তন্ময়ের বলার ভঙ্গিতে বোঝা গেল তিনি এটা নিয়ে চিন্তিত।
”এখানে খেলা শেখানো!” ভ্রূ কপালে তুলে রাজেন হতাশভাবে মাথা নাড়ল।
”এখানে মাঠটাঠ আছে, কিন্তু লোকের কোনও উৎসাহ নেই। এই দেখুন না ওই যে টেনিস কোর্টটা, কত বড় বড় ঘাস গজিয়ে গেছে, কেউ খেলে না বলেই তো! সবাই তাস আর ক্যারাম খেলে চা—শিঙাড়া খেয়ে বাড়ি চলে যায়। অথচ খেলার জন্য নেট, কিছু পুরনো বল ক্লাবে পড়ে আছে। ঘাস ছাঁটাইয়ের জন্য একটা লন—মোয়ারও রয়েছে।
”একদিন মিস্টার ভটচাযকে বলেওছিলাম, নতুন সেক্রেটারি হলেন, ক্লাবের হালটা একটু ফেরান। শুধু আড্ডা দেওয়া ছাড়াও মেম্বাররা যাতে একটু ছোটাছুটি করে ঘাম ঝরাতে পারে, তার ব্যবস্থা করুন না! উনি বললেন, ‘কী ব্যবস্থা করব বলুন? টেবল টেনিস বোর্ড কেনার জন্য কমিটি মিটিংয়ে প্রপোজাল দিলাম, সবাই হাঁ হাঁ করে উঠল। বলল, ‘বোর্ড পাতবেন, জায়গা কোথায়?’ আসলে বোর্ড পাতলে তাস খেলার টেবলগুলো তুলে দিতে হবে তো। বললাম, ‘টেনিস কোর্টটাকে ঠিকঠাক করে দেখুন না আবার চালু করা যায় কি না।’ উনি বললেন, ‘কিসসু হবে না, খেলার লোকই পাওয়া যাবে না। আপনাকে একা একাই খেলতে হবে।’ ভেবে দেখলাম, মিস্টার ভটচায বাজে কথা বলেননি। তবে লোকটা খেলা ভালবাসেন।”
রাজেন নিরুৎসাহিত গলায় কথাগুলো বলে চায়ের কাপ নেওয়ার জন্য শুভার দিকে হাত বাড়াল। তপতী মুখ ঘুরিয়ে অন্ধকার টেনিস কোর্টটার দিকে তাকালেন। কিছু একটা তিনি ভাবছেন। প্রতিভাদের টেবলের মহিলারা উঠলেন। বাড়ি যাওয়ার জন্য ছেলেমেয়েদের ডাকাডাকি শুরু হল।
”আমি একবার মিস্টার ভটচাযের সঙ্গে দেখা করব।” তপতী বললেন।
”কেন?” তন্ময় জানতে চাইলেন।
”যদি কোর্টটাকে আবার জাগিয়ে তোলা যায়। দেখি উনি ক্লাবঘরে আছেন কি না।” তপতী চেয়ার থেকে উঠলেন। কয়েক পা যেতেই পড়লেন প্রতিভার সামনে।
”তোমার ছোট ছেলের নাকি খুব অসুখ হয়েছে শুনলাম,” অত্যন্ত উদ্বিগ্ন মুখ প্রতিভার। অসুখটা যেন তাঁর নিজের ছেলেরই হয়েছে।
”হ্যাঁ।”
”আহা রে, একেই তো বরাবরের রুগণ, তার ওপর আবার অসুখ, ছেলেটার যে কী কপাল! অসুখটা কী?”
”টিউবারকুলাসিস, যাকে বলে ক্ষয়রোগ।” তপতী ধীর স্বরে বললেন।
”ও মা! টিইবিই! ভাল ডাক্তার দেখাচ্ছ তো?”
”দেখাচ্ছি।”
”এখন কেমন আছে? মুখ দিয়ে রক্ত টক্ত ওঠে?”
”ওই তো বসে রয়েছে দেখুন না! এখন চিনু ভোরে ওর দাদার সঙ্গে ছোটে।”
”না, না, না, ছোটাছুটি করিও না, ফুসফুস ড্যামেজ হলে ধুঁকতে ধুঁকতে সারা জীবন কাটাবে, চিরকালের মতো অক্ষম হয়ে যাবে।”
”আর নয়তো ক্ষয়ে ক্ষয়ে ভ্যানিশ হয়ে যাবে।” তপতী হাসতে শুরু করলেন। প্রতিভা সন্দিহান চোখে তপতীর হাসি দেখতে দেখতে গম্ভীর হয়ে গেলেন।
”যাই, দেরি হয়ে যাচ্ছে।” বলে প্রতিভা হনহনিয়ে এগিয়ে গেলেন।
ক্লাবের অফিসে বসে কমল ভটচায দু’জন মেম্বারের সঙ্গে কথা বলছিলেন। প্লাইউডের পার্টিশন করা খোপের মতো একটা ঘর। দরজায় পাল্লার বদলে একটা পরদা ঝুলছে। তপতীকে দেখে কমল ভটচায অবাক হলেন।
”আপনি! কী ব্যাপার? বসুন, বসুন।”
”একটা বিষয়ে একটু কথা বলতে এসেছি।” একমাত্র খালি চেয়ারটায় বসে তপতী কোনও ভনিতা না করে বললেন, ”ক্লাবের টেনিস কোর্টটাতে খেলার ব্যবস্থা করুন। জানি মেম্বারদের খুব একটা উৎসাহ নেই, কিন্তু তাদের ছেলে মেয়েদের তো থাকতে পারে।”
কমল ভটচায আচমকা এমন একটা অনুরোধের সামনে পড়ে ভেবে পেলেন না কী জবাব দেবেন। কিন্তু কিন্তু করে বললেন, ”এমন একটা প্রস্তাব অবশ্য রাজেন রায়চৌধুরী একবার আমাকে দিয়েছিলেন। উনি তো একসময় কলকাতায় টেনিস খেলতেন, শুনেছি ভালই খেলতেন, তাই হয়তো টেনিস প্রীতিতেই কথাটা তুলেছিলেন। কিন্তু মিসেস বসুমল্লিক, অসুবিধেটা কী জানেন, মেম্বাররা সারাদিন নানান শিফটে মিল আর অফিস করে রিল্যাক্স করার জন্য এখানে আসেন, তাই কেউ আর টেনিস নিয়ে উৎসাহী হন না। তবে আপনি যেটা বললেন, ছেলেমেয়েদের কথাটা, হ্যাঁ, এটা ভেবে দেখা যেতে পারে। কিন্তু করে কে? কোর্টটায় শুধু বড় বড় ঘাসই নয়, বড় বড় গর্তও আছে। খোয়া, নুড়ি ছড়ানো, জমি অসমান। রীতিমতো মেহনত করতে হবে ওটাকে নিয়ে। এদিকে ক্লাবে একজন বেয়ারা, একজন কুক। মালি ছিল, তাকে এই মাসেই ছাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। মাসের অর্ধেক দিন তার দেখাই পাওয়া যেত না।”
”আপনার অসুবিধেগুলো আমি বুঝতে পারছি।” তপতী নম্র আন্তরিক ভঙ্গিতে বললেন। ”কিন্তু কেউ যদি দায়িত্বটা নেয় তা হলে কি আপনি সাহায্য করবেন?”
”নিশ্চয় করব। কিন্তু সাহায্য বলতে কী বোঝাচ্ছেন? আপাতত আমার লোকবল নেই। বেয়ারা কি কুক, মাঠের কাজ করবে না বললে তাদের দিয়ে করাতে পারব না। অর্থবলও তেমন নেই যে, লোক ভাড়া করতে পারব। নামেই অফিসার্স ক্লাব, অর্ধেক মেম্বারই তিন—চার মাসের চাঁদা বাকি ফেলেছেন। তাই নিয়েই তো এঁদের সঙ্গে কথা বলছিলাম।” কমল ভটচায হাত দিয়ে দেখালেন এতক্ষণ চুপ করে বসে থাকা দু’জনকে।
”লোকজন বা টাকা কিছুই দিতে হবে না, শুধু কোদাল, ঝুড়ি, বালতি, জল এইসব; আর লন—মোয়ারটা দিলেই হবে।”
”মোয়ারটা খারাপ হয়ে পড়ে আছে। একটা চাকা আর কী যেন ভেঙেছে।”
”সে আমি সারিয়ে নেব।… তা হলে আপনি অনুমতি দিচ্ছেন।”
