”নাম কী ছেলেটার?”
”দুলাল কর।”
”কাগজে নামটা দেখেছি বলে তো মনে পড়ছে না।”
”নামকরা ক্লাবে খেললে দেখতে পেতে। তা হলে রবিবারে তোমরা খেলতে রাজি?”
”দেখুন প্রতাপদা, এটা সরকারিভাবে ট্রায়াল ম্যাচ নয়। বিজয় মার্চেন্ট ট্রফিতে ম্যাচ হয় তিনদিনের। একদিনের ম্যাচটা খেলতে চাই পনেরোটা ছেলে বেছে নেওয়ার জন্য, আমি ডিস্ট্রিক্টের ছেলে খুঁজছি। রবিবারে ট্রেন কখন?”
”সকাল আটটা পাঁচের ট্রেনে আসাটাই সুবিধের। বাইগাছি স্টেশনে আমরা রিসিভ করব, ওখান থেকে সাইকেল ভ্যানে স্কুলে। প্লেয়ারদের ইকুইপমেন্টস আর বল তোমরা আনছ, আমরা স্ট্যাম্প দোব আর তিরিশজনের লাঞ্চ—টি, আর কিছু?”
”আম্পায়ার দু’জন?”
”একজন আমি আর একজন আশিস বা তুমি। হোয়াইট কোট কিন্তু দিতে পারব না।”
.
হইচই পড়ে গেল দুধঘাটে। স্কুলের ছেলেরা পোস্টার লিখে বাইগাছি বাজারে, স্টেশনে, পোস্ট অফিসের, সিনেমা হলের, স্বাস্থ্যকেন্দ্রের দেওয়ালে পর্যন্ত সেঁটে দিল: ”বাংলার জুনিয়ার ক্রিকেটদলের ওয়ান ডে ম্যাচ/দুধঘাট উচ্চচ মাধ্যমিক স্কুল মাঠে/দলে দলে দেখতে আসুন/রবিবার দোসরা নভেম্বর।” আর—একটা পোস্টারে: ”আসুন দেখুন/বাংলার অলৌকিক ফিল্ডার দুধঘাট স্কুলের ছাত্র/দিলীপ কর/ অষ্টম শ্রেণী/এই ম্যাচে খেলিবে।”
স্কুলের মাঠে প্রতিদিন দিলুর ফিল্ডিং বহু ছাত্রই দেখেছে। কলকাতায় দুটো ম্যাচে তার কৃতিত্বের খবর বাসু মারফত সারা স্কুলে ছড়িয়ে যাওয়ায় দিলু এখন সবার দেখার পাত্র। স্কুলের গেট দিয়ে ঢুকলেই ছেলেরা ঘাড় ঘুরিয়ে তার দিকে তাকায়। সুব্রত কাপ জেতা দুধঘাট স্কুলের ছেলেরাও এত নজর টানেনি, যা দিলু পেতে শুরু করেছে। বিকেলে তার ফিল্ডিং প্র্যাকটিস দেখার জন্য ছাত্ররা তো বটেই, গ্রামের লোকেরাও এখন ভিড় করে থাকে।
সৌরভ গাঙ্গুলি, টিভি, খবরের কাগজের দৌলতে ক্রিকেট এখন জনপ্রিয়তায়, বাইগাছি—দুধঘাটে ফুটবলকে দু’নম্বরে ঠেলে পয়লা জায়গাটা নিয়ে নিয়েছে। স্কুলের ছেলেদের নিজেদের মধ্যে খেলা ম্যাচ ছাড়া স্থানীয় লোকেদের আর কোনও ক্রিকেট দেখার সুযোগ হয় না। দেখতে হলে যেতে হয় কলকাতায়। এখন কলকাতাই আসছে দুধঘাটে। বিজয় মার্চেন্ট ট্রফিতে বাংলার হয়ে যারা খেলবে তারা আসছে, আর তাদের সঙ্গে খেলবে দুধঘাটের ছেলে, এটা কি কম কথা!
উত্তেজনায় ফুটে উঠল দুধঘাট। হরিসাধন ডেকে পাঠালেন, যশোহর মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের মালিক শঙ্কর নাগকে।
”শঙ্করবাবু, কলকাতা থেকে ছেলেরা খেলতে আসবে, ক্রিকেট। তাদের লাঞ্চে আমি আপনার ছানার জিলিপি খাওয়াব। মনে রাখবেন, আপনার জিলিপিকে আমি বিশ্ববিখ্যাত মনে করি।”
”সে ঠিকই করেন। স্পেশ্যাল কেয়ার নিয়ে বানাব। ক’জন খাবেন?” নাগমশাই নম্রস্বরে জানতে চাইলেন।
”তিরিশজন। ক’টা করে খাবে আমি বলতে পারছি না, তবে ছোটরা মিষ্টি খেতে ভালবাসে। আপনিই বলুন কত লাগবে।”
শঙ্কর নাগ মাথা চুলকোলন, সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে মনে মনে কী যেন গোনাগুনি করলেন তারপর বললেন, ”কখন খাবে? লাঞ্চ তো খেলার মধ্যিখানে হয়। সেইরকম নিয়ম মেনেই তো খেলা হবে?”
”হ্যাঁ, একদলের ইনিংস শেষ হওয়ার পর লাঞ্চ হবে।” হরিসাধন হেসে উঠে বললেন।
”সার, লাঞ্চটা তো রান্না করতে হবে। সেটা কি স্কুলই করবে?”
”হ্যাঁ। সমরেশবাবুর বাড়ি কাছেই। বুবু কেটারার্সের লোক এসে ওর বাড়িতে তৈরি করবে চিকেন স্টু। সঙ্গে পাউরুটি, স্যালাড, কলা আর ছানার জিলিপি। এ তো বিয়েবাড়ি নয় যে, খাওয়াটাই আসল ব্যাপার, এরা আসছে খেলতে। এবার বলুন কটা লাগবে?”
‘মাথাপিছু পাঁচটা করেই ধরি?” নাগমশাই প্রশ্ন করে আশা নিয়ে তাকালেন।
”পাঁ—আ—চ—টা। বললুম না ওরা খেতে নয়, খেলতে আসবে।” হরিসাধনের মুখে বিরক্তি।
”তা হলে চারটে করে। তিরিশজনই তো আর খেলবে না। তা ছাড়া কারও ভাল লেগে গেলে, লাগবেই, সে আরও দুটো চাইবে। তখন কি আর নেই বলবেন? তাতে ইস্কুলের বদনাম হবে না?”
অকাট্য যুক্তি। স্কুলের বদনাম হরিসাধন হতে দিতে পারেন না। রাজি হয়ে গেলেন। ফিল্ড রেস্ট্রিকশনের তিরিশ গজের সার্কল, বাউন্ডারি লাইনে চুনের দাগ, পিচে জল দেওয়া, রোল—করা প্রতাপ দাঁড়িয়ে থেকে করাল। পঞ্চায়েত থেকে লাল—নীল—হলুদ কাগজের শিকল সুপুরি গাছগুলোয় জড়িয়ে মাঠ ঘেরা হল। লাঞ্চে জলপান বিরতির জন্য কাচের গ্লাস আর জাগ, চা এবং কাপ ডিশ কেটারারই দেবে। একতলায় ক্লাস ফাইভের দুটো ঘর ড্রেসিংরুম হবে। বেঞ্চগুলো, টিচার্স রুম থেকে দশটা চেয়ার আর দুটো টেবল আনা হবে মাঠের ধারে খাটানো ইউনিভার্সাল ডেকরেটরের চাঁদোয়ার নীচে। ফার্স্ট এড বক্স নিয়ে ডাক্তার পোদ্দার সারাক্ষণই থাকবেন কথা দিয়েছেন। দুটো ব্ল্যাকবোর্ড, ডাস্টার, খড়ি স্কোরবোর্ডের জন্য রেডি করে রাখা হয়েছে। নেট প্র্যাকটিসের নেটও চটজলদি খাটিয়ে নেওয়ার মতো অবস্থায় মাঠের বাইরে রাখা হবে। বলা যায় না খেলতে নামার আগে হয়তো ওরা নেট চাইতে পারে। টয়লেটে ব্লিচিং পাউডার দু’দিন ধরে দেওয়া হচ্ছে। মাইক তো থাকবেই।
দুধঘাট স্কুল প্রস্তুত হয়ে অপেক্ষা করতে লাগল। অবশেষে রবিবার এল। সেদিন সকালেও দিলু পুকুরে সাঁতার কাটল অন্যান্য দিনের মতো। দশটায় ম্যাচ আরম্ভ হবে। এখন আটটা। বর্গমূলের অঙ্ক করার জন্য বই আর খাতা নিয়ে সে টেবলে বসল। পঞ্চানন তখন বললেন, ”দাদু, আজ এসব থাক। এখন বরং তুমি মনে মনে ম্যাচটা খেলো। তুমি তো প্রতিদিন প্র্যাকটিস করে নিজেকে তৈরি করেছ, এখন চোখ বন্ধ করে নিজেকে দ্যাখো ফিল্ড করছ। ব্যাটসম্যান বল মারল, যেদিকে বল যাচ্ছে তুমি ছুটলে, বলের কাছে যত তাড়াতাড়ি পৌঁছনো যায় সেইভাবে ছুটলে, বলে চোখ রেখে তুললে, উইকেটের আন্দাজ নিলে, ছুড়লে। মনে মনে বারবার এটা করো সব ভুলে গিয়ে।” এই বলে পঞ্চানন নীচে নেমে গেলেন দিলুকে একা রেখে।
