আশিস ঘোষ দেবুর পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। দিলুর সঙ্গে কোনও কথা বলল না। মাঠের একধারে অংশু গ্লাভস হাতে পরে একজনের ছোড়া বল ধরে ফেরত পাঠাচ্ছে। গোল হয়ে দাঁড়ানো পাঁচজনকে একটি ছেলে ক্যাচিং প্র্যাকটিস করাচ্ছে। মাঠের আর একদিকে একই ব্যাপার হয়ে চলেছে। ওরা ব্লু দল। স্কুল মাঠে সাদা জামা সাদা ট্রাউজার্স পরা গুটিতিরিশেক ছেলে ব্যাট—বল নিয়ে নেমেছে এমন দৃশ্য আগে কেউ কখনও দেখেনি। দুধঘাটে এটা বিরাট ঘটনা।
আশিস ঘোষ আর প্রতাপ দুই আম্পায়ার। ওদের সঙ্গে মাঠের মাঝে গিয়ে টস করল অংশু আর ব্লু—এর ক্যাপ্টেন আরিফ মহম্মদ। আরিফ টস জিতে ব্যাট নিল। দুটো টিম করেছে দেবু। রেড দলে রেখেছে যারা ভাল ব্যাট করে, ব্লু দলে রয়েছে ভাল বোলাররা। মাইকে ঘোষিত হল টসের ফল এবং দুটো টিমের নাম। ডি কর নামটা উচ্চচারিত হওয়া মাত্র মাঠ ঘিরে হর্ষধ্বনি উঠল।
অংশু ড্রেসিংরুমে ফিরে এসে দিলুর সঙ্গে সবার পরিচয় করিয়ে দিল। ”একে তোমরা আজই প্রথম দেখছ, এর নাম দুলাল কর। এই স্কুলেই পড়ে। ভাল ফিল্ড করে।” ছেলেরা একসঙ্গে বলে উঠল, ”হাই।”
দেবু দরজায় এসে বলল, ”মাঠে নামো, দেরি হয়ে গেছে পনেরো মিনিট। মনে রেখো চল্লিশ ওভারের খেলা। ফিল্ড রেস্ট্রিকশন থাকবে পনেরো নয়, তেরো ওভার।”
ওরা ঘর থেকে বেরিয়ে আসতেই ক্লাস টেনের দুটি ছাত্র দরজা বন্ধ করে পাহারায় দাঁড়াল। হেডসারের কড়া নির্দেশ, প্লেয়াররা ছাড়া আর কেউ ঘরে ঢুকতে পারবে না। মাঠে এসে অংশু দিলুকে বলল, ‘কোথায় দাঁড়াবে?”
”কভারে।” দিলু পছন্দ করে ওই জায়গায় ফিল্ড করতে।
ছিপছিপে লম্বা অমিতাভ দে মিডিয়াম পেসের বোলার। তার প্রথম বল লেগ স্ট্যাম্পের বাইরে থেকে আউট সুইং করে অফ স্টাম্পে। ব্যাটসম্যান পিছিয়ে গিয়ে জোরে ড্রাইভ করল। দিলু কুঁজো হয়ে গুটিগুটি এগোচ্ছিল। বলটা তার ডান দিক দিয়ে যাচ্ছে। তার দিকে সে ঝাঁপিয়ে কোনওক্রমে বাঁ হাত বাড়িয়ে বলটা হাতে লাগাল। বলটা ছিটকে তিন মিটার গিয়ে থেমে রইল। নন স্ট্রাইকার কয়েক পা বেরিয়ে জমিতে পড়ে থাকা বলটার দিকে তাকিয়ে দোনামনা করে স্ট্রাইকারের দিকে মুখ ফেরাল। স্ট্রাইকার হাত তুলে তাকে যখন রান নিতে বারণ করছে ততক্ষণে দিলু ছুটে গিয়ে বলটা কুড়িয়ে ছুড়েছে বোলারের উইকেটে। স্টাম্প ছিটকে যাওয়ার পর নন—স্ট্রাইকারের ব্যাট স্পর্শ করল পপিং ক্রিজের পেছনের জমি। দু’হাত তুলে ফিল্ডাররা চিৎকার করে উঠতেই আঙুল তুলল আশিস ঘোষ। প্রথম বলেই ফিরে গেল একজন। অংশু ছুটে গেল দিলুর কাছে, অন্যরাও ছুটে এসে হাই ফাইভ করার জন্য ঠেলাঠেলি শুরু করল।
অংশু বলল ”স্টেশনে পোস্টার দেখে খুব তো হাসাহাসি করেছিলিস, তখন আমি কিন্তু হাসিনি, এইবার হাসব।”
পরের ছেলেটি মাঠে নামছে। ব্যাটসম্যান এগিয়ে গিয়ে তার সঙ্গে কথা বলতে লাগল দিলুকে দেখিয়ে। নবাগত ঘাড় নেড়ে জানাল সে বুঝেছে। বাকি পাঁচটা বল অফস্টাম্পের বাইরে দিয়ে গেল, অংশু ধরল।
দ্বিতীয় ওভার। বল করবে সুনন্দ। ব্যাটসম্যান বাঁ হাতি। বেঁটে, গাট্টাগোট্টা। তৃতীয় বলে গালিতে ক্যাচ, ফিল্ডারের হাত থেকে পড়ে গেল। পরের বলে কাট করে গালির পাশ দিয়ে দুটো রান নিল। পঞ্চম বলে সোজা ড্রাইভে চার রান, ওভারের শেষ বলে হল নো বল এবং গ্লান্স করে এক রান।
চারটে ওভার বিনা ঘটনায় কেটে গেল, রান এক উইকেটে চোদ্দো। পঞ্চম ওভারে বাঁ—হাতি সোজা ছয় মারল অমিতাভকে। দর্শকদের মধ্যে হইহই পড়ে গেল। ছাত্ররা ”উই ওয়ান্ট সিক্সার” স্লোগান তুলল। বাঁ—হাতি পরের বলে আবার ছয় মারল, বল পড়ল স্কুলের পাঁচিলের বাইরে। তুমুল চিৎকার নারকেল গাছের মাথা ছাড়িয়ে উঠে গেল। নিচু ক্লাসের ছেলেরা মাঠে ঢুকে নাচানাচি শুরু করতেই লাইফ সায়ান্সের সার ছুটে গেলেন, ”কোয়ায়েট, কোয়ায়েট” বলে ছেলেরা দৌড়ে দর্শকদের ভিড়ে মিশে গেল। পর পর দুটো ছয় আর দর্শকদের উচ্ছ্বাস তার মাথায় রক্ত চড়িয়ে দিয়েছে।
অমিতাভ পরের বল দিল গতি একটু কমিয়ে, আগের দুটো ছয় যেভাবে ব্যাট চালিয়ে মেরেছিল বাঁ—হাতি, এবারও সেইভাবে ব্যাট চালাল। বলটা দুটো নারকেল গাছের উচ্চচতায় উঠে একস্ট্রা কভার বাউন্ডারির দিকে যাচ্ছে এবং বলে চোখ রেখে দিলুও সমানে ছুটছে। সম্ভবত ওভার বাউন্ডারি হবে। বলের দিকে দু’হাত বাড়িয়ে দিলু ঝাঁপাল, দু’পাক গড়িয়ে উঠে দাঁড়াল বল হাতে।
সারা মাঠ চুপ। যখন বুঝল দিলু ক্যাচ ধরেছে, ফিল্ডাররা ছুটে গেল, হাততালি দিয়ে চিৎকার করতে লাগল ‘দি ই লি ই প, দি ই লি ই প”। দিলু ফিরে তাকিয়ে চাঁদোয়ার নীচে চেয়ারে বসা দাদুকে দেখতে পেল ডান হাত মুঠো করে তুলে দাঁড়িয়ে।
ফিরে এসে উইকেটের পেছনে দাঁড়িয়ে অংশু প্রথম স্লিপকে বলল, ”হ্যাঁ রে, কী বলছে ওরা শোন তো!”
প্রথম স্লিপ শুনে বলল, ”দিলীপ দিলীপ বলছে মনে হচ্ছে।”
অংশু বলল, ”দিলীপ কেন, ওর নাম তো দুলাল। দেবুদা তো তাই বললেন।”
প্রথম স্লিপ কাঁধে ঝাঁকি দিয়ে বলল, ”নাম যাই হোক, ক্যাচটা কীরকম নিল দেখলি। পোস্টারে ঠিকই লিখেছে।”
”বুদ্ধি করে অমিতাভ স্লোয়ার দিল বলেই ক্যাচটা উঠল।” অংশু মনে করিয়ে দিল।
এর পরে যে ছেলেটি ব্যাট হাতে নামল সে এক হাস্যকর পরিস্থিতি তৈরি করল। অফের দিকে মারা কোনও বলেই সে রান নিতে রাজি নয়। সহজ সিঙ্গল থাকলেও সে ”নোও ও” হাঁক দিয়ে উলটোদিকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। চারদিকে হাসাহাসি শুরু হল, তার পার্টনার বিরক্ত হয়ে তার সঙ্গে কথা বলল। কিন্তু সে নিজের বিবেচনা বোধে অনড় রইল। তবে লং লেগে দুটো চার সে মেরেছে আর মিড উইকেট থেকে দুটো সিঙ্গল নিয়েছে।
