চিনু কথাগুলোর কী অর্থ করল কে জানে, তবে ঘাড় নাড়ল। স্টার্টিং লাইনে সব প্রতিযোগীই বাচ্চচা ছেলে, তার মধ্যে চিনুকে তার রুগণতার জন্য আরও বাচ্চচা দেখাচ্ছে। লাইনে দাঁড়িয়ে সে অসহায়ের মতো বারবার তাকাল মার দিকে। তপতী হাত নাড়লেন।
শুরুর হুইসল বেজে উঠতেই হইহই করে উঠল দর্শকরা, যার অধিকাংশই বাবা—মা। উৎসাহভরে অনেকেই প্রতিযোগীদের সঙ্গে সঙ্গে ছুটতে লাগলেন দূরত্ব রেখে। দৌড় শুরু হতেই চিনু দশ মিটার মতো গিয়েই পেটের কাছে প্যান্টটা ধরে দাঁড়িয়ে মার দিকে তাকাল। তপতী হাত নেড়ে ওকে ছুটতে ইশারা করলেন।
”চিনু, দাঁড়িয়ে থেকো না, দৌড়ও।”
প্যান্ট মুঠোয় ধরে চিনু দৌড় শুরু করল আবার এবং সমাপ্ত করল হাঁসফাঁস করতে করতে সবার শেষে পৌঁছে। সফল প্রতিযোগীদের মায়েরা ছুটে গেল ছেলেদের কাছে, তাদের জড়িয়ে ধরে আদর করতে লাগল। চিনু দৌড় শেষ করে মুখ নামিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল, তপতী পেছন থেকে ওকে জড়িয়ে ধরে ঝুঁকে কপালে চুমু দিয়ে বললেন, ”তুমি ফিনিশ করেছ, এতে আমি খুব খুশি হয়েছি।”
কাঁধের কাছে জামায় চোখ মুছে চিনু হাসল। ”সেফটিপিনটা খুলে গেল।”
তন্ময় এগিয়ে এসে বললেন, ”তুই ওভাবে দাঁড়িয়ে পড়লি কেন?” তারপরই প্যান্টে আঁটা সেফটিপিনটার দিকে তাঁর নজর পড়ল। ”এ কী, প্যান্টে ওটা কী?”
”দোষটা আমারই। লন্ড্রি থেকে কেচে আসার পর লক্ষ করিনি বোতামটা ভেঙে গেছে। বেরোবার তাড়ায় আর সময় পাইনি নতুন বোতাম লাগাবার, তাই—।” তপতী অপরাধীর মতো মুখ করে বললেন। তারপরই গলায় উচ্ছ্বাস এল, ”কিন্তু চিনু রেসটা কেমন শেষ করল বলো।”
”ইয়েস, ইয়েস,” চিনুর পিঠে হালকা চাপড় দিলেন তন্ময়। ”শেষ পর্যন্ত দৌড়েছে, রণে ভঙ্গ দেয়নি। এটাই তো চাই। মিনু তোর নেক্সট ইভেন্টের কল দিচ্ছে। এর পর চিনুর কী আছে?”
”বোধ হয় জিলিপি রেস।”
”মিনু চল, এটাতেও কিন্তু ফার্স্ট হতে হবে।”
ওরা দু’জন চলে যেতেই চিনু মায়ের কোমর জড়িয়ে ফিসফিস করে বলল, ”আমি আর নামব না… আমার ভাল লাগছে না।”
”সে কী! জিলিপি রেস কী মজার, তা জানিস? দড়িতে জিলিপি ঝুলিয়ে দেবে, দৌড়ে গিয়ে লাফ দিয়ে দিয়ে কামড়ে ছিঁড়ে নিয়ে আবার ফিরে আসতে হবে।”
”না মা, আমার ভাল লাগছে না। শুয়ে থাকতে ইচ্ছে করছে।” চিনু অনুনয় করল। তপতী ছেলের কপালে হাত রেখে ভ্রূ কোঁচকালেন।
”তোর গা তো বেশ গরম। জ্বর হয়েছে বোধ হয়। থাক তা হলে, আর দৌড়োদৌড়ি করতে হবে না। আয় বসি।”
চিনুকে কোলে নিয়ে তপতী বসলেন একটা চেয়ারে। পেছন থেকে ঝুঁকে মিসেস সেন বললেন, ”আপনার বড় ছেলেটি খুব ভাল দৌড়েছে।”
মুখ ফিরিয়ে তপতী হাসলেন শুধু।
”মনে হয় সব ক’টাতেই ও ফার্স্ট হবে।”
তপতী আবার হাসলেন।
”আপনার ছোট ছেলের তখন হল কী, দাঁড়িয়ে পড়ল কেন?”
”প্যান্ট খুলে পড়ছিল। বোতামটা ভেঙে গেছে।”
”অ অ। আমি ভাবলুম ঘাবড়ে গিয়ে… ওর সঙ্গে যারা দৌড়চ্ছিল তাদের স্বাস্থ্য তো খুবই ভাল।”
তপতীর মাথা গরম হয়ে উঠল কথাটা শুনে। ভাল স্বাস্থ্য দেখে চিনু ভয় পেয়ে গেছল, এমন একটা ধারণা হল কী করে এই মহিলার! চিনু মায়ের বুকে মাথা রেখে চোখ বুজে জড়িয়ে ধরে রয়েছে। তপতী ওর মাথায় গালে পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললেন,”বাড়ি যাবি?” চিনু মাথা নাড়ল।
ছেলেকে নিয়ে তপতী উঠলেন। তন্ময়কে খুঁজে বার করে বললেন, ”চিনুকে বাড়ি নিয়ে যাব, পৌঁছে দাও। জ্বর জ্বর লাগছে। আমার মনে হয় এখন ওর শুয়ে থাকা দরকার।”
”আমি এখন যাব কী করে, এই শুরু হতে যাচ্ছে মিনুর ফিফটি মিটারটা। বরং তুমিই গাড়ি নিয়ে চলে যাও, আমরা রায়চৌধুরীর গাড়িতে চলে যাব।” তন্ময় গাড়ির চাবি তপতীর হাতে দিয়ে ব্যস্ত হয়ে চলে গেলেন।
তপতী গাড়ি চালান, তবে মহাদেবপুরের মধ্যেই। কলকাতা বা অন্য কোথাও যেতে হলে তিনি স্টিয়ারিং ধরেন না। জি টি রোডের ট্রাফিককে তিনি ভয় পান। বাড়ি যাওয়ার পথেই ডাক্তার সিনহার কোয়ার্টার। তপতীর মনে হল চিনুকে একবার ওঁকে দিয়ে দেখিয়ে নেওয়া ভাল।
ডাক্তার কোয়ার্টারে নেই, কলকাতায় গেছেন সপরিবারে। তপতী ফিরে এসে চিনুকে শুইয়ে দিলেন। থার্মোমিটারে তাপ মাপলেন, প্রায় একশো ডিগ্রি। ছেলেকে জড়িয়ে তিনিও শুয়ে পড়লেন।
রীতিমতো হইহই করে তন্ময় ও মৃন্ময় বাড়িতে ঢুকল।
”হিপ হিপ হুররে…থ্রি চিয়ার্স ফর মৃন্ময় বসুমল্লিক… হিপ হিপ… হুররে।” তন্ময় বাড়ি কাঁপিয়ে তাঁর উচ্ছ্বাস প্রকাশ করলেন। তপতী প্রায় ছুটেই বসবার ঘরে এলেন। বাবা আর ছেলের হাত ভর্তি কাপ, মোট সাতটা। তার সঙ্গে একটা বাক্সে রুপোর মেডেল, চ্যাম্পিয়ানের পুরস্কার। এ ছাড়াও একটা তোয়ালে, একটা কিট ব্যাগ, একটা ওয়াটার বটল আর সার্টিফিকেটগুলো।
”ওমমা, মিনু তো বিপদে ফেলে দিল! এত কাপ এখন আমি রাখি কোথায়?”
তপতী ছেলেকে কাছে টেনে নিলেন। মিনুর মুখ লাজুক হয়ে উঠল।
”এই তো সবে শুরু।” কাপগুলো টেবলে সাজিয়ে রাখতে রাখতে তন্ময় বললেন। ”এবার থেকে বছর বছর গণ্ডায় গণ্ডায় কাপ—মেডেল আসবে। এগুলো এখন এখানেই থাক, লোকে দেখুক।”
দাদা, একটা কাচের আলমারি তৈরি করিয়ে তাতে সাজিয়ে রাখুন।” পরামর্শটা দিল বেলা।
”সেটা আমিও ভেবেছি। আসার সময় রায়চৌধুরীর বউ তো আজ রাতে মিনুকে নেমন্তন্ন করেছে। পায়েস খাওয়াবে। চিনুকেও পাঠিয়ে দিতে বলেছে।”
