শতরানে দিলুর পৌঁছতে যখন পনেরো রান বাকি, জয়ের জন্য রেডের তখন দরকার ষোলো রান। আগ্নেয়গিরির মতো মাঠ তখন ফুটছে। হবে কি হবে না। বাজি ধরা শুরু হয়ে গেছে।
”বলছি হবে। সেঞ্চুরি হবেই। বাজি?” এক যুবক বলল, পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করে। ”যশোহরের ছানার জিলিপি যত প্যারিস।”
”গেল গেল গেল।” আঁতকে উঠল আর এক যুবক। দিলু ওভারের শেষ বলে এক রান নিচ্ছিল, শর্ট লেগে বল ঠেলে দিয়ে। অংশু দৌড় শুরু করে দেখল, এক ফিল্ডার বল কুড়িয়েছে। অংশু থমকে দাঁড়িয়ে চে�চিয়ে বারণ করল রান না নেওয়ার জন্য। কিন্তু দিলু তখন পিচের মাঝামাঝি এসে গেছে। ফিল্ডার বল ছুড়ল উইকেটকিপারকে আর অংশু অতিক্রম করল দিলুকে। তখনই উইকেটকিপার তিনটি স্টাম্প হাতের ধাক্কায় ফেলে দিল। দিলুর দিকে তাকিয়ে অংশু হাসল মাত্র, তারপর হাঁটা শুরু করল। সারা মাঠ হাততালি দিয়ে তার স্বেচ্ছায় এই রান আউট হওয়াকে তারিফ জানাল।
একটা কিছু ঘটে গেল দিলুর মধ্যে। পরের ওভারে সে পেল এক বাঁ হাতি স্পিনারকে। প্রথম চারটে বলে সে অন আর অফে ড্রাইভ করে তিনটি চার এবং সোজা একটা ছয় মেরে রেড—এর ইনিংস একশো পনেরো রানে পৌঁছে দিল। তার শতরান হল চল্লিশ বলে।
এরপর আবার দেখা গেল সেই দৃশ্য। দিলুকে ঘাড়ে শুইয়ে মাঠ থেকে ড্রেসিংরুমে নিয়ে যাওয়া। তবে এবার তাকে বহন করল অংশুর ক্যাপ্টেন্সিতে রেড দলের ছেলেরা।
পাঁচ মিনিট পর ড্রেসিংরুমের বাইরে মলু, পঞ্চানন আর প্রতাপ। ব্যাটটা হাতে নিয়ে দিলু বেরিয়ে এল। মুখে একগাল হাসি, কপালে ঘাম, এলোমেলো চুল আরও এলোমেলো।
মলু হাতব্যাগ খুলে চিরুনি বের করল।
”কাছে আয়।”
দিলু এগিয়ে এসে মাথা নিচু করল। আঁচড়ে দিতে দিতে মলু বলল, ”চুল তো নয় কাকের বাসা, এবার ন্যাড়া করে দোব।” আঁচল দিয়ে দিলুর মুখের ঘাম মুছে দিল। ব্যাটটা দেখে বলল, ”কার ব্যাট?”
”অংশুর। জানো মা, এটার দাম সাড়ে পাঁচ হাজার টাকা!”
”অ। তরুণ করের ছেলে আর কখনও যেন পরের ব্যাট নিয়ে না খেলে।” মলু গম্ভীর কঠিন গলায় কথাটা বলে প্রতাপের দিকে তাকাল। ”ব্যাটম্যাট কোনটে ভাল কোনটে মন্দ, আমি বুঝি না। আপনি কাল আমাদের বাড়িতে এসে আমাকে দোকানে নিয়ে যাবেন। ব্যাটের সঙ্গে আর কী কী লাগবে তারও একটা লিস্টি করে আনবেন। ব্যাট লিখবেন দুটো। একটা ভেঙে গেলে অন্যটায় খেলবে। পরের ব্যাট নিয়ে খেলা উচিত নয়।”
প্রতাপ ঘাড় নাড়ল। মলু এবার পঞ্চাননের দিকে তাকাল। ”জেঠু, তুমিই হচ্ছ পালের গোদা। লেখাপড়া করতে তোমার কাছে রাখলুম, আর তুমি—!”
মলু আঁচলে চোখ মুছল।
মিনু চিনুর ট্রফি
কলকাতা থেকে আটাশ মাইল উত্তরে গঙ্গার পশ্চিম তীরে, লঞ্চঘাট থেকে আধমাইল, জি টি রোড থেকে সিকি মাইল আর রেল স্টেশন থেকে এক মাইল দূরের মহাদেবপুর উপনগরীতে প্রায় চার হাজার লোকের বাস। মহাদেবপুর গড়েছে মহাদেব জুট অ্যান্ড টেক্সটাইল মিলস, সংক্ষেপে যাকে বলা হয় এম জে টি এম, তারই প্রতিষ্ঠাতা—মালিক মহাদেবদাস মাধোকিয়া। এই উপনগরীতে আছে দুটো বাজার, ছোট একটা হাসপাতাল, স্কুল, মন্দির, অডিটোরিয়াম, লাইব্রেরি, পাওয়ার হাউস, খেলার মাঠ, ছোটদের পার্ক, অফিসারদের ক্লাব—যেখানে আছে এক বিঘৎ ঘাস গজিয়ে যাওয়া একটা টেনিস কোর্ট, আর দুটি ক্যারম খেলার বোর্ড। মহাদেবপুর মোটামুটি স্বয়ংসম্পূর্ণ। এখানকার অনেক লোকেরই মোটরগাড়ি আছে, দরকার হলে চট করে কলকাতা ঘুরে আসতে পারে।
মহাদেবপুরের পৌরব্যবস্থা এম জে টি এম—এর নিজস্ব। তাদেরই খরচে এবং তদারকিতে এর দেখভাল করা হয়। এজন্য আলাদা একটা বিভাগ আছে এবং তার সর্বোচ্চচ কর্তা হলেন তন্ময় বসুমল্লিক। ইনি ঘোর কৃষ্ণবর্ণ, বলিষ্ঠ, দীর্ঘদেহী, চোখা নাক মুখ। দূরপাল্লার সাঁতারে নাম ছিল এবং অর্থনীতির এম এ। কলকাতা পৌরসভায় বছর চারেক চাকরি করে ভারত স্বাধীন হওয়ার দু’বছর পরই মহাদেবপুরে আসেন।
তন্ময় যেমন হাসিখুশি, সরল, তেমনই গোঁয়ার প্রকৃতিরও। সাবেকি রীতিনীতি মেনে চলতে অভ্যস্ত এমন পরিবারে তাঁর জন্ম ও বেড়ে ওঠা; তিনি উদার মনের মানুষ, বড় চাকরি করলেও মেলামেশায় কোনও বাছবিচার করেন না। তাঁর স্ত্রী তপতী ইলাহাবাদের মেয়ে। বাবা সেখানকার নামী উকিল ছিলেন। বাড়িতে টেনিস কোর্ট ছিল। ভাইদের সঙ্গে বাড়িতে, পরে কলেজে ও বিশ্ববিদ্যালয়ে টেনিস খেলেছেন। চ্যাম্পিয়ানের তিন—চারটে ট্রফিও পেয়েছিলেন। সাইকেল চালিয়ে বন্ধুর বাড়ি যাওয়ার সময় একটা খ্যাপা ষাঁড়ের শিং থেকে বাঁচার জন্য তপতী রাস্তার পাশের নালায় সবেগে নেমে যাওয়ায় তাঁর ডান পায়ের গোড়ালির হাড় কয়েক টুকরোয় পরিণত হয়। দু’বার অপারেশনের পর পা যৎসামান্য ছোট হয়ে যায় বলে একটু জোরে হাঁটলেই ধরা পড়ে তিনি খোঁড়া।
স্বামী যতটা কালো, তপতী ততটাই ফরসা। ক্লাবে অনেকেই রসিকতা করে ওঁদের ‘পূর্ণিমা—অমাবস্যা’ বলে ডাকে। শুনে ওঁরা দু’জন হাসেন। স্বামীর মতো তপতীও জেদি কিন্তু গোঁয়ার নন। কোনও লক্ষ্য একবার স্থির করে ফেললে যতক্ষণ না তা পূরণ হচ্ছে, হাল ছাড়েন না। গোড়ালি ভাঙার পর বগলে ক্রাচ দিয়ে তাঁকে চলাফেরা করতে হত। বাড়ির সবাই ধরে নেয় আজীবন এইভাবেই তাঁকে চলতে হবে। কিন্তু মনের জোর আর স্বাভাবিকভাবে হাঁটার জন্য তীব্র আকাঙ্ক্ষা, এই দুইয়ে মিলে তাঁকে এমনই জেদি করে তোলে যে, দিনের পর দিন ব্যায়াম ও মালিশ করে এক বছরের মধ্যেই ক্রাচের ওপর নির্ভরতা থেকে তপতী নিজেকে মুক্ত করে নেন।
