কত সহজে বলে দিল ‘কিনে নাও।’ নিশ্চয় পয়সাওলা ঘরের ছেলে। দিলুর বলতে ইচ্ছে করল, দামি ব্যাট দিয়ে খেললেই কি দামি ইনিংস খেলা যাবে?
রাজর্ষি মাঠের দিকে তাকিয়ে। ভরত গার্ড নিল প্রতাপ লাহিড়ির কাছ থেকে। বোলিং শুরু করবে আরিফ। প্রথম বল ভরত ব্যাট তুলে ছেড়ে দিল, দ্বিতীয় বলটায় আধা ফরওয়ার্ড খেলল, ব্যাট—প্যাডের মধ্য দিয়ে বলটা গলে এসে অফ স্টাম্প ফেলে দিল।
দিলুর দিকে তাকিয়ে হেসে রাজর্ষি এগোল মাঠে নামার জন্য। ব্ল্যাকবোর্ডে লেখা হল ০—১। দিলুর পাশ দিয়ে ভরত ড্রেসিংরুমে ফিরে এল। রাজর্ষি প্রথম বলেই পিছিয়ে খেলে বলটা ফস্কে এল বি ডবলু হল। রেড দল ০—২। দিলু ঘরে এসে প্যাড পরা শুরু করল। দেবাংশু নামল ব্যাট করতে। মাঠ ঘিরে সাড়াশব্দ নেই। প্রথম ওভারেই পড়েছে দুটো উইকেট দু’বলে। দর্শকদের মধ্যে কে একজন বাঁজখাই গলায় চিৎকার করল, ”হ্যাটট্রিক চাই।”
লোকটির দাবি পূরণ করতেই যেন আরিফ কপিলদেবের মতো অসাধারণ আউটসুইং করিয়ে বলটা ফেলল অফ স্টাম্পে। দ্বিতীয় স্লিপ গোড়ালির কাছে ক্যাচটা ধরেই গড়িয়ে পড়ল।
হ্যাটট্রিক প্রথম ওভারেই। রেড ০—৩। দুধঘাটে হ্যাটট্রিক একটা বিরাট ঘটনা। দিলুকে ব্যাট হাতে নামতে দেখে বিশাল অভ্যর্থনা গাছের কাকগুলোকে ভয় পাইয়ে উড়িয়ে দিল।
ওভারের দুটো বল বাকি। দিলু আউট সুইঙ্গারগুলো দেখে নিয়ে ছেড়ে দিল। কানা ভাঙা ব্যাট দিয়ে সুইং করা বল খেলতে যাওয়া মানেই বিপদ ডেকে আনা, এটা সে বুঝে গেছে। দ্বিতীয় ওভার, কমলেশ খেলবে অরুণ মেহটার বলে। পাঁচটা বল খেলল একটা বাই বাউন্ডারি, মিড উইকেট থেকে দুই নিয়ে কমলেশ মিড অফে ক্যাচ তুলে ফিরে গেল। রেড ৬—৪। ছয় রানে চার উইকেট পড়ে গেছে। ক্রিজে এল অংশু।
”দুলাল ডাউন দ্য শাটার, ঝাঁপ ফেলে দাও।” অংশুকে নড়বড়ে দেখাল। প্রথম ওভারেই এতবড় ধাক্কা পেলে কোন অধিনায়ক না নার্ভাস হয়ে পড়বে।
পরের ওভারে বল করতে এল আদিত্য মজুমদার। ইনসুইং করায়, মাঝে মাঝে দেয় লেগকাটার। অংশু মারার বল মারল না, সিঙ্গল রান নিতেও রাজি নয়। মেডেন ওভার।
হ্যাটট্রিক করে আরিফ উৎসাহে ফুটছে। তার দ্বিতীয় ওভারের প্রথম বলটা ওভার পিচ। দিলু স্ট্রেট ড্রাইভ করল। ফলো থ্রুতে আরিফ বলটা থামাতে পারল না। চার হল। অংশু কপাল কুঁচকে শুধু তাকাল। পরের বলে দিলু আবার স্ট্রেট ড্রাইভে বাউন্ডারিতে বল পাঠাল। তৃতীয় বলটা আরিফ বাম্প করাতে চেষ্টা করল, দিলুর কাঁধের কাছে বল উঠতেই সে পুল করল। মিড উইকেটের ওপর দিয়ে ছয় হল। আরিফকে প্রথমে অবাক, তারপর নিজের ওপর বিরক্ত; এখন উদ্বিগ্ন দেখাচ্ছে। চতুর্থ বল গুড লেংথে, কিন্তু সুইংটা বড় হয়ে গেল। দিলু স্কোয়ার ড্রাইভ করল। পয়েন্ট ও কভারের মাঝ দিয়ে বাউন্ডারিতে যাওয়া বলের দিকে সবাই তাকিয়ে, দিলু তাকিয়ে তার ব্যাটের দিকে। ভাঙা জায়গাটা থেকে ছোট্ট একটা কুচি খসে গেছে।
মাঠ ঘিরে পাগলামির স্রোত বইছে। বল বাউন্ডারিতে পৌঁছলেই বাচ্চচা ছাত্ররা মাঠে ঢুকে নাচানাচি করছে। লাইফ সায়ান্স মাস্টারমশাই হাল ছেড়ে দিলেন। হরিসাধন অতিকষ্টে নিজেকে সংযত রেখেছেন। সবাই জানে দিলু তাঁর ভাগ্নে, চিৎকার করা বা দু’হাত তুলে অঙ্কের বরদাবাবুর মতো লাফালে পক্ষপাতিত্ব দেখানো হয়ে যাবে। তবে আরিফের হ্যাটট্রিক হতেই তিনি দাঁড়িয়ে উঠে হাততালি দিয়েছেন। মলু, যে ক্রিকেটের কিছুই বোঝে না, সেও চারপাশের গনগনে উত্তেজনার আঁচে ঝলসে মুখ লাল করে ফেলেছে। ফিসফিস করে সে পাশে বসা জেঠুকে বলল, ”দিলুটা করছে কী?”
পঞ্চাননও চাপা স্বরে বললেন, ”মাকে বলছে তুমি আমাকে চেনোনি, বোঝোনি। আমি তোমার সেরা ছেলে।”
আরিফের পঞ্চম বলটা সোজা নারকেল গাছের পাতায় গিয়ে লাগল। দিলু চোখের সামনে ব্যাট তুলে দেখল, ভাঙা জায়গাটায় চিড় ধরেছে, আবার একটু কুচি খসে পড়বে। অংশু এগিয়ে এল। দিলুর হাত থেকে ব্যাটটা নিয়ে নিজের ব্যাট তার হাতে দিয়ে হাসল। দিলু ইতস্তত করে বলল, ”দামি ব্যাট। যদি ভেঙে যায়?”
”ভাঙুক। এর চেয়েও দামি টিমের উইন।”
কথাটা শুনেই ঝিনঝিন করে উঠল দিলুর সারা শরীর। দু’বার ব্যাটটা হাতে নাচিয়ে সে স্টান্স নিল। আরিফ এবার জোরে ফুল পিচে বল করল সোজা কাঁধের সমান উচ্চচতায়। আশিস ঘোষ নো বল ডাকল কিন্তু দিলু বলটাকে পুল করে ছয় মেরে দিল লং লেগ বাউন্ডারিতে। এক এবং ছয় রান হল। এক ওভারে একত্রিশ রান নিল দিলু।
অংশু এগিয়ে এল কথা বলতে। দিলু বলল, ”শাটারটা আটকে গেছে, ডাউন করতে পারছি না।”
”আরিফ শ্যাটারড। আর ও বল করবে না মনে হচ্ছে। শাটারটা তুমি আর একটু ওপরে তোলো।”
হাতে দুটো ব্যাট নিয়ে কমলেশ মাঠে ছুটে এল। অংশু একটা বেছে নিয়ে দিলুর ভাঙা ব্যাটটা তার হাতে দিল। আদিত্যর প্রথম বলে পয়েন্ট থেকে অংশু একটা রান নিল। তার রান এবং এই রানটাতেই সে রইল যখন রেড টিমের টোটাল চার উইকেটে সাতান্নয় পৌঁছল। দিলুর পঞ্চাশ, একুশ বল খেলে। একস্ট্রা হয়েছে ছয় রান।
দিলু ব্যাটটা চাঁদোয়ার দিকে লম্বা করে দেখিয়ে দু’বার ঝাঁকাল। পঞ্চানন মলুকে বললেন, ”তোকে দেখাচ্ছে। ওঠ, উঠে হাত নাড়।” মলু সদ্য ঘুমভাঙার মতো ধড়মড়িয়ে উঠে দু’হাত নাড়তে লাগল। পেছন থেকে কে বলে উঠল, ”দিলুর মা।” লোকে তাকে দিলুর পরিচয়ে চিনেছে। মলুর কান গরম হয়ে উঠল।
