ডাক্তার প্রেসক্রিপশন লিখে তন্ময়ের হাতে দিয়ে বললেন, ”বুকটা এক্স—রে করিয়ে নে আর সেইসঙ্গে মানটু টেস্টও।”
শুনেই তপতী প্রায় আর্তনাদের মতো স্বরে বললেন,”সে কী। এসব তো…।”
ভয়ে আর বাকি কথাগুলো বললেন না।
”এগুলো রুটিন চেক—আপ। টিবি যে হয়েছেই আপনি তা ধরে নিচ্ছেন কেন?” তপতীর উদ্বিগ্ন মুখের দিকে ডাক্তার তাকালেন। ”কিংবা যদি হয়েই থাকে তাতেই বা ভয় পাওয়ার কী আছে। টিবির অ্যালার্জি আছে কি না সেটা বোঝার জন্যই মানটু টেস্ট। অন্য অনেক রোগের ব্যাপারেও এই টেস্ট করা হয়। তা ছাড়া এমন এমন সব ওষুধ বেরিয়েছে, কমপ্লিটলি সারিয়ে দেবে। এখন প্রোটিন, ভিটামিন, আয়রন এইসব ওর দরকার। ওষুধগুলো লিখে দিলাম, ঠিকমতো খাওয়াবেন।” ডাক্তার খুব সহজ ভঙ্গিতে কথাগুলো বলে গেলেন। কিন্তু তপতী তাতে আশ্বস্ত বোধ করলেন না। ছোট্ট চিনুর অবোধ সরল মুখের দিকে তাকিয়ে তাঁর চোখ জলে ভরে এল।
”তন্ময়, এক্স—রে—টা ভাল জায়গা থেকে করবি। তোদের ওখানে তো মিলের হাসপাতাল আছে, কেমন সেটা?”
”অফিসারদের জন্য ব্যবস্থা ভালই, তবে লেবারদের জন্য নয়।”
”এক্স—রে প্লেট আর মানটু টেস্টের রিপোর্ট আমাকে দেখিয়ে যাবি, আর ওষুধগুলো এখনই যাওয়ার পথে কিনে নিয়ে যা, আজ থেকেই খাওয়াতে শুরু কর। লিখে দিয়েছি কখন কতবার খাওয়াতে হবে।”
ওরা চেম্বার থেকে যখন বেরিয়ে আসছে ডাক্তার তখন বললেন, ”তন্ময়, তোর বড় ছেলেকে দেখে মনে হচ্ছে যেন শরীরের ওজন একটু বেশিই। কত ওজন এখন? বয়স কত হল?”
”বলতে পারব না, ওজন কখনও করাইনি। বয়স নয় চলছে। জিজ্ঞেস করলি কেন, খারাপ কিছু?” তন্ময়কে উৎকণ্ঠিত দেখাল।
”বয়সের তুলনায় তো বড়ই দেখাচ্ছে। খারাপ কেন হবে, বেশ ভাল হেলথ। তবে এক্সারসাইজ না করলে মোটা হয়ে যেতে পারে। খেলাধুলো করে?”
”তা করে। স্কুলের স্পোর্টসে সাতটাতে ফার্স্ট হয়েছে।”
”গুড, ভেরি গুড।”
মহাদেবপুরে ফেরার পথে তন্ময় ওষুধগুলো কিনে নিলেন। গাড়ির পেছনের সিটে তপতী দুই ছেলেকে নিয়ে বসেছিলেন। সারা পথ তারা খুব কমই কথা বলল। একসময় মিনু জিজ্ঞেস করল, ”মা, টিবি কি একটা অসুখ?”
হ্যাঁ।
চিনুর কি টিবি হয়েছে? তপতী চমকে উঠে চিনুকে জড়িয়ে ধরলেন। ”না, হয়নি।”
পরদিন তপতী মিলের হাসপাতালে চিনুকে নিয়ে গেলেন। তাকে দেখে অল্পবয়সি ডাক্তার সিনহা অবাক হয়ে বললেন, ”কী ব্যাপার বউদি, আপনি এখানে! কিছু হয়েছে নাকি? দাদা কোথায়?”
”কারও কিছু হয়নি। সবাই ভাল আছে, শুধু আমার এই ছোট ছেলেটা ছাড়া। আপনাকে ভাই দুটো কাজ করে দিতে হবে। আপনার দাদার বন্ধু ডাক্তার হালদার কাল চিনুকে পরীক্ষা করে ওর বুকের এক্স—রে আর মানটু টেস্ট করাতে বললেন।”
তপতী প্রেসক্রিপশনটা বিস্মিত ডাক্তার সিনহার হাতে তুলে দিলেন। সেটা পড়তে পড়তে ডাক্তার বার—দুই চিনুর দিকে তাকালেন। তপতীকে কিছু বলতে গিয়েও বললেন না।
”আপনি একটু বসুন, ব্যবস্থা করছি।” ঘর থেকে ডাক্তার বেরিয়ে গেলেন, এবং ফিরলেন মিনিট পাঁচেক পর। ”ওকে নিয়ে আসুন। আপনার ভাগ্য ভাল, এক্স—রে মেশিনটা আজ সুস্থ আছে, চারদিন ধরে কাজ করছিল না।”
চিনুর বুকের ছবি নেওয়া হল। ডাক্তার ওর বাঁ হাতের পুরো বাহুতে ছুঁচ ফুটিয়ে ওষুধ ঢুকিয়ে হাতের সেই জায়গাটায় একটা টাকার মাপের বৃত্ত এঁকে দিলেন কালি দিয়ে। বৃত্তের মধ্যে চামড়ার রং বদলায় কি না বা ফুলে ওঠে কি না সেটা তিনদিন লক্ষ করতে হবে। ব্যাপারগুলো চিনু কৌতূহলভরে দেখে গেল।
তিনদিন ধরে তপতী বার বার চিনুর হাতটা নজর করলেন। বৃত্তের মধ্যে চামড়া ক্রমশই গোলাপি হতে শুরু করল, ওখানকার চামড়াটা ফুলেও উঠল। আর সেই সঙ্গে তপতীও মনে মনে ভেঙে পড়লেন। যা ভয় করেছিলেন বোধহয় সেটাই তবে ঘটেছে। এবার আর নিজে নয়, তন্ময়কে তিনি চিনুর সঙ্গে পাঠালেন, হাসপাতালে। গম্ভীর মুখে আধঘণ্টা পর তন্ময় ফিরলেন ডাক্তার সিনহার মানটু টেস্ট রিপোর্ট পকেটে নিয়ে।
”কী লিখেছে রিপোর্টে?” ব্যাকুল তপতী জিজ্ঞেস করলেন।
”যা ভয় করেছিলে তাই, পজিটিভ। কালই ওকে নিয়ে অপূর্বর কাছে যাব। দেরি করব না চিকিৎসা শুরু করতে।” তন্ময় অধৈর্য কণ্ঠে বললেন।
.
এক্স—রে থেকে চিনুর ফুসফুসে সামান্য একটা স্পট পেয়েছিলেন ডাক্তার হালদার। তন্ময়কে তিনি বললেন, ”খাওয়ার ওষুধগুলো লিখে দিচ্ছি, ইঞ্জেকশন ওখানকার ডাক্তারকে দিয়ে দিইয়ে নিবি। তিনমাস পর আবার এক্স—রে করিয়ে আমায় দেখাবি। একদম ভয় পাবি না, ওর যা হয়েছে সেটা প্রায় কিছুই নয়।” এ ছাড়াও তিনি চিনুর খাওয়া, থাকা, পোশাক, ঘোরাফেরা ইত্যাদি বিষয়ে কী কী যত্ন নিতে হবে তাও তন্ময়কে বলে দেন।
এর পরই বসুমল্লিক পরিবারে একটা পরিবর্তন এসে গেল। আলো বাতাস রোদ আসে এমন ঘরে চিনুর থাকা দরকার আর সে রকম দক্ষিণ—পুব খোলা ঘর বাড়িতে একটাই। বসবার ঘর। তপতী বললেন, ”দরকার নেই আমার বাইরের লোকজন আসার, তাদের বসাবার জন্য ঘর। চিনু ওই ঘরেই থাকবে।” তন্ময় তাতে সায় দিয়ে বলেন,”সোফাটোফাগুলো খাওয়ার ঘরে নিয়ে যাচ্ছি, কেউ এলে ওখানেই বসবে।”
পরিবর্তন এল খাওয়ার ব্যাপারেও। শুধু চিনুর জন্যই নয়, মিনুর জন্যও দুধ, মাখন, ছানা, ডিম, ভেজানো ছোলা—মটর। বেড়ে গেল ডাল ও সবুজ শাকপাতা, ডাঁটা, মাটির নীচে জন্মানো আনাজ। পেয়ারা, কলা বা মরসুমি ফল। মাছের পরিমাণও বাড়ল। সপ্তাহে তিনদিন চিকেন স্টু।
