বাড়িতে ঢুকেই হর্ষ চেঁচিয়ে বলল, ”ও মলুদি, ও বউদি দেখে যাও দিলুদাদা কতবড় একটা মাছ ধরেছে।”
ওরা দোতলায় ছিল। হর্ষর বাড়ি—মাথায়—করা চিৎকারে তাড়াতাড়ি নেমে এল। ততক্ষণে একটা গামলায় মাছের টুকরোগুলো হর্ষ ঢেলে ফেলেছে।
”দ্যাখো গো মলুদি, তোমার ছেলের কিত্তি। কতবড় মাছ ধরে আবার আধখানা ওদের দিয়েও এসেছে।”
পঞ্চানন বললেন, ”এইরকমই তো হওয়া উচিত। আর হবে নাই বা কেন, মলুর ছেলে তো! দেওয়াথোওয়ার হাত তো দিলু মায়ের কাছ থেকেই পেয়েছে।” আড়চোখে তিনি দেখলেন মলুর চোখ পুলকে জ্বলজ্বল করছে।
হর্ষ ব্যস্ত হয়ে বলল, ”বউদি, আমি চট করে দুটো মাছ মলুদিকে ভেজে দি।” বলেই সে মাছের গামলা নিয়ে রান্নাঘরে ঢুকে গেল।
মলু যথাসাধ্য উদ্বিগ্ন হওয়ার চেষ্টা করে বলল, ”জেঠু পুকুরের ধারে বসে মাছধরাটা কিন্তু বিপজ্জনক, দিলু সাঁতার জানে না।”
”ঠিক কথা, এটা তো আমার মনে ছিল না। আচ্ছা মলু, ওকে সাঁতারটা শিখিয়ে দিলে কেমন হয়?” পঞ্চানন গম্ভীর মুখে বললেন।
”দাও, তবে যাকে—তাকে দিয়ে শেখাতে যেও না। ডুবে গেলে বাঁচাতে পারবে এমন কাউকে দিয়ে শিখিয়ো।”
মাছভাজা খেয়ে মলু চলে যাওয়ার পর পঞ্চানন জিজ্ঞেস করলেন দিলুকে, ”দাদু আজ ক’টা হল?”
”আটটা।”
”আজ খুব বাঁচান বেঁচে গেছ, তবে বারবার মাছধরার গল্প কিন্তু টিকবে না। পরের ম্যাচ কার সঙ্গে?”
”ব্রাদার্স ইউনিয়নের সঙ্গে, ওদের মাঠেই খেলা।”
”কলকাতা আমার পক্ষে দূরে হয়ে যায়, এই বেতো হাঁটু নিয়ে অত হাঁটা আমার পক্ষে সম্ভব নয়, খুব ইচ্ছে করে একবার তোমার খেলা দেখতে।”
”দাদু, শেষ কবে ময়দানে খেলা দেখেছ?”
”চুয়াত্তরের ডিসেম্বরে। পটৌডি ক্যাপ্টেন, ওয়েস্ট ইন্ডিজ ইডেনে হারল। ওহ ফোর্থ ডে—র সকালেই চন্দ্রশেখর বোল্ড করল লয়েডকে এখনও চোখে ভাসে, তারপর স্লিপে কালীচরণের ক্যাচ নিল বিশ্বনাথ, চন্দ্ররই বলে। ওখানেই শেষ হয়ে গেল ওয়েস্ট ইন্ডিজ। দু’ চোখ ভরে দেখেছি বিশ্বনাথের ব্যাটিং। প্রায় ছ’ঘণ্টা ব্যাট করে একশো ঊনচল্লিশ রান করেছিল, গিবস আর অ্যান্ডি রবার্টস ছিল বোলার। অমন ব্যাটিং আর দেখা যাবে কি না জানি না। এখন তো যে সেঞ্চুরি করে তাকেই আর্টিস্ট বলা হয়, বিশ্বনাথের ওই খেলা দেখলে আর বলত না।” পঞ্চানন মাথা নাড়তে লাগলেন, দিলু বুঝতে পারল না দাদুর এই আক্ষেপটা বিশ্বনাথের মতো ব্যাটিং আর দেখা যাবে না বলে নাকি সবাই আর্টিস্ট হয়ে যাচ্ছে বলে!
পরের দিন স্কুল ছুটির পর দিলু নেটে ব্যাট করছিল। একটা বল জোরে ড্রাইভ করতেই ব্যাটের কানা ভেঙে একটুকরো কাঠ উড়ে গেল। দিলু অপ্রতিভ হয়ে নেট থেকে বেরিয়ে এল। আর একটা ব্যাট আছে কিন্তু সে আর নেটে ঢুকল না। মাঠের মাঝে কয়েকজনের সঙ্গে ক্যাচিং প্র্যাকটিস শুরু করল। একটু পরেই এল প্রতাপ।
”দিলু, কাল কেউ রান আউট হয়নি তো?”
”হর্ষ মাসি আর দাদুর রানিং বিটুইন দ্য উইকেটে এত ভাল বোঝাপড়া, যে, মা কোনও চান্সই পায়নি স্ট্যাম্পে হিট করার।”
”আশিস ঘোষ দুপুরে ফোন করেছিল, এই নভেম্বরে আন্ডার সিক্সটিন বিজয় মার্চেন্ট ট্রফির খেলা। বেঙ্গল টিমের জন্য প্রবাবেলদের নিয়ে একটা ট্রায়াল ম্যাচ খেলতে চায়। তোমার নাম করল, ট্রায়ালে তোমাকে আর একটু দেখে নিতে চাইছে। আমি ভাবছি রবিবার দুধঘাটে খেলাটা করার জন্য বললে কেমন হয়; তোমার মামার সঙ্গে আজই কথা বলব, ওর পারমিশন ছাড়া তো খেলা সম্ভব নয়, সন্ধ্যায় উনি বাড়ি থাকেন কি?”
”মামা তো এখনও স্কুলেই রয়েছেন, ওঁর ঘরে গিয়ে দেখা করুন না।” প্রতাপ ব্যস্ত হয়ে রওনা হল হেডমাস্টারের ঘরের দিকে, মিনিট কুড়ি পরে টগবগিয়ে ফিরে এল হাসিমুখে। দিলু ব্যগ্রভাবে জিজ্ঞেস করল, ”মামা কী বললেন?”
”এক কথায় রাজি। তাই নয় লাঞ্চ, টি সবই স্কুল দেবে, এমনকী বাইগাছি স্টেশন থেকে এখানে আসার জন্য ভ্যান রিকশার ব্যবস্থাও করবেন বললেন। ওঁর ঘর থেকেই ফোন করলাম আশিসের বাড়িতে, পেলাম না; রাত্রে আর একবার করব, না পেলে কাল সি এ বি—তে যাব।” প্রতাপ অস্থিরভাবে দু’হাত কচলাল।
রাতে সে আশিস ঘোষকে ফোন করে পেয়ে গিয়ে বলল, ”ট্রায়াল ম্যাচটা আমাদের এখানে মানে দুধঘাটের স্কুলের মাঠেই কর না। চমৎকার মাঠ, তবে ইডেনের মতো অত বড় নয়। শেয়ালদা থেকে একঘণ্টা লোকাল ট্রেনে, হাজারদেড়েক লোক তো খেলা দেখবেই। তা ছাড়া লাঞ্চ—টি দিতে স্কুল রাজি।”
”খুব ভাল কথা, আগে দেবু ঘোষালের সঙ্গে কথা বলে নিই; দেবু কোচ, ওর মতামতই এ—ব্যাপারে চূড়ান্ত। ওকে এখুনি ফোন করে তোকে জানাচ্ছি, তুই বাড়ি আছিস তো?” আশিস ফোন রেখে দিল। প্রতাপ ফোনের পাশে বসে রইল। আধঘণ্টা পর ফোন বেজে উঠতেই সে ছোঁ দিয়ে রিসিভার তুলেই বলল, ”আশিস?”
গম্ভীর স্বর এল ”আমি দেবু! কে, প্রতাপদা বলছেন?”
”আশিস তোমায় বলেছে সব?”
”সব মানে, আপনি ট্রায়ালটা দুধঘাটে করাতে চান। ওখানে একটা স্কুল আছে না? শুনেছি খুব নামকরা স্কুল, স্টার লেটার পায় গণ্ডা গণ্ডা। মাঠটা ক্রিকেট খেলার উপযুক্ত কি!”
”আমি ওখানে কোচ করি। স্কুলের একটা ছেলে এ—বছরই কলকাতায় আমার ক্লাবে দুটো ম্যাচ খেলে ন’টা রান আউট করেছে, পাঁচটা ক্যাচ নিয়েছে। কুড়িটা উইকেটের চোদ্দোটা ও একা ফেলে দিয়েছে। ছেলেটাকে খেলিয়ে দেখতে পারো। ভারতে এখন এমন ফিল্ডার নেই, বয়স পনেরো। মাঠ সম্পর্কে বলতে পারি মোহনবাগান মাঠের মতোই মাঠ।”
