস করে বলল, ”মা আমি?”
”সোমবার তোমার এক্স—রে করার দিন। কলকাতায় ডাক্তারকাকা সেটা দেখবেন। তারপর তিনি যদি খেলতে বলেন তো খেলবে।”
”মা, তুমিও খেলবে? আগে তো খেলতে!” মিনু বলল।
”হ্যাঁ, আমিও খেলব… যদি দরকার পড়ে।”
.
”আরে মিসেস বসুমল্লিক! কী ব্যাপার?” সুধা ঘোষাল অবাক হয়ে অভ্যর্থনা জানালেন তপতীকে। বাংলোর বারান্দায় বেতের চেয়ার টেনে বললেন, ”বসুন, বসুন। অনেকদিন পর এলেন।”
”মাসতিনেক প্রায়। ছোট ছেলের অসুখের জন্য কোথাও আর যেতে পারি না।” চেয়ারে বসলেন তপতী। সুধা ঘোষালের স্বামী এখানকার চিফ লেবার অফিসার। ওঁদের এক ছেলে সুধেন্দু ক্লাস সেভেন—এ পড়ে।
”ছেলে এখন কেমন আছে?”
”ভাল। অল্প অল্প ছুটছে, কোনও কষ্ট হচ্ছে না।”
”ভোরে তো দেখি দুই ছেলেকে নিয়ে বেড়াতে বেরোন, খুব ভাল এটা। আমিও মাঝে মাঝে ভাবি সকালে একটু বেড়াই। কিন্তু মুশকিল কী জানেন, ডান হাঁটুতে একটু বাতের মতো হয়েছে, তা ছাড়া সুধেন্দুকে নিয়ে পড়াতে বসতে হয়। ক্লাস সেভেন থেকে যদি পড়ায় জোর না দেয় তা হলে স্কুল ফাইনালে ভাল রেজাল্ট করবে কী করে?”
