এই বসুমল্লিক দম্পতি নিজেরা খেলার চর্চা এক সময় করেছেন, খেলা ভালবাসেন। এঁদের দুই ছেলে, মৃন্ময় আর চিন্ময়। দু’জনেই পড়ে মহাদেবপুরের এম ডি এম স্কুলে, মৃন্ময়ের ক্লাস থ্রি, চিন্ময়ের ক্লাস ওয়ান। আজ ওদের স্কুলের বাৎসরিক স্পোর্টস।
খাওয়ার টেবলে তন্ময় টোস্টে জেলি মাখাতে মাখাতে হাতঘড়িতে সময় দেখে নিয়ে হাঁক দিলেন, ”মিনু, চিনু, হারি আপ। ঠিক সাতটায় আমাদের পৌঁছতে হবে। কুইক ব্রেকফাস্ট শেষ করো, আর সময় নেই।”
”বাবা, আমি রেডি।” বলতে বলতে শোওয়ার ঘর থেকে বেরিয়ে এল মিনু। নয় বছর বয়স কিন্তু দেখতে দশ—এগারোর মতো। মায়ের মতো অতটা না হলেও, ফরসা, স্বাস্থ্যবান, চটপটে। সাদা হাফপ্যান্টের মধ্যে গোঁজা সাদা গেঞ্জি, সাদা মোজা, সাদা কেডস। চুল পরিপাটি করে আঁচড়ানো। তন্ময় স্নেহভরে বড় ছেলের দিকে তাকালেন, চোখে ফুটে উঠল তারিফ। এক্কেবারে স্পোর্টসম্যানের মতো দেখাচ্ছে!
”বোস।” তিনি তাঁর পাশের চেয়ারটা দেখালেন। টোস্ট প্লেটে রেখে সেটা মৃন্ময়ের সামনে এগিয়ে দিয়ে তন্ময় বললেন, ”আজ কিন্তু একটার বেশি নয়। এর সঙ্গে এক গ্লাস দুধ আর একটা কলা। পেট হালকা থাকলে জোরে দৌড়নো যায়… চিনু কী করছে? চিনু হারি আপ। … দ্যাখো তো দেরি করছে কেন!”
তন্ময় জিজ্ঞাসু চোখে তাকালেন টেবলের উলটো দিকে। তপতী মন দিয়ে সেদ্ধ ডিমের খোসা ছাড়াচ্ছেন। কথা না বলে তিনি উঠে গেলেন ছেলেদের ঘরে।
বিব্রত মুখে চিনু তাকাল মায়ের দিকে। বাঁ হাতের মুঠোয় পেটের কাছে প্যান্টটা ধরা।
”কী হল?” তপতী ভ্রূ কুঁচকে ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করলেন। ”প্যান্ট অমন করে ধরে আছিস কেন?”
”বোতাম।” ভয়ে সিঁটিয়ে যাওয়া স্বর চিনুর।
”বোতাম!”
তপতী প্যান্টধরা চিনুর হাতটা টানতেই সেটা হাঁটুর কাছে নেমে যাচ্ছিল। তাড়াতাড়ি সেটা ধরে চিনু টেনে তুলল। আধুলি মাপের একটা সাদা বোতামের ভাঙা অংশ প্যান্টে আটকে রয়েছে।
”হাতে আর সময় নেই, ব্রেকফাস্ট করেই বেরোতে হবে, আর এখন কিনা তোর প্যান্টের বোতাম ভাঙা… ইচ্ছে করছে তোকে একটা…।” ডান হাতটা তুলেও তপতী নামিয়ে নিলেন। অসহায় ফ্যালফ্যাল চোখে চিনু তাকিয়ে রয়েছে। উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ গায়ের রং, রুগণ, দুর্বল শরীর। গেঞ্জি পরা না থাকলে ওর কণ্ঠা আর পাঁজরের হাড় দেখা যেত। পা দুটো সরু, দুটো হাতও তাই। তপতীর চোখের রাগ ধীরে ধীরে মায়ায় ভরে এল। স্কুল থেকে বলে দিয়েছে স্পোর্টসে সাদা প্যান্ট গেঞ্জি পরে যেতে হবে। দ্বিতীয় আর সাদা প্যান্ট নেই। চট করে যে লাগিয়ে দেবেন, ওই মাপের তেমন বোতামও ঘরে নেই। কী করা যায় এখন?
”বউদি, বরং একটা সেফটিপিন লাগিয়ে দাও।” ঘরের দরজা থেকে রাতদিনের কাজের লোক বেলা পরামর্শ দিল। হাতের চুড়ি থেকে সেফটিপিন খুলে তপতীর হাতে দিতে দিতে বলল, ”দাদা তাড়া দিচ্ছে, চেঁচামেচি শুরু করবে।”
তপতী আর কথা না বলে হাঁটু গেড়ে বসে কোমরের কাছে প্যান্টটা টেনে ধরে সেফটিপিন লাগিয়ে দিলেন। চিনুর হাত ধরে যখন তিনি খাবার ঘরে এলেন, তন্ময় তখন উৎসাহভরে মিনুকে স্টার্ট নেওয়ার কৌশল দেখানোয় ব্যস্ত। ছোট ছেলের দিকে তাকাবার ফুরসত নেই।
”যখন বলবে অন ইওর মার্ক… গেট… সেট…” তন্ময় ঘরের মেঝেয় হামা দেওয়ার ভঙ্গিতে, একটা পা সামনে, অন্যটা পিছিয়ে। সামনের পায়ের সঙ্গে সমান্তরাল ভাবে দু’হাতের আঙুলে ভর রেখে সামনে ঝুঁকে। ”কান খাড়া করে রাখবি, এটা খুব দরকারি ব্যাপার,… এই কানটা, বুঝলি? পিস্তল ফায়ারের আওয়াজ শোনামাত্রই…।”
”বাবা, আমাদের আন্টি বলেছেন হুইসল বাজানো হবে।”
”অ। একই ব্যাপার, মোটকথা ওই আওয়াজটা শোনার জন্য তুমি কান খাড়া করে রাখবে। যেই হুইসল বাজল অমনই তুমি…”, তন্ময় মোজাইক করা মেঝেয় পায়ে চাপ দিয়ে স্টার্ট নিতে গিয়ে প্রথম পদক্ষেপটিতেই পিছলে হুমড়ি খেয়ে পড়লেন।
তাড়াতাড়ি দাঁড়িয়ে উঠে প্রথমেই তিনি সবার মুখ দেখে নিলেন। কোনও মুখেই হাসির টান পড়েনি। দেখে স্বস্তি বোধ করে বললেন, ”তা হলে মিনু স্টার্টিং ব্যাপারটা বুঝে গেলে, কেমন। এবার ঝালিয়ে নাও একবার।”
মিনু বাবার দেখানো মতোই মেঝেয় হামা দেওয়ার ভঙ্গিতে শরীরটাকে রেখে কানখাড়া করে রইল।
”কারেক্ট, নাউ… অন ইওর মার্ক… গেট… সেট… ফরররর।” তন্ময় মুখেই হুইসল বাজালেন। মিনু স্টার্ট নিয়েই হুমড়ি খেয়ে পড়ল।
”এ কী, পড়ে গেলি কেন?” তন্ময় বিস্মিত এবং ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বললেন। ”বারে! তুমি তো এইভাবেই স্টার্ট নিলে।” মিনুর ভ্যাবাচাকা মুখ। গলদটা কোথায় হল বুঝতে পারছে না।
খুকখুক হাসির শব্দে তন্ময় মুখ ফেরালেন স্ত্রীর দিকে। জ্বলন্ত দৃষ্টি হেনে বললেন, ”এতে হাসির কী আছে?”
”তোমার বলে দেওয়া উচিত ছিল পিছলে পড়াটা স্টার্টিং টেকনিকের মধ্যে পড়ে না।” গম্ভীর মুখে কথাটা বলে তিনি ছোট ছেলের চেয়ারটা টেবলের নীচে আর একটু ঠেলে দিলেন। প্যান্টে আঁটা সেফটিপিনটা এখনকার মতো স্বামীর নজরে না পড়াই ভাল।
”গাড়ি বার করছি। তাড়াতাড়ি এসো।” তন্ময় দুটো ওয়াটারবটল টেবল থেকে তুলে বেরিয়ে গেলেন মিনুকে সঙ্গে নিয়ে।
”মা, আমি খাব না, খিদে নেই।” চিনু করুণ স্বরে বলল।
”ওসব বললে হবে না, খেয়ে নাও। বাবা মাখন মাখিয়ে দিয়েছে, একটা অন্তত খাও। কখন ফিরব তার ঠিক নেই, খালি পেটে থাকলে… আচ্ছা দুধটুকু খাও।” দুধের গ্লাস ছেলের মুখে তুলে ধরলেন তপতী। পাঁচন গেলার মতো মুখ করে চিনু গ্লাস শেষ করল।
