ছয় নম্বরে নামার জন্য দিলু প্যাড পরেছিল। উত্তরপল্লী চার উইকেটে একশো পঁয়ত্রিশ করায় তাকে আর মাঠে নামতে হয়নি। প্রতাপের মুখ থমথমে, উত্তেজনা চেপে রাখার চেষ্টায়। গতরাত থেকে সে সিঁটিয়ে ছিল, মনে মনে বলে গেছে ”ডোবাসনি দিলু ডোবাসনি।” সকাল সাতটার মধ্যে সে মোটরবাইকে দুধঘাটে পৌঁছে দেখে দিলু পুকুরে সাঁতার কাটছে। আশ্চর্য, ছেলেটার কোনও টেনশন নেই, এই সময়ে কি কেউ জলে ঝাঁপাঝাঁপি করতে পারে! আটটার সময় দাদুকে মামাকে মামিকে প্রণাম করে সে প্রতাপের পেছনে বাইকে চড়ে বসে। দু’জনের মধ্যে সারা পথে একটাও কথা হয়নি।
প্রতাপকে জনে জনে জিজ্ঞেস করল, ”ছেলেটিকে পেলে কোথায়?”
”গ্রাম থেকে কুড়িয়ে পেয়েছি।” সে নিস্পৃহ স্বরে জবাব দেয়।
”নাম দেখছি ডি কর, ডি—টা?”
”ডি হল দুলাল।”
”গ্রামের নামটি কী?”
”ছোট হুড়া, ওখানে একটা স্কুলে আমি কোচ করি, দুলু সেই স্কুলে পড়ে।” প্রতাপ হুঁশিয়ার হয়ে বলল। দুধঘাট নামটা যেন চাউর না হয়ে যায়। কোনওভাবে যদি মৌলালির বাড়িতে কথাটা পৌঁছয়, ডি কর নামের একটা ছেলে দুধঘাটে থাকে সে ময়দানে তার প্রথম ম্যাচেই ফিল্ডিং—এ তাক লাগিয়ে দিয়েছে, তা হলে সন্দেহ আর কৌতূহল জাগবেই, ডি কর দিলু নয় তো? প্রতাপ তাই গ্রামের নামটা বদলে দিল।
ভবানীপুর মাঠের লাগোয়াই ক্রীড়া সাংবাদিকদের ক্লাবের তাঁবু। সব কাগজের লোক সেখানে বিকেলে জড়ো হয়। ময়দানে ছড়ানো মাঠগুলোয় যত খেলা হয়েছে তার স্কোরবুক নিয়ে ক্লাবের লোকেরা তাঁবুতে এসে সাংবাদিকদের জানায়। অবশ্য জনপ্রিয় বড় ক্লাবের লোকেরা আসে না, সাংবাদিকরাই তাদের ক্লাবে যায় রেজাল্ট নিতে। উত্তরপল্লীর স্কোরার ছেলেটি খাতা নিয়ে ক্রীড়া সাংবাদিকদের তাঁবুতে গেল। সে মুখচোরা, বুদ্ধিটাও কম। সে স্কোরবুকটা খুলে কথায় ব্যস্ত এক সাংবাদিকের সামনে এগিয়ে ধরল।
”দেখার সময় নেই, সেঞ্চুরি হয়েছে কি না বলো।”
”না।”
”হ্যাটট্রিক হয়েছে?”
”না।”
”ঠিক আছে, রেজাল্টটা বলো।”
”ইয়াং ফ্রেন্ডস একশো তেত্রিশ, উত্তরপল্লী সঙ্ঘ চার উইকেটে একশো পঁয়ত্রিশ তুলে ছ’ ছইকেটে জিতেছে।”
”আর কিছু হয়েছে?”
”উত্তরপল্লীর একটা ছেলে দারুণ ফিল্ড করেছে। দুটো ক্যাচ চারটে রান আউট—”
”ঠিক আছে। মোহনবাগান—ইস্টবেঙ্গলে খেলুক তখন রান আউট ক্যাচট্যাচ লেখা যাবে।”
স্কোরবুক বগলে নিয়ে ছেলেটি তাঁবু থেকে বেরোচ্ছে তখন একজন তাকে পেছন থেকে ডাকল, ”শুনুন।”
সে ফিরে তাকিয়ে দেখল শীর্ণ, চশমাপরা একটি অল্পবয়সী ছেলে, পায়ে চটি, তার দিকে জ্বলজ্বলে চোখে তাকিয়ে চলল, ”তখন কী যেন কানুদাকে বলছিলেন—চারটে রান আউট দুটো ক্যাচ, একজনই কি করেছে?”
”তবে না তো বললুম কেন?”
”দেখি স্কোরবইটা?” এই বলে সে স্কোরবইটা বগল থেকে টেনে নিয়ে পাতা ওলটাল, স্কোর দেখতে দেখতে কপালে ভাঁজ তুলে বলল, ”এটা কী লেখা, কীসের হ্যাটট্রিক?”
”রান আউটের। পরপর তিন বলে তিনজনকে ডাইরেক্ট থ্রোয়ে উইকেট মেরে আউট করেছে, এমন ঘটনার কথা শুনেছেন কখনও?”
সেই নবীন সাংবাদিক এধার—ওধার তাকিয়ে স্কোরারকে তাঁবুর গেটের বাইরে টেনে আনল। স্কোরবই থেকে দরকারি তথ্য নোটবইয়ে টুকে নিয়ে ডি কর সম্পর্কে কিছু প্রশ্ন করল।
”আপনার কোন কাগজ?”
”প্রভাতী, নিশ্চয় নাম শোনেননি, যাদবপুর থেকে নতুন বেরিয়েছে। আচ্ছা ছোট হুড়াটা কোথায় বলুন তো?”
”জানি না। বারুইপুর কি শ্রীরামপুরের দিকে হবে।”
”আচ্ছা এই দুলাল আগে কোন ক্লাবে খেলেছে?”
”জানি না।”
ধর্মতলায় মোটরবাইক থেকে নেমে প্রতাপ ওষুধের দোকান থেকে কয়েকটা ক্যাপসুল কিনল। দিলুর হাতে দিয়ে বলল, ”এখনই একটা খেয়ে নাও, রাতে একটা খেও। আর কাল সারাদিনে তিনটে খাবে, ব্যথা কমে যাবে।”
প্রতাপ একটা সফট ড্রিঙ্কসের বোতল কিনে দিলুর হাতে দিয়ে বলল, ”এখানকার জল খুব খারাপ, এই দিয়ে ক্যাপসুলটা গিলে খাও।”
সন্ধ্যা উতরে গেল দুধঘাটে ওদের পৌঁছতে। বাড়ির সবাই অধীর হয়ে অপেক্ষা করছিলেন। সুলেখারই চোখ প্রথম পড়ল দিলুর নাকে।
”কী হল নাকে? বেশ ফুলে রয়েছে দেখছি।”
”কিছু না, একটা বল লেগেছে।” দিলু তাচ্ছিল্যভরে বলল। ”এখন ঠিক হয়ে গেছে। ওষুধ খেয়ে নিয়েছি।”
”প্রতাপ হল কী? খেলল কেমন?” হরিসাধন উৎকণ্ঠিত হয়ে জানতে চাইলেন।
মুখে গাম্ভীর্য আর স্বরে ব্যক্তিত্ব ফুটিয়ে প্রতাপ বলল, ”চারটে রান আউট দুটো ক্যাচ, ভাবা যায়। আপনার ভাগ্নে যে কী জিনিস লোকে এইবার জানবে। ফিল্ডিং কাকে বলে আজ তা দেখাল। কত সহজে পটাপট উইকেটে মারল, ক্লাবের ছেলেরা তো থ বনে গেছে। মেসোমশাই আমি বলেছিলুম না আউট অব দিস ওয়ার্ল্ড, ওর ফিল্ডিং পৃথিবীর বাইরের ব্যাপার। ভাল মাঠ পেলে দিলু আজ দেখিয়ে দিত ফিল্ডিং কোথায় নিয়ে যাওয়া যায়, ছ’জন আউট ওর হাতে। একটা বোলার ছ’টা উইকেট পেলে তাকে নিয়ে নাচানাচি শুরু হয়ে যাবে। দিলু শুধু ফিল্ডিংয়ের জোরেই দেখবেন কত ওপরে ওঠে।”
হরিসাধন ব্যস্ত হয়ে বললেন, ”ওর সামনে এত প্রশংসা কোরো না প্রতাপ, মাথা ঘুরে যাবে।”
পঞ্চানন বললেন, ”ঠিক কথা। তবে প্রশংসা অনেক সময় উৎসাহ বাড়িয়ে উজ্জীবিত করে তোলে, এটাও মনে রেখো। দাদু তা হলে তুমি আজ খেল দেখিয়েছ, কত লোক দেখল?”
