”দুধঘাট স্কুল, দুধঘাট স্কুল।” এর রিকশাওলা জানান দিল চেঁচিয়ে।
ওরা ছ’জনই উঠে বসল রিকশার তিনদিকে পা ঝুলিয়ে। স্কুলের ফটক থেকেই ভিড় শুরু হয়েছে। পাঁচিলের ওপর লোক দাঁড়িয়ে। মলু কোনওক্রমে ঠেলেঠুলে ঢুকে দাঁড়াবার জায়গা করে নিল। মাঠে চোখ বুলিয়ে সে খুঁজে পেল না দিলুকে। পাশে দাঁড়ানো ছেলেটিকে সে জিজ্ঞেস করল, ”আচ্ছা, দিলীপ কর খেলছে না?”
ছেলেটি খুবই অবাক চোখে তাকিয়ে বলল, ”সে কী, এতক্ষণ পরে জিজ্ঞেস করছেন দিলীপ খেলছে কিনা?”
অপ্রতিভ মলু বলল, ”আমি এইমাত্র এলাম।”
”খেলছে তো দিলীপই, পাঁচজনকে আউট করেছে। ওই তো হেলমেট পরা উবু হয়ে বসে।” ছেলেটি আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে দিতেই চেঁচিয়ে উঠল ”কট কট। দিলু আবার ক্যাচ নিয়েছে।”
মলু দেখল, ব্যাটসম্যানের পায়ের কাছে এক হাত বাড়িয়ে দিলু শুয়ে, হাতে লাল রঙের বল। সারামাঠ চিৎকার করছে আর লাফাচ্ছে। চাঁদোয়ার পাশে স্ট্যান্ডে খাড়া করা ব্ল্যাকবোর্ডে একটি ছেলে ৫১—৫ মুছে খড়ি দিয়ে লিখল ৫৯—৬।
”এই নিয়ে ছেলেটা ছ’জনকে একাই ফিরিয়ে দিল, অবিশ্বাস্য প্রতিভা।” মলুর পেছনে কে একজন বলল।
”ছেলেটার সম্পর্কে যা সব শুনতাম মনে হত বাড়িয়ে বাড়িয়ে বলছে। এখন দেখছি একটুও বাড়ানো কথা নয়। অবিশ্বাস্য প্রতিভা বলছেন কী, অলৌকিক বলুন। অনেকদূর যাবে, বিরাট নাম করবে।”
মলু ধাঁধায় পড়ে গেল। এসব কথা দিলুর সম্পর্কেই কি বলা হচ্ছে? এত লোক উচ্ছ্বসিত হচ্ছে কি দিলুর জন্য? আশ্চর্য তো। দিলু অবিশ্বাস্য প্রতিভাবান, কই আমরা কেউ তো জানতুম না। মলু ভিড়ের মধ্যে পথ করে বাউন্ডারির ধারে গিয়ে দাঁড়াল।
অংশু বোলার বদল করে আবার আনল অমিতাভকে। দিলুকে বলল প্রথম স্লিপে দাঁড়াতে।
”হেলমেটটা রেখে আসি।”
”লাইনের ধারে টুয়েলফথম্যান রয়েছে, ওর হাতে দিয়ে এসো।”
হেলমেট খুলে হাতে নিয়ে দিলু বাউন্ডারি লাইনে দৌড়ে গেল। ছেলেটির হাতে হেলমেটটা দেওয়ার সময় চোখে পড়ল মা দাঁড়িয়ে তার দিকেই তাকিয়ে।
ছ্যাঁত করে উঠল তার বুকের মধ্যে। ধরা পড়ে গেছি। তারপরই দেখল, মা ডান হাতটা তুললেন, মুখে মা—দুর্গার মতো একটা হাসি।
আশীর্বাদ। দিলু মাথাটা হেলিয়ে হাসল, তারপর ছুটে এসে দাঁড়াল স্লিপে। অমিতাভ প্রথম বলটা ঠুকে দিতে গিয়ে শর্ট পিচে ফেলল। কাঁধের কাছে ওঠা বলটা মারার জন্য ব্যাটসম্যান সপাটে ব্যাট ঘোরাল। বল ব্যাটের কানায় লেগে দিলুর মাথার অনেক ওপর দিয়ে থার্ডম্যান অঞ্চলে উঠে গেল। দিলু ক্যাচ নেওয়ার জন্য দৌড়চ্ছে, থার্ডম্যানে ফিল্ড করছে যে সেও দৌড়ে আসছে। দু’জনে মুখোমুখি হয়ে থমকে দাঁড়াল। বলটা তাদের মাঝখানে পড়ে লাফিয়ে উঠতেই দিলু বল ধরে নিয়েই ঘুরে গিয়ে ছুড়ল। অংশু দিলুর দিকে মুখ করে, উইকেটের পেছনে ছোড়া বলটা ধরার জন্য। ব্যাটসম্যানরা দ্বিতীয় রানটা নিচ্ছে, রান নেওয়া সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই অংশুর গায়ে ছিটকে এসে লাগল স্টাম্পের একটা বেল। ব্ল্যাকবোর্ডে লেখা হল ৭১—৭।
মলু এধার—ওধার তাকাতে—তাকাতে দেখতে পেল জেঠুকে। পাশের চেয়ারে বসা এক পাকাচুলকে মাথা নেড়ে কী বোঝাচ্ছেন। মলু ভিড় ঠেলে এগোতে লাগল।
অংশু ঠাট্টা করে দিলুকে বলল, ”সাতটা তো হল, বাকি তিনটে আর পড়ে থাকে কেন, নিয়ে ফেলো।”
দিলু মাথা চুলকে বলল, ”স্পিনার আসুক, তখন দেখা যাবে।”
দেখা অবশ্য হল না। চার ওভার পর আবার বুদ্ধদেব বল করতে এল। তার প্রথম ওভারেই দুটো চার, একটা দুই নিয়ে ব্লু—র ইনিংস একশোয় পৌঁছল একত্রিশ ওভারে। পাঁচ আর আট নম্বর ব্যাটসম্যান এখন ক্রিজে। আট নম্বর বেপরোয়া হয়ে ব্যাট চালাচ্ছে। সুনন্দকে দুটো ছয় মারার পর দুটো ডট বল, তারপরের বলটায় বোল্ড হয়ে গেল। নবাগত প্রথম বলেই পিছিয়ে এসে ডাইভ করেই পিছলে পড়ল। ডানপায়ের গোড়ালি লাগল অফ স্ট্যাম্পে, বেল পড়ে গেল। শেষ ব্যাটসম্যান লাজুক মুখে এল। সে ব্যাট করতে পারে না সবাই জানে এবং সেটা সে জানিয়েও দেয় ঝাড়ু দেওয়ার মতো ব্যাট চালিয়ে। ঝাড়ু মেরে এক রান পেয়ে সে মস্ত বড় করে হেসে নিল। আশাতীত সৌভাগ্যে।
পাঁচ নম্বর তখনও নট আউট চল্লিশ রানে। তার লক্ষ্য একটি অর্ধশত রান পাওয়ার, হাতে রয়েছে চল্লিশ বল। ঝাড়ুদারকে বাঁচিয়ে রেখে আরও দশটি রান তাকে করতে হবে, যেভাবেই হোক বোলিং থেকে ওকে সরিয়ে রাখতে হবে। ওভারের বাকি আরও চার বল। শেষ বলে একটা রান নিয়ে ওধারে যাবে ঠিক করে সে তিনটে বল থামাল। ঝাড়ুদারকে মাথা নেড়ে ইশারায় বলল, এইবার রান নিতে তৈরি হও।
বুদ্ধদেব বল করার আগে অংশু ব্যাটসম্যানের উদ্দেশ্যটা বুঝে ফিল্ডারদের কাছে নিয়ে এল। দুই বা চার রান যদি পায় পাক, এক বা তিন রান যেন না পায়। বুদ্ধদেব বলটা করল আচমকাই মিডিয়াম পেসে, প্রায় ইয়র্কার। পাঁচ নম্বর তাড়াতাড়ি ব্যাট নামাল। ব্যাটে লেগে বল পিচের মাঝখানে এসে থেমে গেল। এদিকে দু’জনেই সেকেন্ড তিনেক ইতস্তত করে রান নিতে ছুটল। বুদ্ধদেব ছুটে এসে বল কুড়িয়েই ছুড়ল। অংশু বলটা ধরেই উইকেট ভেঙে দিল। ঝাড়ুদার রান আউট। ব্লু—র ইনিংস শেষ একশো তেরো রানে।
আম্পায়ার প্রতাপ লাহিড়ি আঙুল তোলামাত্রই স্কুলের প্রায় পঞ্চাশটি ছেলে রে রে করে মাঠে ঢুকে পড়ল। দিলুকে একজন কাঁধে বসাবার চেষ্টা করে পারল না। দু’জন চেষ্টা করল পাঁজাকোলা করতে, পারল না। অবশেষে ছ’জন তাকে ধরে মাথার ওপর লম্বা করে তুলল এবং সেই অবস্থায় বহন করে নিয়ে গেল ড্রেসিংরুমে। দিলু মুখ ফিরিয়ে দেখার চেষ্টা করল মা আর দাদুকে। ভিড়ে তারা আড়াল পড়ে গেছে, সে দেখতে পেল না।
