”আমাকে আর রাখতে হবে না, ও যেখানে থাকে সেখানে চোখে রাখার ঠিক লোক আছে। আশিস, এই ছেলেটাকে অপেক্ষা করিয়ে পচিয়ে ফেলা ঠিক হবে না। ওকে নিজের চোখে তো দেখলি, এবার ঠেলে তুলে দে।”
”আর একটা ম্যাচ খেলুক, ব্যাটটা কেমন করে দেখি, তারপর আন্ডার সিক্সটিনে ওকে ঢোকাবার জন্য মিটিংয়ে নাম তুলব।”
পঁয়ষট্টি রান টপকাতে উত্তরপল্লীর দুটো উইকেট খরচ হল। দিলু এই ম্যাচেও ব্যাট করার সুযোগ পেল না। খেলা আড়াইটের মধ্যেই শেষ।
অলোকেন্দু তখন ফোটোগ্রাফারের জন্য মাথার চুল ছেঁড়ার মতো অবস্থায়। দুলালের একটা ছবি তার চাই। কত ফোটোগ্রাফারই তো কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে মাঠে ঘুরে বেড়ায় খবরের কাগজে ছবি বিক্রি করবে বলে। আর আজই কারও পাত্তা নেই। দৌড়ে মোহনবাগান মাঠে গিয়ে খোঁজ করে দেখবে ভেবে সে প্রতাপের কাছে গিয়ে বলল, ”দুলাল এখন দশ—পনেরো মিনিট থাকবে তো, আমি দৌড়ে একজন ফোটোগ্রাফার ধরে আনছি।”
”কীজন্য?” প্রতাপ মনে মনে সিঁটিয়ে প্রশ্ন করল।
অলোকেন্দু অবাক হয়ে বলল, ”কেন ছবি তোলার জন্য। কাল প্রভাতীতে বেরোবে। দুটো ম্যাচে চোদ্দো, ভাবতে পারেন! ওর ছবি বেরোবে না তো কার বেরোবে, প্লিজ দশ মিনিট একে থাকতে বলুন।” বলেই সে ছুটতে শুরু করল মোহনবাগান মাঠের উদ্দেশ্যে।
”দিলু, বিপদ ঘনিয়ে আসছে, কাগজে ছবি বেরোবার ব্যবস্থা হচ্ছে।” দিলুর কানে ফিসফিস করে প্রতাপ বলল, ”এখুনি কেটে পড়তে হবে।”
পাঁচ মিনিটের মধ্যে প্রতাপের মোটরবাইক ছুটল দুধঘাটের দিকে। যখন পৌঁছল তখনও বিকেল। ওরা যখন বাড়ির কাছাকাছি, দেখল রাস্তার ধারে একটা ইটের চাঙড়ের ওপর হর্ষ বসে। মোটবাইক দেখেই উঠে দাঁড়িয়ে হাত তুলে চেঁচিয়ে উঠল, ”থামো, থামো, এখন আর বাড়িতে যেও না। উফফ কখন থেকে তোমাদের জন্য বসে আছি। দুপুরে মলুদি এসেছে।”
”মা!” দিলুর মুখ শুকিয়ে গেল।
”দিলুর মা? সর্বনাশ করেছে। কী বলা হয়েছে ওঁকে?” প্রতাপ প্রমাদ গনল।
”বউদি বুদ্ধি করে বলেছে, ছোট হুড়োয় এক বন্ধুর বাড়িতে দিলুদাদা ছিপ দিয়ে মাছ ধরতে গেছে, সন্ধের আগেই এসে যাবে। তোমাদের আগাম জানিয়ে দেওয়ার জন্য মেসোমশাই আমাকে বললেন হষ্য রাস্তায় নিমতলায় গিয়ে বসে থাক। ওদের আসতে দেখলেই কী বলতে হবে শিখিয়ে দিবি। আর বলবি, খুব ভাল হয় যদি দিলু মাছ হাতে বাড়ি ফেরে।”
”মা—আ—ছ! এখন কি বাজার বসেছে? আচ্ছা আমি বাইগাছি বাজারটা দেখে আসছি নয়তো বারাসাতে চলে যাব, আমার চেনা এক মাছওলা আছে।” প্রতাপ আর কথা বাড়াল না। বাইক ঊর্ধ্বশ্বাসে ছোটাল।
”দিলুদাদা তুমি এখন আর বাড়ি যেও না, একেবারে মাছ হাতে বাড়ি ঢুকবে, এখানে বসে থাকো।”
প্রতাপ বাইগাছি গিয়ে দেখল বাজার সুনসান। দেরি না করে মোটরবাইক ঘুরিয়ে ছুটল বারাসাত। সেখানেও মাছের বাজারে লোক নেই, এই সময় থাকার কথাও নয়। কাছেই তিনকড়ির বাড়ি, ছোটবেলার বন্ধু, বাজারে মাছের বড় কারবারি। প্রতাপ হাজির হল তার বাড়িতে।
”তিনু বড় বিপদে পড়ে গেছি, এখুনি একটা মাছ চাই, কিলো দুইয়ের মধ্যে হলেই হবে।”
”মাছ আসবে সন্ধেবেলায় হাওড়ার বাজার থেকে। ঘণ্টাখানেক বোস।” তিনকড়ি নিশ্চিন্ত ভঙ্গিতে সিগারেটে টান দিয়ে বলল।
”পারব না রে, এক ঘণ্টা বসতে পারব না। সকালের কোনও মাছ পড়েটড়ে নেই।”
”কাটা রুই আছে, সাতশো গ্রামের মতো, চলবে? তা হলে দিতে পারি।”
”চলবে চলবে, মুড়োটা আছে তো?”
”আছে, ল্যাজাটাও আছে। গাদা আর পেটি বিক্রি হয়ে গেছে।”
তিনকড়ি বাড়ি থেকে বাজারে এল। প্রতাপ ছোট একটা থলি কিনে নিল। কঠোর বাক্সে বরফ চাপা দেওয়া পলিথিনে মোড়া মাছ বের করে তিনকড়ি প্রতাপের থলিতে ঢুকিয়ে দিল।
”কত দাম বল।”
”দিতে হবে না। আমার ছেলেটাকে বরং দুধঘাট ইস্কুলে ভর্তি করিয়ে দিস। তোর তো চেনা আছে হেডমাস্টারের সঙ্গে।”
”আছে, ভর্তি করিয়ে দোব।”
প্রতাপ প্রায় ছুটে গিয়ে বাইকে চড়ে বসল। আধঘণ্টা কাবার হয়ে গেছে। দিলুর মা যদি এখনও থাকেন তা হলে ভালই নিজের চোখে দেখে যাবেন ছেলে সত্যি মাছ ধরতে গেছল আর ধরেও ছিল একটা কিলো দুয়েকের রুই। অত বড় মাছ খাবার লোক বাড়িতে নেই, তাই সে আধখানা বন্ধুর বাড়িতে দিয়ে এসেছে। প্রতাপ মনে মনে একটা গল্প বানিয়ে ফেলল। তার মনে হল মোটামুটি এটা বিশ্বাসযোগ্যই হবে। তবে একটা মুশকিল, মাছের টুকরোগুলো বরফে ঠান্ডা হয়ে রয়েছে। দিলুর মা কি মাছে হাত দেবেন? প্রতাপের মনে খচখচানি ধরল।
নিমগাছতলায় ওরা দু’জন বসে অপেক্ষা করছে। হর্ষ হাত বাড়িয়ে আগে থলিটা নিয়ে ফাঁক করে দেখল।
”গোটা মাছ পেলুম না। কাটা ছিল তাই নিয়ে এলুম। একটা দু’ কিলোর রুই দিলু ধরেছিল, তার আধখানা বন্ধুর বাড়িতে দিয়ে এসেছে, ওদের ছিপ ওদের পুকুর, দিলু তো দিতেই পারে, পারে না?” প্রতাপ তার গল্পটা অনুমোদন পেতে দেখল হর্ষর মুখভাবে।
”খুব ভাল বলেছেন। আমি তাই বলব।”
ওরা বাড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করল। প্রতাপ ব্যস্ত হয়ে ডাকল, ”এই যে এই যে, মাছটা কিন্তু ঠাণ্ডা, বরফে ছিল সকাল থেকে।”
”সে আমি ঠিক করে নোব। দূর থেকে মলুদিকে দেখাব এমনভাবে যে, আর হাতই ছোঁয়াবে না।”
প্রতাপ বাইকে চড়ে ফেরার সময় গেট দিয়ে ভেতরে তাকিয়ে দেখল একটা মোটরগাড়ি দাঁড়িয়ে। সে আশ্বস্ত হল, দিলুর মা এখনও ফিরে যাননি।
