.
ডেসিংরুমে সুনন্দ বলল, ”ভাগ্যিস এখানে খেলতে এসেছি তাই এমন একটা দৃশ্য দেখার সুযোগ হল।”
দেবাংশু ফিসফিস করে তার কানে বলল, ”আর এমন ফিল্ডিং দেখার কথাটাও বল।”
”নিশ্চয় বলব। তবে এখানে নয়, কলকাতায় ফিরে।”
অংশু বলল দিলুকে, ”বাকি তিনটে আর হল না। বিজয় মার্চেন্টে আমাদের প্রথম খেলা কটকে ওড়িশার সঙ্গে, সেখানে আশা করব এক ইনিংসে দশটাই।”
দিলু বিভ্রান্ত স্বরে বলল, ”বেঙ্গল টিমে আমি। কী এমন করলুম?”
অংশু বলল, ”দুশো তেরোটাকে একশো তেরো করে দিয়েছ। ব্লু টিমে যেসব ব্যাটসম্যান রয়েছে তাদের চারজন লাস্ট উইকে ফিফটি করেছে, আজ দশের বেশি করেনি। তুমি টিমে আসছই। কত নম্বরে ব্যাট করবে?”
”যতয় পাঠাবে।”
”দেবুদার সঙ্গে কথা বলে দেখি।”
হরিসাধন এসে তাড়া দিলেন লাঞ্চ খাওয়ার জন্য। দুটো টিম দোতলায় টিচার্স রুমে গেল। চারটে টেবল জোড়া দিয়ে তাতে রাখা হয়েছে চিকেন স্টু, কলা, স্লাইসড পাউরুটি, স্যালাড আর ছানার জিলিপি। প্রত্যেকে প্লেট হাতে ইচ্ছেমতো স্যালাড, পাউরুটি ও চিকেন তুলে নিয়ে দেওয়ালের ধারে রাখা চেয়ারে বসে খেতে শুরু করল।
হরিসাধন বললেন, ”আয়োজন খুবই সামান্য, যতটুকু আমাদের সাধ্য—”
তাকে হাত তুলে থামিয়ে আরিফ বলল, ”ক্লাব ম্যাচে আমাদের এমন খাওয়া জোটে না, চিকেন তো ভাবাই যায় না!”
অংশু বলল, ”এখুনি তো মাঠে নামতে হবে, বেশি খেলে নড়াচড়া করতে পারব না। এইরকম হালকা খাবারই ভাল।”
ছেলেদের খাওয়া দেখে হরিসাধন বিষণ্ণ হলেন। প্রচুর পাউরুটি আর স্টু পড়ে রইল। ওরা শুধু স্যালাড খেল, বেরিয়ে যাওয়ার সময় প্রত্যেকে হাতে নিল একটা করে কলা। তিনি এবং গণেশ নাগ সবচেয়ে দুঃখ পেলেন ছানার জিলিপির দুটো প্লেট দেখে। দেওয়া হয়েছিল পঞ্চাশটা, নিঃশেষ হলে আরও পঞ্চাশটা স্টিলের ট্রে—তে চটপট টেবলে আনার জন্য রেডি করে রাখা আছে, তাও ফুরিয়ে গেলে আরও পঞ্চাশটা আসবে। কিন্তু প্রথম পঞ্চাশটাই ফুরোল না। দেখা গেল গোটা বারো প্লেটে পড়ে রয়েছে।
”সার আপনি বলেছিলেন ছোটরা মিষ্টি খেতে ভালবাসে।” গণেশ নাগ মাথা চুলকোলেন।
”শ্রাদ্ধ আর বিয়েবাড়িতে সাপ্লাই দিয়ে দিয়ে খাওয়ার একটা হিসেব আপনার মাথায় বদ্ধমূল হয়ে গেছে—মাথাপিছু পাঁচটা। আপনাকে বলেছিলুম ওরা খেতে নয়, খেলতে আসছে। এখনকার ছেলেরা ভীষণ হেলথ কনশাস মনে রাখবেন।”
”সার, মিষ্টি খাওয়ানোর প্রস্তাবটা তো আপনারই ছিল।” ভয়ে ভয়ে বললেন গণেশ নাগ।
”বলেছি তো কী হয়েছে। যত জিলিপি রয়ে গেছে স্কুলের যে সব ছেলে কাজ করছে তাদের একটা করে দিয়ে দিন।”
ব্যাটিং অর্ডার তৈরি করেছে দেবু ঘোষাল। দিলুকে রেখেছে পাঁচ নম্বরে, তিনজন আউট হলে নামবে। অংশুকে ঘরের বাইরে ডেকে নিয়ে সে বলল, ”তখন স্পিনার এসে যাবে, খেলাও তখন কুড়ি ওভারে পৌঁছবে। মনে রাখিস চল্লিশ ওভারের খেলা, কুড়ি থেকে তিরিশ ওভার—ওই সময়টায় এক—দুই করে রান নিয়ে ওভারে ছ’টা করে রান, দেখি ছেলেটা ওইসময় কেমন ব্যাট করে।”
ঘরে ফিরে এসে অংশু ব্যাটিং অর্ডার পড়ে শোনাল। প্রথম চারজন প্যাড পরতে শুরু করল। দিলু তাকিয়ে রইল ওদের ব্যাট প্যাড গ্লাভসের দিকে। সবই নিজেদের, দেখেই বোঝা যায় বেশ দামি। নিজস্ব সরঞ্জাম বলতে জুতো জোড়া ছাড়া তার কিছুই নেই। সবই স্কুলের। কমদামি প্যাডজোড়া ময়লা, বাঁশের কঞ্চি আর তুলো দিয়ে তৈরি, ওজনে ভারী। প্যাডের একটায় ওপরের বাকল নেই, দুটো বাকলে টাইট করে পায়ে ধরে রাখা যায় না, একটু ছুটলেই প্যাড নেমে আসে। অথচ এদেরগুলো কী হালকা, বাকল দেওয়া নয়। তিনটে পট্টি চেপে লাগিয়ে দিলে আঠার মতো এঁটে থাকে। গ্লাভসেও কবজির কাছে জড়ানো ওই আঠার মতো পট্টি। আর ব্যাট।
দিলু অংশুর ব্যাটটা তুলে ওজনটা অনুভব করতে করতে পাশে বসা সুনন্দকে হালকা চালে জিজ্ঞেস করল, ”ব্যাটটার দাম কত?”
সুনন্দ দশ নম্বরে ব্যাট করবে। দেরি আছে মাঠে নামতে, হয়তো নামতেও হবে না। তার আগেই একশো চোদ্দো রান উঠে যাবে। জুতোর ফিতে খুলছে মুখ নিচু করে। দামটা বলল, কিন্তু দিলু স্পষ্টভাবে শুনতে পেল না।
”কত বললে?”
”সাড়ে পাঁচ হাজার টাকা।” সুনন্দ মুখ তুলে একটু চড়িয়ে বলল।
দিলু বলল, ”দিশি ব্যাটের দামও কি এইরকম?”
সন্দীপ একটু অবাক হয়ে বলল, ” এটা তো দিশি ব্যাটই। আমাদের কাশ্মীরি উইলোয় তৈরি পি ডি এম বা লারসন তো সাহেবরাও কিনছে।”
দিলু ব্যাটটা সযত্নে বেঞ্চের ওপর রেখে দিয়ে স্কুলের কানা ভাঙা ব্যাটটা দুই হাঁটুর মধ্যে চেপে ধরল। দাম জিজ্ঞেস করার ইচ্ছে আর তার নেই।
ভরত আর কমলেশ দুই ওপেনার ড্রেসিংরুম থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে, দু—তিনজন বলে উঠল, ”বেস্ট অব লাক।” দিলু ঘর থেকে বেরিয়ে এসে লম্বা করিডরে দাঁড়াল। এখান থেকে দুটো উইকেটই দেখা যায়। ওয়ান ডাউন রাজর্ষি তার পাশে এসে দাঁড়াল।
”দুলাল, তুমি কি এখানেই থাকো?”
”হ্যাঁ, কেন বলো তো!” দিলু অবাক হল প্রশ্নটায়।
”অ্যালবার্ট স্কোয়ারে বন্ধু পরিষদে খেলতুম, তখন তোমায় দেখেছি। তোমার বাড়ি তো মৌলালিতে। তা হলে এখানে কেন?”
”এখানে মামার বাড়ি। পরীক্ষায় ফেল করে এখানে এসে স্কুলে ভর্তি হয়েছি।”
দিলুর সরল স্পষ্ট উত্তর রাজর্ষির মনে দাগ কাটল। ‘ফেল করে’ কথাটা কত সহজে বলল। রাজর্ষিও সহজ ভাবে বলল, ”তোমার ব্যাটটা তো দেখলুম কানাভাঙা, একটা ভাল ব্যাট কিনে নাও।”
