”মা, আমিও কি ওইভাবে স্টার্ট নেব?”
”যেমন খুশি তেমনি ভাবে স্টার্ট নিবি, এটা ওলিম্পিকস নয়। এবার চল… আমার পেছন পেছন আয়, বাবার নজরে যেন সেফটিপিনটা না পড়ে, তা হলে দক্ষযক্ষ বেধে যাবে।”
”মা, দক্ষযজ্ঞ কী?”
”পরে বলব।”
বাইরে থেকে মোটরের হর্ন শোনা গেল। ওরা দু’জন প্রায় ছুটেই বাংলো থেকে বেরোল। একতলা টালির ছাদের বাড়ি। সামনের দিকে ছোট ফুলের বাগান। রাস্তার দু’পাশে বড় বড় গাছের সারি এবং একই ধরনের বাংলো রাস্তার দু’ধারে। সম—পদমর্যাদার লোকেরা এই রাস্তায় বাস করে। পুরনো ভক্সহল গাড়ির সামনে বসল তন্ময় ও তপতী, পেছনে দুই ছেলে। মোটরগাড়িটা এক সাহেবের কাছ থেকে কেনা।
স্কুলটা মহাদেবপুরের দক্ষিণ প্রান্তে গঙ্গার ধারে। স্কুলের লাগোয়াই, দুটো ফুটবল ম্যাচ একসঙ্গে খেলা যায় এত বড় মাঠ। একধারে শামিয়ানা, চেয়ার, টেবল, ফুলদানি, মাইক্রোফোন, স্তূপ করা প্রাইজসামগ্রী, খাবারের বাক্স ইত্যাদি। শামিয়ানার সামনে অভিভাবকদের জন্য কয়েক সারি চেয়ার। রঙিন কাগজের তৈরি শিকল গোটা বারো বাঁশের খুঁটিতে মালার মতো দুলছে। এক আন্টি অবিরাম ঘোষণা করে চলেছেন মাইকে। অনুষ্ঠান সভাপতি এম জে টি এম—এর জেনারেল ম্যানেজার এবং প্রাইজ হাতে তুলে দেবেন প্রধান অতিথি এক প্রাক্তন ফুটবলার, এঁরা দু’জন আসবেন স্পোর্টস শেষ হওয়ার কাছাকাছি সময়ে। সারামাঠে উদ্দীপনা, উৎসাহ, কেমন একটা উৎসব উৎসব ভাব।
বসুমল্লিক দম্পতি দুই ছেলে নিয়ে যখন হাজির হলেন তখন স্পোর্টস শুরু হয়ে গেছে। উঁচু ক্লাসের ছেলেদের ইভেন্টগুলো মাঠের অন্যদিকে পুরুষ শিক্ষকদের তদারকিতে চলছে। তাদের আটশো মিটার দৌড় তখন মাঝপথে। মাঠের মাঝে চুনকাম করা খুরি দশ মিটার অন্তর বসানো ট্র্যাক ঘিরে। গাড়ি থেকে নেমেই চিনু ফিসফিস করে মাকে বলল, ”ওইখানে আমাদের দৌড়তে হবে?”
”ওখানে বড় ছেলেদের দৌড় হবে। তুই তো পঞ্চাশ মিটরে দৌড়বি। এদিকে ওই যে লম্বা লম্বা দাগ, ওখানে তোদের দৌড়তে হবে।”
ওঁরা ‘গেস্ট’ লেখা সংরক্ষিত জায়গার দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন—তখন সুবেশা, স্থূলকায়া এক মহিলা হাতছানি দিয়ে তপতীকে ডাকলেন। ”মিসেস বসুমল্লিক, আগে ওই টেবলে বসা মিস দাসের কাছে গিয়ে জানিয়ে আসুন আপনার ছেলেরা এসেছে। …ক’টা ইভেন্টে ওরা নামবে?”
”অনেক ইভেন্ট। মিনুর তো রানিং ইভেন্টই তিনটে, তা ছাড়া স্যাক রেস, অঙ্ক রেস, জিলিপি রেস, ব্যালান্স রেস… এক মিনিট মিসেস সেন, এসে বলছি।” তপতী কথা অসমাপ্ত রেখে মিস দাসের টেবলের দিকে ছুটলেন। সেখানে বাবা—মায়েদের ভিড়। সবাই হাজিরা জানাবার জন্য ব্যস্ত।
”প্রতীক ঘোষ, ক্লাস ফোর, সেকশন ‘এ’।”
”বিশ্বনাথ জানা, ক্লাস ফোর, সেকশন ‘এ’।”
”কিংশুক চ্যাটার্জি…”
”সুভাষ দত্ত…”
মিনিটপাঁচেক পর তপতী সুযোগ পেলেন। নাম, ক্লাস, সেকশন শুনে মিস দাস খাতা দেখে বললেন, ”মৃন্ময় তো সাতটা ইভেন্টে নাম দিয়েছে আর চিন্ময় চারটেতে। সবক’টাতেই ওরা নামবে তো?”
”নিশ্চয়।”
”পঁচাত্তর মিটার এখনই শুরু হবে। মৃন্ময়কে রেডি রাখুন। নাম অ্যানাউন্স করলেই স্টার্টিং লাইনে পৌঁছে দেবেন। তারপরই আছে চিন্ময়ের পঞ্চাশ মিটার।”
তপতী ফিরে এসে দেখলেন চিনু একা দাঁড়িয়ে।
”বাবা, দাদা কোথায়?”
”ওইদিকে।” আঙুল দিয়ে চিনু দেখাল ভিড়ের শেষে মাঠের একটা ফাঁকা জায়গা। সেখানে তন্ময়ের নির্দেশে মৃন্ময় গা—ছাড়ানোর ব্যায়াম করছে।
”মা, আমিও কি এখন দাদার মতো করব?”
”না। অত করার তোর দরকার নেই।”
”মা, আমার কেমন ঘুমঘুম পাচ্ছে। আমার ইচ্ছে করছে না দৌড়তে।”
”ঘুম পাচ্ছে বললে কি এখন চলে? ওই শোন দাদার নাম অ্যানাউন্স হল। দৌড়ে গিয়ে ওদের ডেকে আন।”
ডাকতে আর হল না। তন্ময় আর মিনুকে এগিয়ে যেতে দেখা গেল স্টার্টিং লাইনে হাতে কাগজ—কলম আর মাথায় সাদা কাপড়ের ক্যাপ পরা ব্যস্তসমস্ত এক আন্টির দিকে।
মিনু পঁচাত্তর মিটার দৌড়ে শুধু প্রথমই হল না, দ্বিতীয় জনকে প্রায় পনেরো মিটার পেছনে রেখে দিল। দর্শকদের সবার চোখে তারিফ আর মুগ্ধতা। দৌড় শেষ করেই মিনু ছুটে এসে ফিনিশিং লাইনের ধারে দাঁড়ানো মাকে জড়িয়ে ধরল। ছেলের মুখ চুম্বনে ভরিয়ে তপতী তাকালেন স্বামীর দিকে। মিনু কোমর জড়িয়ে ধরেছে বাবার। ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে তন্ময়ের মুখে গভীর তৃপ্তির সঙ্গে ফুটে উঠল অহঙ্কার।
”যেভাবে স্টার্ট নেওয়াটা শিখিয়েছিলাম তাতে ফার্স্ট না হয়ে কোনও উপায় নেই। টেকনিক… ইটস টেকনিক, বুঝলে!”
”তার মানে, তোমার স্টার্টিং টেকনিকের জন্যই মিনু ফার্স্ট হল, ওর নিজের কোনও কৃতিত্ব এতে নেই?”
থতমত হয়ে তন্ময় বললেন, ”না, না, সে কী কথা! অবশ্যই মিনু নিজের ক্ষমতায় প্রথম হয়েছে।”
”তুমি শুধু মিনুকেই টেকনিক শিখিয়েছ, চিনুকে কিন্তু কিছুই শেখাওনি।”
”ওকে আর কী শেখাব, একদমই বাচ্চচা, তা ছাড়া খুবই দুবলা, ভেরি, ভেরি উইক।”
তপতী চুপ করে রইলেন। কথাটা খুবই সত্যি। তাঁর ছোট ছেলে খুবই দুবলা। ক্লাস ওয়ানের পঞ্চাশ মিটার দৌড়ের জন্য যখন নাম ডাকা হল, তপতী তখন চিনুকে স্টার্টিং লাইনে পৌঁছে দেওয়ার সময় বললেন, ”তুমি যেমন পারো তেমনই দৌড়িও, কেমন? এটা ওলিম্পিকস নয় যে, গোল্ড মেডেল পেতেই হবে। মজা মনে করো এই দৌড়টাকে। তোমাকে ফার্স্ট হতে হবে না।”
