”কেন? তুই জল দিতে গেছলি কেন?”
”ও আজ ওয়াটারবটল নিয়ে যেতে ভুলে গেছল। ক্লাসে ওর খুব তেষ্টা পেয়েছিল তাই দিলীপের কাছে জল চাইল। আমি বললুম, ‘আমারটা থেকে খা’, ও বলল, ‘তোর ওয়াটারবটল থেকে জল খাব না। তোদের বাড়িতে ক্ষয়রোগের রুগি আছে। তোর জল খেলে আমারও ক্ষয়রোগ হবে।’ আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘ক্ষয়রোগ কাকে বলে?’ ও বলল,’ক্ষয়ে ক্ষয়ে ভ্যানিশ হয়ে যায় বলে এর নাম ক্ষয়রোগ।’ হ্যাঁ মা, সত্যি? চিনু ভ্যানিশ হয়ে যাবে?”
শুনতে শুনতে তপতীর চোখে জল এসে গেল। কথাগুলো নিশ্চয় সুব্রত বাড়িতে শুনেছে বলেই বলেছে। বাড়ির লোকরা কী নিষ্ঠুরের মতো এইরকম কথাবার্তা বলেছে। সুব্রত মজুমদারের মা প্রতিভা খুবই অমায়িক, মিষ্টভাষী, প্রায়ই স্বামীর সঙ্গে অফিসার্স ক্লাবে যান, সেখানে গল্পের আসর বসান। তপতীকে দেখলেই বলেন, ”এই যে পূর্ণিমা, তোমার অমাবস্যাটি কোথায়?”
গরম লোহার শিকের মতো ‘ভ্যানিশ’ শব্দটা ঢুকে গিয়ে তপতীর মাথাটা গরম করে দিল। একটা জেদ তাঁকে ধীরে ধীরে পেয়ে বসল। তিনি স্থির করলেন আজই ক্লাবে যাবেন এবং চিনুকে সঙ্গে নিয়ে।
সন্ধ্যার পর বসুমল্লিকরা চিনুকে নিয়ে ক্লাবের সামনে ভক্সহল থেকে নামলেন। সঙ্গে ফুটোনো জলে ভরা ওয়াটারবটল। মিনুকে তাঁরা সঙ্গে আনেননি। ক্লাবের লনে ছোট ছোট টেবল ঘিরে চেয়ার। দশ—বারোটি দম্পতি এবং তাঁদের বাচ্চচা ছেলেমেয়েরা চেয়ার ভরিয়ে রেখেছে। একটি টেবল ঘিরে পাঁচজন মহিলা, তাদের মাঝে প্রতিভা মজুমদার হাত নেড়ে নেড়ে, ভ্রূ নাচিয়ে কথা বলে যাচ্ছেন, বাকি চারজন মুগ্ধ হয়ে শুনছেন। তপতী আর তন্ময়কে দেখে প্রতিভা আজ আর হাত তুললেন না। ফিসফিস করে অন্যদের কী যেন বললেন। সকলেই মুখ ঘুরিয়ে বসুমল্লিকদের দিকে তাকাল।
লনের মাঝখানে লোহার পোস্টের মাথায় উজ্জ্বল বিদ্যুতের আলো। তার নীচে একটা ফাঁকা টেবলে ওঁরা বসলেন। বেয়ারা এল, কিছু খাবে কি না জানতে।
”কী আছে আজ?” তন্ময় জানতে চাইলেন।
”চিকেন পকৌড়া, শিঙাড়া, চানা—মটর।”
তন্ময় হাত তুলে বেয়ারাকে থামিয়ে দিলেন। ”ওসব খাবার চলবে না।”
”তিন গ্লাস জল দাও আগে, তারপর এক পট চা আর তিনটে কাপ।” তপতী ফরমায়েশ দিলেন। তারপর চিনুকে বললেন, ”যা, দোলনায় চড় গিয়ে।”
একধারে দুটি দোলনা, স্লিপ এবং সি—স্য রয়েছে বাচ্চচাদের খেলার জন্য। কিছু বাচ্চচা খেলছে। দোলনায় দুলছে দুটি মেয়ে। চিনু গিয়ে দোলনার পাশে অপেক্ষা করতে লাগল। হঠাৎই প্রতিভাদের টেবল থেকে একজন চেঁচিয়ে উঠল, ”শিলু, শিগগির চলে এসো এখানে।” কিন্তু শিলু নামের মেয়েটি মায়ের কথা অগ্রাহ্য করে দুলেই চলল। তার মা উঠে গিয়ে দোলনা থামিয়ে শিলুর গালে চড় কষিয়ে টানতে টানতে নিয়ে এলেন।
খালি দোলনাটায় চিনু উঠতে পারছিল না, তপতী উঠে গিয়ে তাকে বসিয়ে দিয়ে দোল দিতে লাগলেন। মিনিট পাঁচেক পর ছেলেকে নিয়ে টেবলে ফিরে এলেন। বেয়ারা চা ও জল দিয়ে গেছে। একটা গ্লাস থেকে জল ফেলে দিয়ে বাড়ি থেকে আনা জল তাতে ভরে চিনুকে বললেন, ”একটু জল খা।”
চিনু যখন জল খাচ্ছে, তপতী আড়চোখে দেখলেন প্রতিভা তাঁদের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন। তিনটি কাপে তিনি চা ঢাললেন, তবে একটিতে যৎসামান্য। সেটি চিনুর দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, ”এক চুমুক, ব্যস।” জীবনে চা খায়নি চিনু, সে অবাক হয়ে মায়ের দিকে তাকাল। ”যা বলছি কর, ঠিক এক চুমুক।”
চিনু তাই করল। তপতী আড়চোখে তাকালেন আবার এবং মনে মনে হাসলেন। সেই সময় ক্লাবে ঢুকল রাজেন এবং শুভা। বসুমল্লিকদের দেখতে পেয়ে তাদের টেবলেই ওরা এসে বসল। বেয়ারা এল। কী খাদ্য আছে, জানতে চাইল রাজেন এবং শুনে নিয়ে সে তন্ময়কে বলল, ”দাদা তা হলে পকৌড়াই আনাই। বউদি, শিঙাড়া চলবে?”
”না।” হেসে তপতী বললেন, ”কোনওটাই না।”
”সে কী! আমি তো আপনাদের খেতে দেখেছি বলে মনে হচ্ছে।”
”যে খাবার আমার ছেলেদের খেতে দিই না, সে খাবার এখন আমরাও খাচ্ছি না।” তন্ময় উত্তর দিলেন। ”আসলে চিনুর এই অসুখটাই আমাদের সচেতন করে দিয়েছে। আমাদের, মানে ছেলেদের স্বাস্থ্যের ব্যাপারটা। ওদের ভাল স্বাস্থ্য গড়ে দেওয়ার কাজে আমরা নেমেছি। সেজন্য কিছু বিধিনিষেধ আমরা মানছি। তার মধ্যে রয়েছে এই খাওয়ার ব্যাপারটা। মুখরোচক এইসব খাবার ওদের খেতে দিই না, সেজন্য আমরাও খাই না।” তন্ময় হাসতে শুরু করলেন।
”দারুণ কাজে নেমেছেন তো।” এই বলে রাজেন পাশে দাঁড়ানো বেয়ারাকে বলল,”শুধু চা দাও।”
”কিছু খাবে না তোমরা!” তন্ময় বললেন কিঞ্চিৎ অপ্রতিভ হয়ে।
”না দাদা। কিছু বিধিনিষেধ আমিও আজ জারি করলাম। যে খাবার আপনারা খাবেন না, সে খাবার…।”
রাজেন শেষ করার আগেই তন্ময় হেসে উঠলেন। ”নিষেধ মেনে শেষ পর্যন্ত চলতে পারবে তো? বাঙালির নোলা বিশ্বাসঘাতকতায় খুব পটু।”
”আপনাদের একটা কাজের তো পরিচয় পেলাম, এর পর আর কী কাজে নেমেছেন?”
”নামা হয়নি, তবে নামার জন্য চিন্তা করছি।” তপতী বললেন। ”ওদের কোনও একটা খেলা শেখানোর ব্যবস্থা করা। শুধুমাত্র পুষ্টিকর খাওয়া দিয়েই তো স্বাস্থ্য হয় না, শরীর গড়তে পরিশ্রমেরও দরকার হয়।”
”আচ্ছা রাজেন, ওদের কোন খেলা শেখানো যায় বলো তো?”
