”নিয়ে কী করবি?”
”বাইরে বাগানে গিয়ে দেয়ালে বল মেরে মেরে খেলব। আমাকে একটা টেনিস বল কিনে দেবে?”
”দেব। এখন আর কথা নয় চিনু, এবার ঘুমো।”
”দাদাকে একটা র্যাকেট কিনে দিও, তা হলে দু’জনে খেলব।”
”কিনে দোব… এবার ঘুমো।”
”আমাদের এখানে টেনিস খেলার মতো জায়গা নেই, সেই ক্লাবে গিয়ে খেলতে হয়। এখানে একটা কোর্ট থাকলে খুব ভাল হত, তাই না?”
”হ্যাঁ, ভাল হত।”
”কপালে হাত দিয়ে দেখো, এখন আমার জ্বর নেই।” চিনু মায়ের হাতটা তুলে নিয়ে নিজের কপালে রাখল। তপতীর মনে হল, সত্যিই যেন জ্বরটা কম।”
”রাতে তোর কাশি হয়?”
”হ্যাঁ।”
”একদম ঠাণ্ডা লাগাবি না। এবার থেকে সবসময় সোয়েটার পরে থাকবি।”
ঘরের দরজা থেকে বেলা বলল, ”বউদি, দাদার খাবার কি তুলে রাখব, উনি তো পায়েস খাননি।”
তপতী তাড়াতাড়ি বিছানা থেকে উঠে খাওয়ার ঘরে এসে দেখলেন বাটিতে পায়েস যেমন ছিল তেমনই রয়েছে। তন্ময় বসার ঘরে বড় সোফায় টানটান শুয়ে খবরের কাগজ পড়ছেন। তপতী বাটিটা থেকে একটা প্লেটে অর্ধেক পায়েস ঢেলে নিয়ে বেলাকে বললেন,”এটা দাদাকে দিয়ে এসো। আর বোলো কাল পায়েস করব সবার জন্য।”
বেলা ফিরে আসতেই তপতী বললেন, ”এই পায়েসটা তুমি খেয়ে নিয়ো।”
”সে কী বউদি, তুমি খাবে না!”
”না। চিনু ভাল হোক, ওর সঙ্গে খাব।”
এই সময়ই ধুপধাপ পায়ের শব্দ করে মিনু ফিরল, তার সঙ্গে রাজেনের বাবা ব্রজেন রায়চৌধুরী। বয়স প্রায় সত্তর। তামাটে রং, লম্বায় ছয়—দুই, ওজন একশো সত্তর পাউন্ড, মাথাভর্তি ধবধবে ব্যাকব্রাশ করা চুল। চোখে পড়ার মতো হল ওর গোঁফ। খুবই পুষ্ট এবং গোরুর শিঙের মতো ডগা দুটো ওপর দিকে তোলা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে তিনি মেজর ছিলেন সেনাবাহিনীতে, স্বাধীনতার পর মিলিটারি ছেড়ে এক বিলিতি সওদাগরি অফিসে যোগ দেন। বছর তিনেক আগে বিভাগীয় ম্যানেজারের পদ থেকে অবসর নিয়েছেন। হাতের অফুরন্ত সময় কীভাবে কাটাবেন, ধর্মচর্চায় না গ্রামের বাড়িতে পোলট্রি করে, এই ব্যাপারে কোনও সিদ্ধান্তে আসতে না পেরে অবশেষে দাবায় মন দেন। এখন তাতেই ডুবে আছেন।
পায়েসের নেমন্তন্ন রাখতে গিয়ে মিনুর চোখ পড়ে বসার ঘরের টেবলে রাখা দাবার ছকের ওপর। কৌতূহলী হয়ে সে ঘুঁটিগুলো নেড়েচেড়ে দেখতে থাকে। ব্রজেন ইজিচেয়ারে হেলান দিয়ে সিগার খেতে খেতে তিনবার পড়া আগাথা ক্রিস্টির একটা গোয়েন্দা—বই পড়ছিলেন সময় কাটাবার জন্য আর কিছু না পেয়ে। হঠাৎই তাঁর চোখ পড়ল মিনুর ওপর। তাঁর মনে হল এই বাচ্চচা ছেলেটি দাবায় আগ্রহী। একে যদি খেলাটা শিখিয়ে দেওয়া যায়, তা হলে সারাদিনে গোটা চল্লিশ হাই তোলা থেকে বোধ হয় রেহাই পাওয়া যেতে পারে।
”দাবা খেলবে?”
”হ্যাঁ।”
”খেলেছ কখনও?”
”না, তবে খেলতে দেখেছি।”
মিনুর সপ্রতিভ উত্তর ব্রজেনের ভাল লাগল। তিনি টেবলে উঠে গিয়ে সাদা ঘুঁটিগুলো ছকে সাজিয়ে বললেন, ”এবার তুমি কালো ঘুঁটিগুলো সাজিয়ে দিতে পারবে?”
মিনু সাজানো সাদা ঘুঁটি দেখে দেখে সাজিয়ে দিল কালো ঘুঁটি এবং বেশ দ্রুতই।
”ঘুঁটিগুলোর নাম জানো?”
”হ্যাঁ। এটা গজ, এটা ঘোড়া, এটা নৌকো, এটা রাজা।”
”কোনটের চাল কীরকম তা জানো?”
”জানি।”
”ঘোড়ার চাল দেখাও তো।”
মিনু আড়াই চাল দেখাল। ব্রজেন অবাক হয়ে তার মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন,”তুমি শিখলে কার কাছে? বাড়িতে কেউ খেলে না কি?”
”স্কুলে দু’জন সার টিফিনের সময় টিচার্স রুমে খেলেন। আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখি।” মিনুর দাঁত ঝলসে উঠল হাসিতে। ”দেখতে, দেখতে খানিকটা শিখে গেছি।”
”দেখি তো কেমন তুমি শিখেছ!” ব্রজেন উদ্দীপিত হয়ে উঠলেন। যদি একটা খেলার সঙ্গী জোটে। ”তোমার সাদা ঘুঁটি, আমার কালো। নাও চাল দাও।”
মিনু রাজার সামনের বোড়ে দু’ঘর এগিয়ে দিল। ব্রজেন তার মুখের দিকে একবার তাকিয়ে প্রথম চাল দিলেন। দশ—বারো চাল খেলার পর তাঁর মনে হল, ছেলেমানুষি বুদ্ধিতে খেললেও এই বাচ্চচা ছেলেটিকে এক মাসের মধ্যে চলনসই প্রতিপক্ষ হওয়ার মতো করে গড়ে তুলতে পারবেন। মিনু তার প্রথম খেলায় হারল পনেরো চালে।
”ঘুঁটি সাজাও, এবার আমার সাদা।” ব্রজেন উত্তেজনা বোধ করছেন। নিভে যাওয়া সিগারটা ধরালেন।
”দাবা এখন থাক।” ব্রজেনের স্ত্রী তাড়া দিলেন। ”খেয়ে নিয়ে বরং আবার বোসো, লুচি ভাজতে শুরু করেছে বউমা।”
খাওয়ার সময় ব্রজেন মিনুর পিঠে হাত রেখে শুভাকে বললেন,”মিনু যে এত তাড়াতাড়ি খেলাটা ধরে ফেলবে, ভাবতেই পারিনি। আমার একটা সমস্যা মিটে গেল বউমা।”
”মিনু আজ কত প্রাইজ পেয়েছে যদি দেখতেন! আপনার ছেলে বলছিল, ও ন্যাচারাল অ্যাথলিট, যে খেলা ধরবে তাতেই ওপরে উঠবে। হবে নাই—বা কেন, বাবা—মা দু’জনেই অল্পবিস্তর স্পোর্টসের মধ্যে ছিল, বাবা সাঁতারে, মা টেনিসে। পরিবারের আবহাওয়াও তো অনেক সাহায্য করে ছেলেমেয়েদের।”
”তোমার এক ভাইকে দেখেছি, কী যেন নাম?” ব্রজেন জানতে চাইলেন মিনুর দিকে তাকিয়ে।
”চিন্ময়, চিনু। … কাকিমা, আমি আর একটা বেগুনভাজা খাব।”
ব্রজেন তারিফ ভরা স্বরে বললেন, ”মিনু তো দেখছি ভাল খাইয়েও। বউমা, একটা নয়, দুটো বেগুনভাজা আর লুচি, চলবে তো?” মিনু সম্মতি জানিয়ে মাথা নাড়ল। ”চিনু আজ ক’টা প্রাইজ পেল?” ব্রজেন প্রশ্ন করলেন মিনুকে।
