”একটাও নয়। জ্বর এসে গেল, একটায় নেমে আর নামেনি।”
শুভা বলল, ”বড় রুগণ ছেলেটা, খেলাধুলো ওর দ্বারা হবে না।”
খাওয়ার পর ওরা দু’জন আবার খেলতে বসল। মিনু প্রতিপক্ষের ঘুঁটির দিকে হুঁশ না রেখে চাল দিলেই ব্রজেন প্রত্যেকবারই তার ভুল ধরিয়ে দিয়েছেন।
”তুমি যে মন্ত্রীটা ওইখানে দিলে কিন্তু লক্ষ করলে না আমার গজ ওই কোণ থেকে এসে একে মেরে দেবে। নাও, চাল ফিরিয়ে নতুন চাল দাও। … আমি কিন্তু আর চাল ফেরত দেব না বলে রাখলাম।”
মিনু একবার ঘোড়া দিয়ে একটা বোড়েকে খেতেই ঘোড়ার খালি করে দেওয়া ঘরে ব্রজেন তাঁর মন্ত্রীকে তুলে মিনুর রাজাকে কিস্তি দিলেন। ”আমি ইচ্ছে করেই বোড়েটাকে তোমার ঘোড়ার মুখে ফেলে দিয়েছিলাম, দেখি তুমি টোপ গেলো কি না। তুমি গিলে ফেললে আর আমারও কিস্তি দেওয়ার রাস্তা পরিষ্কার হয়ে গেল। … ভাবো, সময় নিয়ে প্রত্যেকটা চাল দেওয়ার আগে ভাবো। সবদিক বিবেচনা করো। একদম তাড়াহুড়ো করবে না।”
হেরে গিয়ে মিনুর মুখ প্রায় লাল হয়ে উঠল। চোখে হেরে যাওয়ার লজ্জা, সেটা লক্ষ করে ব্রজেন বললেন, ”খেলা শিখেই কেউ ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়ান বটভিনিকের মতো খেলতে পারে না। তুমি এখন বারবার আমার কাছে হারবে, তারপর এমন একটা সময় আসবে যখন তুমিই আমায় বারবার হারাবে। হারা আর হারানো এই দুইয়ের মাঝে শুধু প্র্যাকটিস আর প্র্যাকটিস।”
”আর এক হাত খেলব।” মিনু চোখ নামিয়ে বলল।
”আর নয় আর নয়, রাত হয়ে গেছে।” শুভা তাড়া দিল। ”মিনু, বাড়ির সবাই ভাববে, এবার বাড়ি যাও।”
”খেলুক না বউমা।”
”না বাবা, দশটা বাজে। ওইটুকু ছেলের এখন শুয়ে পড়ার কথা।”
”ঠিক আছে, তা হলে কাল আবার আমরা বসব, কেমন? এবার চলো তোমাকে পৌঁছে দিয়ে আসি।”
।।২।।
তন্ময়ের বন্ধু অপূর্ব হালদারের চেম্বার ওয়েলিংটন স্কোয়ারের কাছে ধর্মতলা স্ট্রীটে। লন্ডন থেকে ডিগ্রি পাওয়া শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ, তন্ময়ের স্কুলের সহপাঠী। চিনুকে দেখাবার জন্য তারিখ ও সময় ঠিক করতে তন্ময় ফোন করেছিল অপূর্বকে। ”তোর ছেলেকে দেখাবার জন্য আবার অ্যাপয়েন্টমেন্ট লাগবে নাকি! যেদিন খুশি, রবিবার বাদে সন্ধে ছ’টা থেকে আটটার মধ্যে চলে আয় চেম্বারে।” তন্ময় এই উত্তর পেয়েছিল।
”তা হলে আর দেরি করে লাভ নেই, কালই চলো।” উদ্বিগ্ন স্বরে বলেছিল তপতী। ”জ্বরটা রয়েই গেছে। বাড়ছে কমছে, সঙ্গে কাশিটাও, ব্যাপারটা ভাল ঠেকছে না।”
সুতরাং পরদিন যাওয়াই ঠিক হল। বিকেল পাঁচটা নাগাদ তারা মহাদেবপুর থেকে রওনা হয়। মিনুকে নিয়ে সামান্য ঝামেলা হল রওনা হওয়ার আগে। সাড়ে তিনটের সময় স্কুল থেকে ফিরেই সে বাড়ির কাছে একটা ছোট মাঠে ফুটবল খেলতে যেত। এখন আর যায় না। এখন যায় ব্রজেনদাদুর সঙ্গে দাবা খেলতে। দাবা তাকে রীতিমতো আচ্ছন্ন করে ফেলেছে। বল খেলার বদলে রোজ সে ঘণ্টা তিনেক বসে থাকে দাবার ছকের সামনে, একটা বুড়োমানুষের মতো।
সেদিন যথারীতি সে দাবার ছকের দিকে একাগ্র দৃষ্টিতে তাকিয়ে চিন্তায় মগ্ন। এমন সময় বেলা গিয়ে তাকে ডাকল। ”মিনু শিগগির এসো, ওরা সবাই রেডি হয়ে গেছে, তুমি গেলেই গাড়িতে উঠবে।”
মিনু তখন তার ঘোড়াকে বাঁচাবার জন্য কোথায় সরাবে ভেবে পাচ্ছে না। বেলার কথা শুনে রেগে উঠে সে বলল, ”আমি যাব না যাও। চিনুকে ডাক্তার দেখাতে নিয়ে যাবে তো আমি গিয়ে কী করব? এখন ভাগো।”
বেলা ফিরে এসে তন্ময় ও তপতীকে শুনিয়ে দিল মিনুর কথাগুলো। তন্ময় প্রায় লাফিয়ে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালেন। তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে তপতী বললেন, ”তোমায় যেতে হবে না, আমি যাচ্ছি।” তপতী দ্রুত বেরিয়ে গেলেন।
”মিনু, বাবা অপেক্ষা করছেন।” তপতী কথাটা বলে ব্রজেনবাবুর দিকে তাকালেন, ”আমরা কলকাতা যাব, মিনুও সঙ্গে যাবে। আজ আর ও খেলবে না।”
”তোমরা যাও না…” আবদেরে নাকি সুরে মিনু বলতে শুরু করেছিল।
”মিননু।” কঠিন চাপা স্বরে তপতী তাকে থামিয়ে দিলেন, ”উঠে এসো।”
মায়ের চোখে ধকধকে আগুন দেখে মিনু উঠে পড়ল।
”মায়ের কথা শুনতে হয়। খেলা আজকের মতো অ্যাডজোর্নড রইল।” মিনুর পিঠে হাত রেখে স্নেহভরে ব্রজেনবাবু বললেন, ”ছকে ঘুঁটিগুলো যেমন আছে ঠিক তেমনই থাকবে। কাল আবার শুরু হবে, আমি প্রথমে চাল দেব, কেমন? এখন যাও। বাবা—মার অবাধ্য হতে নেই।”
তারা অপূর্ব হালদারের চেম্বারে পৌঁছল সওয়া ছ’টায়। বসার ঘর ভর্তি রোগী আর সঙ্গের লোক। তন্ময় ছাপা স্লিপে নাম লিখে পাঠাল। ডাক্তারকে দেখিয়ে একজন বেরিয়ে আসতেই তাদের ডাক পড়ল। অপূর্ব ছোটখাটো গোলগাল চেহারার মানুষ, চোখে চশমা, মুখে সবসময় হাসি। অনেকদিন পর দেখা হলে যেরকম কথাবার্তা হয় তাদের মধ্যে, তাই হল। বাইরে রোগীরা অপেক্ষা করছে, তাই ডাক্তার কথা বদল করে চিনুর দিকে নজর দিলেন। চোখ, জিভ, বুক, শ্বাস—প্রশ্বাস, গলার ভেতর, পেট ইত্যাদি শরীরের সাধারণ পরীক্ষাগুলো করতে করতে তিনি তপতীর কাছ থেকে চিনুর নিয়মিত জ্বর হওয়া, কাশি হওয়া সম্পর্কে খবর নিয়ে ভুরু কোঁচকালেন।
”ছেলেটা বড় রোগা। ওকে কি বড় ছেলেটার মতো স্বাস্থ্যবান করা যায় না?” তন্ময় কথাটা বলে মিনুর কাঁধে হাত রাখলেন সস্নেহে।
”কেন মোটা করা যাবে না! শরীরের যত্ন নিলে, ঠিকমতো খাওয়াদাওয়া, খেলাধুলো, ছোটাছুটি করলে, মন প্রফুল্ল থাকলে স্বাস্থ্য ভাল হবেই। তার আগে এখন দেখতে হবে ওর শরীরে অসুখটা কী।” অপূর্ব চিনুর মুখের দিকে চোখ রাখলেন। ডাক্তারের মুখে হাসি থাকলেও তপতীর বুক ছমছম করে উঠল। বেচারা চিনু। বসে—যাওয়া চোখমুখ এখন যেন আরও বসে গেছে।
