সওয়া ন’টায় মোটরবাইকে প্রতাপ হাজির হল। হরিসাধন সকাল থেকেই স্কুলে। প্রতাপের পেছনে বসার আগে দিলু বলল, ”দাদু মাঠে যাচ্ছ কখন?”
”এই একটু পরে টুকটুক করে হেঁটে চলে যাব।” পঞ্চানন দু’হাত কপালে ঠেকিয়ে বললেন, ”দুর্গা দুর্গা।”
প্রতাপ বলল, ”আপনি রেডি হয়ে থাকুন। দিলুকে পৌঁছে দিয়েই আমি আসছি, আপনাকে নিয়ে যাব।”
স্কুল ফটকের সামনে দিলুকে নামিয়ে দিয়ে প্রতাপ বাইক ঘুরিয়ে নিল পঞ্চাননকে নিয়ে আসার জন্য। এক মিনিট পরেই বাইগাছি স্টেশন থেকে সারি দিয়ে ছ’টা সাইকেল ভ্যান রিকশায় পা ঝুলিয়ে বসা পঁচিশ—ছাব্বিশটি ছেলে পৌঁছল। তাদের পিছু পিছু এল আরও চারটি রিকশা। তাতে লম্বা লম্বা ব্যাগে তাদের ব্যক্তিগত খেলার সরঞ্জাম। ছেলেরা যে যার নিজের ব্যাগ হাতে নিয়ে ফটক দিয়ে ঢুকল। হরিসাধন এবং দু’জন শিক্ষক দাঁড়িয়ে।
”সোজা চলে যাও, একতলায় ডান দিকের দুটো ঘর ড্রেসিংরুম।” হরিসাধন স্কুলবাড়ির দিকে আঙুল দেখিয়ে বললেন। ”দরজাতেই কাগজে টিমের নাম লেখা আছে।” গতকাল প্রতাপ জানিয়ে দেয় দুটো দলের নাম দেওয়া হয়েছে রেড আর ব্লু। ছেলেরা চারধারে চোখ বোলাতে লাগল। দিলু তাদের কাছেই দাঁড়িয়ে। শুনতে পেল তাদের কথা।
”কী বিউটিফুল গ্রাউন্ড আর সারাউন্ডিং। সারি দিয়ে কোকোনাট আর সরু সরু পামগাছ।”
”অংশু ওগুলো পাম গাছ নয় রে সুপুরি গাছ।” একজন সংশোধন করে দিল।
একজন বলল, ”দাদুর কাছে শুনেছি একসময় ইডেন ঘিরে ছিল দেবদারু গাছ। তখন একটা কংক্রিটের খণ্ডও ছিল না ইডেনে। গঙ্গার দিক থেকে হাওয়া আসত, পুরনো বলও সুইং করত।”
আর একজন বলল, ”এখানে ধানখেত থাকলে বলতুম অংশু ওই দেখ, ওই গাছ দিয়ে দারুণ তক্তা হয়।”
অংশু স্বাস্থ্যবান, ফরসা, চোখা নাকমুখ। দামি জিনস পরা। ওদের কথা শুনে হাসতে হাসতে বলল, ”বল, বল, বলে যা, সারাক্ষণ ট্রেনে পেছনে লেগেছিস, আবার এখানেও। এবার একটু চুপ কর। এখানকার লোকেরা শুনলে—” সে এধার—ওধার তাকাল। চোখাচোখি হয়ে গেল দিলুর সঙ্গে, দিলু হাসতে লাগল। ”এই দেখ একজন হাসছে।”
ছেলেরা এগিয়ে যাচ্ছে ড্রেসিংরুমের দিকে। দিলু এখনও জানে না সে রেড না ব্লু কোন দলে পড়েছে। কলকাতায় দেবু ঘোষাল টিম করেছে, দিলু তাকে কখনও দেখেনি, সে আশিস ঘোষকেও চেনে না। কোন ঘরে ঢুকবে বুঝতে না পেরে একতলার করিডরে দাঁড়িয়ে রইল। সবাই দরজায় আঁটা কাগজ দেখে দুটো ঘরে আলাদা হয়ে ঢুকল দেখে দিলু বুঝে গেল ওরা জানে কে কোন দলের। ওরা নিশ্চয় বলতে পারবে দুলাল কর বা ডি কর, রেড না ব্লু কোন দলে।
সে কিন্তু কিন্তু করে রেড ঘরে ঢুকল। ছেলেরা প্যান্ট শার্ট বদলে জুতো পরায় ব্যস্ত। সামনেই অংশু বেঞ্চে বসে জুতোর ফিতে বাঁধছে। দিলু নিচু স্বরে তাকে জিজ্ঞেস করল, ”তোমাদের টিমে কি এখানকার কোনও ছেলে আছে?”
অংশু প্রথমে তার আপাদমস্তক দেখল। তারপর বলল, ”একেবারে ড্রেস করেই এসেছ দেখছি। বোসো। তোমার নামে পোস্টার দেখলুম স্টেশনে, লোকাল হিরো। আমি রেডের ক্যাপ্টেন অংশুমান সিনহা।” অংশু হাত বাড়িয়ে দিল, দিলু হাতটা ধরে ঝাঁকিয়ে ওর পাশে বসল। অংশুকে তার মনে হল পরিষ্কার স্বচ্ছ মনের, সহজেই বন্ধু হয়ে যেতে পারে। উত্তরপল্লীর সনৎদা বয়সে তার দ্বিগুণ। আচরণে কথাবার্তায় সবসময়ই বুঝিয়ে দেন তিনি ক্যাপ্টেন, দিলু আড়ষ্ট বোধ করেছে।
”দেবুদা বলেছেন তুমি দারুণ ফিল্ড করো, যে—কোনও পজিশনে। আমি উইকেটকিপার। তোমার নাম তো দুলাল কর, এই স্কুলে পড়ো, আমি লা মার্টিনিয়ারে।” বলতে বলতে অংশু লম্বা ব্যাগ থেকে ব্যাট প্যাড গ্লাভস এমনকী একটা হেলমেটও বের করল। দেখে দিলু অস্বস্তিতে পড়ল। তার মনে হল, এর প্রত্যেকটাই বেশ দামি। কৌতূহলে সে ব্যাটটা হাতে তুলে নাচাল। দাঁড়িয়ে ব্যাটটা ধরে স্টান্স নিয়ে দু’বার কাল্পনিক বলে ডিফেন্সিভ খেলল এক পা পিছিয়ে এসে। অংশু তাকে লক্ষ করছিল, বলল, ”তোমার প্লেয়িং কিটস কোথায়?”
”স্কুলের ঘরে রয়েছে।” দিলু বলতে পারল না তার নিজস্ব কোনও খেলার সরঞ্জাম নেই, ব্যাটও নেই। দুটো ম্যাচে তার প্যাড, ব্যাট, অ্যাবডোমেন গার্ড সবই ছিল উত্তরপল্লী ক্লাবের। স্কুলের ব্যাটটার কানা সেদিন ভেঙেছে। আর যে ব্যাটটা আছে তা দিয়ে ম্যাচ খেলা যায় না। অংশুর মতো তারও নিজের ব্যাট প্যাড গ্লাভস থাকা দরকার।
”হারি আপ বয়েজ।” দাঁড়িয়ে উঠে অংশু তাড়া দিল।
অংশুর গলার স্বর শুনে দিলু অবাক! কোথায় সেই হাসিখুশি হালকা ভাব, এ তো ক্যাপ্টেনের দাপুটে গলা।
অংশু বলল, ”নেট রয়েছে দেখলাম, ভবানী বলগুলো নিয়ে চল। রবি, নিমু, শান্তু ব্যাট নিয়ে নেটে যা।” দিলুকে বলল, ”তুমিও চলো। থ্রো করবে, আমি ধরব।”
ঘর থেকে বেরিয়ে এসে বাইরের ভিড় দেখে দিলু তাজ্জব বনে গেল। স্কুল মাঠের এমন চেহারা সে দেখেনি। সারা মাঠ ঘিরে বসে রয়েছে নানান বয়সী মানুষ, আর কমপক্ষে স্কুলের প্রায় পাঁচশো ছেলে। প্রতাপ তাকে দেখে হাতছানি দিয়ে ডাকল। দাদু কোথায়? দিলু চেয়ারগুলোর দিকে তাকিয়ে পঞ্চাননকে দেখতে পেল।
”দেবুর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দি। তোমাকেই ও আজ বিশেষ করে দেখবে।”
কাছেই দাঁড়িয়ে দেবু ঘোষাল। কম কথার মানুষ। দিলুর কাঁধে হাত রেখে বলল, ”মনে হচ্ছে না টেনশনে রয়েছ। টিমের সঙ্গে মিশে যাও। তুমি তো অংশুর টিমে, ও খুব ম্যাচিওরড ছেলে।”
