প্রতাপ মিয়োনো স্বরে বলল, ”জনা পঞ্চাশেক হবে। বাইশটা প্লেয়ার, তিন—চারজন রিজার্ভ, দুটো করে স্কোরার আর আম্পায়ার, মালীটালি, ঝালমুড়ি, চা—ওলা আর ক্লাব অফিশিয়াল। তবে সবাই খেলা দেখছিল না।”
”খবরের কাগজের লোক?” পঞ্চানন জানতে চাইলেন।
”একজনও না, এসব ম্যাচে ওঁরা আসেন না সেটা একদিক দিয়ে ভালই হয়েছে।” প্রতাপ হেসে পঞ্চাননের দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ল। ”মৌলালি অন্ধকারে থাকবে।”
মৌলালি অন্ধকারে থাকলেও বাংলার জুনিয়ার নির্বাচক কমিটির চেয়ারম্যান আশিস ঘোষ তার যাদবপুরের বাড়িতে সকালে চা খেতে খেতে টেবল থেকে নতুন বেরোনো কাগজ ‘প্রভাতী’ তুলে নিয়ে প্রথমেই খেলার পাতা খুলে চোখ বোলাতে বোলাতে ঝুঁকে পড়ল একটা মোটা হেডিং দেখে: ”সি এ বি লিগে রান আউটের হ্যাটট্রিক।” তার নীচে পাতলা হেডিং : ”গ্রামের ছেলের অবিশ্বাস্য ফিল্ডিংয়ে ছয়জন আউট।” আশিস দ্রুত খবরটা পড়ে নিয়ে টেলিফোন নম্বরের ছোট নোটবইটা থেকে একটা নম্বর বের করে ডায়াল করল।
”কে প্রতাপ?…আমি আশিস বলছি, আজ কাগজে একটা খবর…কাগজটার নাম প্রভাতী, আমাদের এখান থেকে নতুন বেরিয়েছে…না অন্য কোনও বড় কাগজে তো চোখে পড়ল না দুলাল কর যা করেছে সে তো ফ্যান্টাস্টিক। বয়স কত?…পনেরো? ছেলেটাকে দেখতে হবে তো, তোদের পরের খেলা কবে, কার সঙ্গে? …শনিবার, ক্যালকাটা ইউনাটটেডের সঙ্গে ওদের মাঠে? দেখতে যাব।”
.
ইউনাইটেড মাঠ ভবানীপুর মাঠের তুলনায় অনেক ভাল। ফুটবল মরশুম ছাড়া বছরের বাকি সময় এই মাঠের ওপর দিয়ে লোক চলাচল না—করায় ঘাস সমানভাবে চারিয়ে রয়েছে, মাঠের জমিও সর্বত্র সমতল। তাঁবুর ফেন্সিংয়ের বাইরে লোহার চেয়ারে বসে প্রতাপ, আশিস ঘোষের অপেক্ষায়। ব্যাট করছে ইউনাইটেড। প্রথম তিনটি উইকেট পড়ল আট রানে, তিনজনই রান আউট এবং দিলুর ছোড়া বলে। একস্ট্রা কভার আর ডিপ পয়েন্টের মাঝামাঝি জায়গায় সে ফিল্ড করছে। ডান দিকে ও বাঁ দিকে প্রায় চল্লিশ মিটার জায়গা জুড়ে তার রাজত্ব বিস্তৃত।
তিনজনই দ্বিতীয় রান নেওয়ার সময় আউট হয় এবং বোলার প্রান্তে, আউট হওয়ার ধরন আগের ম্যাচের মতোই। ইউনাইটেড ব্যাটসম্যানরা একটাই ভুল করেছে, তারা দিলুকে বুঝে নিতে একটু দেরি করে ফেলেছে, যখন বুঝল অফের দিকে একটা বিপজ্জনক ফাঁদ তাদের বধ করার জন্য পাতা রয়েছে ততক্ষণে তিনজন ফাঁদে ধরা পড়ে গেছে।
প্রভাতীর সেই সাংবাদিকটি, যার নাম অলোকেন্দু, স্কোরারদের টেবলের পাশে একটা চেয়ার টেনে এনে বসে গেছে। সে খুবই খুশি, এখন পর্যন্ত অন্য কোনও কাগজের লোক মাঠে হাজির নেই। সম্পাদক উত্তরপল্লীর আগের ম্যাচের লেখাটার প্রশংসা করে তাকে বলেছেন, ”অন্য কোনও কাগজে তো খবরটা নেই, তুমি ছেলেটার সব খেলা কভার করবে। ভেরি পিকিউলার, শুধু ফিল্ডিংয়েই ছ’—ছ’টা উইকেট নিচ্ছে একজন। ম্যাচটা অবশ্য তুচ্ছ, ব্যাটসম্যানরাও নির্বোধ, কিন্তু ওর ডাইরেক্ট থ্রোগুলো তো সত্যি।”
চোখের সামনে তিনটে থ্রো সোজা উইকেটে লাগল। আরও পাঁচটা মেরেছে কিন্তু তাতে কেউ রান আউট হয়নি। অলোকেন্দু প্রতিটি থ্রোয়ের হিসেব রেখেছে—আট থ্রো, তিন আউট। সে তাঁবুর পাশের রাস্তা দিয়ে একটি লোককে হেঁটে যেতে দেখে মনে মনে আঁতকে উঠল, সর্বনাশ সত্যসন্ধি কাগজের শতদলদা, এখানে এসে পড়বে না তো। শতদল মাঠের দিকে তাকিয়ে হাঁটতে হাঁটতে অলোকেন্দুকে দেখে এগিয়ে এল।
”অলোকেন্দু এখানে কী করছ, মোহনবাগান মাঠে যাবে না? এখানে কারা খেলছে?”
অলোকেন্দু মনে মনে বলল, হে ভগবান এখন বল যেন দুলালের কাছে না যায়, ছুড়লেই তো উইকেটে মারবে। তাইতে শতদলদার যদি কৌতূহল জেগে ওঠে, আর এখানেই যদি বসে পড়ে।
”খেলছে উত্তরপল্লী আর ক্যালকাটা ইউনাইটেড। একটুখানি দেখেই মোহনবাগান মাঠে যাব, খেলা তো ইস্টার্নের সঙ্গে।”
”হ্যাঁ, এসো। আমি এগোলাম।”
অলোকেন্দু হাঁফ ছাড়ামাত্র দিলু লংঅফে উঁচু করে ওঠা বলে ক্যাচ ধরল প্রায় তিরিশ গজ ছুটে, গোলকিপারের মতো ঝাঁপিয়ে জমি থেকে চার আঙুল ওপরে। অ্যাপিলের চিৎকারে শতদল থমকে একবার মুখ ফিরিয়ে তাকিয়ে আবার হাঁটতে লাগল। অলোকেন্দু নোটবইয়ে হিসেব লিখল। হাত কাঁপছে। মনে মনে বলল, ভগবান আজ যেন সাতটা হয়, তা হলে চুটিয়ে লিখব। এক ইনিংসের ম্যাচে ওয়ার্ল্ড রেকর্ড বললে কি ভুল হবে? উইকেটকিপারের অনেক শিকার আছে এক ইনিংসে, কিন্তু ফিল্ডসম্যানের ক’টা আছে? দুলাল কর যদি আজ দশটা শিকার করে ফেলে। কেউ নেই, একজনও রিপোর্টার নেই, স্কুপ হয়ে যাবে।
অলোকেন্দু স্কুপ করল বটে তবে দিলুর শিকার—সংখ্যা ভগবান দশটার বদলে করে দিলেন আট। পাঁচ রান আউট, তিন ক্যাচ। মোট তেরোবার স্ট্যাম্পে বল লাগিয়েছে। ক্যালকাটা ইউনাইটেড পঁয়ষট্টি অল আউট। ফিল্ডাররা মাঠ থেকে ফিরছে। প্রতাপও চেয়ার ছেড়ে তাদের সঙ্গে তাঁবুতে ঢুকতে গিয়ে দেখল আশিস ঘোষ দাঁড়িয়ে। প্রতাপ বলল, ”এ কী এখানে দাঁড়িয়ে, কতক্ষণ এসেছিস? বাইরে বসলি না কেন?”
”ভাল করে দেখতে হলে লোকজন থেকে একটু তফাত হয়ে দেখতে হয়।”
”কেমন দেখলি?”
”প্রতাপ, এ ছেলেটা তো ভগবান রে!” আশিস দু’হাত বাড়িয়ে প্রতাপের হাত ধরল।” একাই তো শেষ করে দিল ইউনাইটেডকে। আমি ওর সবকটা রান আউট আর ক্যাচ এখানে দাঁড়িয়ে দেখেছি। যেখান—সেখান থেকে বল তুলে উইকেটে মারে, একটাও মিস করল না, এটা তো জন্মগত ক্ষমতা। না হলে হাজার প্র্যাকটিস করেও এ—জিনিস আয়ত্ত করা যায় না। ওকে চোখে চোখে রাখিস।”
