অতিরিক্ত লেগবাই নিয়ে ব্লু—এর রান দু’ উইকেটে চল্লিশ, এগারো ওভারে। দুই ব্যাটসম্যানই উইকেটের গতি ও বাউন্সের সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছে। বড় একটা পার্টনারশিপ ধীরে ধীরে তৈরি হওয়ার পথে। ওপেনার ছেলেটি অমিতাভর বদলি নতুন বোলার রাজীব জয়সোয়ালকে কাট করে সহজ রান আছে দেখে ”ইয়েস” বলে ছুটল। মাঝপথে গিয়ে দেখল নন স্ট্রাইকার বেরোয়নি। সে চেঁচিয়ে উঠল, ”রান, রান”।
দিলু বাঁ পাশে ঝাঁপিয়ে বলটা ধরে উপুড় হয়ে পড়ে ছিল। ধড়মড়িয়ে উঠে হাঁটু গাড়া অবস্থাতেই ডান হাতে ফাঁকা স্ট্রাইকার প্রান্তে বল ছুড়ে অফস্টাম্প ফেলে দিল। রাগ চাপতে চাপতে ছেলেটি মাঠ ছাড়ল। তেরো ওভার সম্পূর্ণ, চুয়াল্লিশ রান তিন উইকেটে, রানরেট প্রায় সাড়ে তিন।
অংশু এবার আনল তার অফ স্পিনার বুদ্ধদেব চ্যাটার্জিকে। মাঠে ফিল্ডার রাখার বাঁধাবাঁধি এখন আর নেই। অংশু ফিল্ডারদের ছড়িয়ে দিল গণ্ডির বাইরে। দিলুকে নিয়ে এল সিলি মিডঅফে ব্যাট থেকে দশ হাত সামনে। আর একজনকে রাখল ব্যাকওয়ার্ড শটলেগে ব্যাটসম্যানের পিঠের কাছে।
সামনে নাকের কাছে একজন পেছনে পিঠ ঘেঁষে একজন, ব্যাটসম্যানটি অস্বাচ্ছন্দ্য নিয়ে তুলে তুলে দেওয়া চারটি বল পা বাড়িয়ে ঝুঁকে থামিয়ে দিল। একটা বল ব্যাট থেকে সামান্য উঠে গেছল, দিলু সামনে ঝাঁপিয়েও ক্যাচটা পেল না। হতাশ ব্যাটসম্যান ঠিক করল আক্রমণই আত্মরক্ষার সেরা উপায়। পঞ্চম বলটায় প্রচণ্ড জোরে ড্রাইভ করল। জমি থেকে ইঞ্চি দুয়েক ওপর দিয়ে বলটা পা ফাঁক করে ঝুঁকে থাকা দিলুর দিকে জ্বলন্ত গোলার মতো সোজা ধেয়ে গেল।
দু’হাতের তালু চকিতে নামিয়ে দিলু বলটা ধরে নিয়েই মাথার ওপরে ছুড়ে দিয়ে আবার লুফল। দু’জনকে রান আউট, দুটো ক্যাচ কোনওটাই সহজ ছিল না। হাতের ডায়েরি বইটা দেখতে দেখতে দেবু ঘোষাল পাশের লোককে চাপা গলায় বলল, ”এরকম অলরাউন্ড ফিল্ডার জীবনে দেখিনি! চারটে উইকেট তো ওরই।”
চতুর্থবার ছুটে যাওয়ার উৎসাহটা একটু স্তিমিত হয়ে গেল ফিল্ডারদের। রাজর্ষি দিলুর হাতের তালু দুটো পরীক্ষা করে ঠাট্টার সুরে বলল, ”দেখ, বলটারই হয়তো লেগেছে।”
বুদ্ধদেব বাংলার একজন প্রতিশ্রুতিমান স্পিনার, প্রথম ডিভিশান লিগে ফুলবাগান দলে খেলে। লেংথ আর লাইন বজায় রাখায় নিখুঁত, ফ্লাইটের হেরফের ঘটানোতেও ওস্তাদি দেখিয়েছে, স্পিন করানোর ব্যাপারটায় এখনও নিয়ন্ত্রণ আসেনি, টপ স্পিন আয়ত্ত করার জন্য খাটছে। ওর বলে উইকেটের আশেপাশে প্রচুর ক্যাচ ওঠে, সেগুলো ধরার লোক পাওয়া যাচ্ছে না।
প্রথম চারজন আউট হয়ে গেছে। পাঁচ ও ছয় নম্বর ব্যাটসম্যান শূন্য রানে ব্যাট করছে। ব্লুয়ের উঠেছে চুয়াল্লিশ রান, হাতে রয়েছে ছয় উইকেট আর পঁচিশ ওভার। ব্লু দুশো রানে পৌঁছবার আশা করতে পারেই, যদি এই জুটিটা দাঁড়িয়ে যায়। জয়সোয়ালের বলে একটা চার আর তিনটি সিঙ্গল হল।
এবার বুদ্ধদেবের ওভার। সে দিলুকে আর একটু এগিয়ে ব্যাট থেকে ছ’হাত দূরে দাঁড়াতে বলল। তুলে প্রথম বলটা দিল, লেংথের একটু শর্ট, স্পিন ছিল না। ছেলেটি পিছিয়ে ব্যাট দিয়ে থামাল। এবারের বল আর একটু তুলে একই লেংথে, তবে স্পিন করিয়ে। আবার পিছিয়ে এসে ব্যাট দিয়ে আটকাল।
ব্যাটসম্যানের কপালে ফুটল দুশ্চিন্তার রেখা। সেটা লক্ষ করল দিলু। তার মনে হল, এবার ও ভুল করবে।
তৃতীয় বল আর একটু তুলে এবার গুডলেংথে। ব্যাটসম্যান তাড়াতাড়ি ঝুঁকে ডিফেন্সিভ ব্যাট পাতল। ব্যাট থেকে লোপ্পা হয়ে বল জমা পড়ল দিলুর হাতে। লাফিয়ে উঠে এবার দিলুই ছুটে গেল বোলারের কাছে, জড়িয়ে ধরল বুদ্ধদেবকে।
অংশু বলল, ”দুলাল দৌড়ে গিয়ে অ্যাবডোমেন গার্ড পরে এসো, আর আমার হেলমেটটা। সিনগার্ড নেই, থাকলে ভাল হত।”
দিলু ড্রেসিংরুমের দিকে ছুট লাগাল।
ঠিক সেই সময় বাইগাছি স্টেশনে ট্রেন থেকে নামল মলু। মোটরগাড়ি গ্যারাজে গেছে সেল্ফস্টার্টারের গোলমাল সারাতে। স্টেশনে টিকিট কালেক্টর থাকে না, মলু হাতের টিকিট হাতে নিয়ে বেরোতেই চোখে পড়ল লাল কালিতে লেখা পোস্টার—আসুন, দেখুন/বাংলার অলৌকিক ফিল্ডার দুধঘাট স্কুলের ছাত্র।
এর পরই মলুর চোখ সরু হল ও ভ্রূ জুড়ে গেল দিলীপ কর নামটা দেখে। পোস্টারের দিকে আধ মিনিট তাকিয়ে থেকে সে রিকশা স্ট্যান্ডে গিয়ে দেখল জায়গাটা ফাঁকা। কী ব্যাপার! একজন নাপিত একটি লোকের দাড়ি কামিয়ে দিচ্ছে। সে তাকেই জিজ্ঞেস করল, ”স্ট্যান্ডে রিকশা নেই। কী ব্যাপার, ধর্মঘট নাকি?”
খুর চালাতে চালাতেই লোকটি বলল, ”খালি যাচ্ছে আর আসছে, দুধঘাট ইস্কুল মাঠে আজ কিরকেট খেলা আছে না। একটু দাঁড়ান, এখুনি ফিরে আসবে।”
মলুকে মিনিট তিনেক দাঁড়াতে হল। ততক্ষণে পাঁচজন লোক জুটে গেল। তাদের কথা শুনে সে বুঝল, ওরাও স্কুল মাঠে যাবে।
”ছেলেটা নাকি সত্যিই অলৌকিক, যেখান—সেখান থেকে যা ছোড়ে তাই লেগে যায়।”
”আমিও তাই শুনলুম দুধঘাট স্কুলে পড়ে একটা ছেলের কাছে। রোজ ছুটির পর মন দিয়ে বল ছোড়া, ক্যাচ ধরা প্র্যাকটিস করে। দেখি গিয়ে কেমন অলৌকিক।”
”ছেলেটা হেডমাস্টার মশাইয়ের ভাগনা। উনি খুব উৎসাহ দেন খেলাধুলোয়।”
মলু স্তম্ভিত হয়ে শুনে গেল। ভ্যান রিকশা পর পর তিনটি এসে হাজির।
