রক্ত ঝরছে তার নাক দিয়ে। রুমাল চেপে তাকে টেন্টে আনা হল। নাক ফুলে উঠেছে, সামান্য একটু কেটেছে। ”প্রথম ম্যাচে প্রথমবার বল ধরতে গিয়েই এমন অমুঙ্গুলে কাণ্ড!” প্রতাপকে বিচলিত দেখাল।
ডাক্তার খোঁজা হল, পাওয়া গেল না। ডেটল দিয়ে ধুয়ে প্লাস্টার লাগিয়ে দিলুকে একটা চেয়ারে বসিয়ে রাখা হল। একজন বরফ আনতে ছুটল। এক ঘণ্টা খেলার পর জলপান বিরতি। ইয়ং ফ্রেন্ডসের তখন বিনা উইকেটে চুয়াত্তর রান। ওপেনার দু’জন মারার বল প্রচুর পেয়েছে। এতক্ষণ রুমালে মোড়া বরফের টুকরো দিলু নাকে চেপে ধরে বসে ছিল। এবার প্রতাপের কাছে গিয়ে সে বলল, ”আমি নামব, ঠিক হয়ে গেছি।”
”গুড, ভেরি গুড, এই তো চাই।” প্রতাপকে খুবই উৎসাহী দেখাল। ”যাও, নেমে পড়ো।”
দিলু ছুটতে ছুটতে মাঠে গিয়ে বলল, ”আমি ফিট। সনৎদা এবার আমায় কভারে ফিল্ড করতে দিন।”
সাবস্টিটিউট মাঠ ছেড়ে ফিরে গেল। দিলু আম্পায়ারকে জানাল সে আবার খেলতে নেমেছে। সনৎ তাকে কভারেই রাখল। শুরু হল খেলা। ব্যাটসম্যান প্রথম বলটাই ড্রাইভ করল একস্ট্রা কভারে, কলকাতার মাঠে দুটো রান তো নেওয়া যায়ই। দিলুর ডান দিকে দশ মিটার দূর দিয়ে বল যাবে, সে তাড়া করল। চাঁদোয়ার নীচে স্কোরারের পাশের চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল প্রতাপ, অস্ফুটে সে স্কোরারকে বলল, ”এবার একটা রান আউট দেখ।”
বলটা ছোঁ মেরে তুলে একই সঙ্গে সে বোলারের উইকেটে ছুড়ল। ওরা দ্বিতীয় রানটা নিচ্ছিল। বোলারের প্রান্তে যাচ্ছিল যে, পপিং ক্রিজের দু’মিটার আগে সে হতাশ হয়ে দেখল উইকেট ভেঙে গেল, বেলদুটো ছিটকে পড়ল তিন—চার হাত দূরে। ফিল্ডাররা ছুটে গেল দিলুর দিকে। অচেনা নতুন বাচ্চচা ছেলে তাই সবাই পিঠ চাপড়াল, নয়তো ওকে জড়িয়ে ধরত। এক উইকেটে পঁচাত্তর রান। তিন নম্বর ব্যাটসম্যান গার্ড নেওয়ার পর আধমিনিট ফিল্ডারদের অবস্থান দেখে স্টান্স নিল।
প্রথম বলটা সে মিড অফে পুশ করে সাত—আট পা এগিয়ে গেল, দিলুকে বলের দিকে ছুটে যেতে দেখে থেমে গেল। ঘুরে ক্রিজে ফিরতে লাগল অলস ভাবে হেঁটে। তার ভাবখানা, একটা রান তো ছিলই, নন—স্ট্রাইকার কেন যে বেরোল না। এর পরই সে হতভম্ব হয়ে চোখের সামনে দেখল তার অফস্টাম্পকে ডিগবাজি খেতে। তাড়াতাড়ি সে ক্রিজের ওপারে ব্যাট রাখল। উইকেটকিপার আর দু’জন স্লিপ ফিল্ডার চিৎকার করে অ্যাপিল করতেই স্কোয়ার লেগ আম্পায়ার আঙুল তুললেন। অবিশ্বাস্য রান আউট। ফিল্ডাররা ছুটে গিয়ে দিলুর কাঁধ ধরে ঝাঁকাল। একজন তো গলা জড়িয়ে ধরল। একজন বলল, ”মিরাকুলাস।”
ইয়াং ফ্রেন্ডসের দুই উইকেটে পঁচাত্তর। পরপর দু’বলে দুটো উইকেট পড়ে গেল এবং সে দুটো কোনও বোলার পায়নি।
এক নম্বর ব্যাটসম্যান এখনও ক্রিজে, এল চার নম্বর। সনৎ তাকে ঘিরে দিল তিনজন ফিল্ডার দিয়ে। দিলুকে আনল সিলি পয়েন্টে। ব্যাটসম্যান আড়চোখে তাকে দেখল, চোখে সন্দেহ আর ভয়, উঁচু করে দেওয়া অফস্পিন বল, ব্যাটসম্যান দু’পা বেরিয়ে পিচের কাছে পা বাড়িয়ে ঝুঁকে কপিবুক রক্ষণাত্মক খেলল। ব্যাটের কানায় লেগে বলটা ঘুরে গেল সিলি পয়েন্টে। ঝোঁকানো শরীর তোলার সময় নেই দেখে সে দ্রুত ডান পাটা জমিতে ঘষড়ে ক্রিজের দিকে ঠেলে দিল কিন্তু দাগের ওপারে পৌঁছল না এবং ততক্ষণে অফস্টাম্পে লাগা বল ছিটকে প্রথম স্লিপের পায়ের কাছে। সে—ই প্রথম ছুটে গিয়ে দিলুকে বুকে জড়িয়ে জমি থেকে এক ফুট তুলে ধরল।
”হ্যাটট্রিক হ্যাটট্রিক,” চাঁদোয়ার নীচে দু’হাত তুলে নাচছে প্রতাপ। ”ফিল্ডারের হ্যাটট্রিক শুনেছে কেউ কখনও, তিনটেই ডাইরেক্ট থ্রো থেকে, কারও সাহায্য ছাড়াই।” এর পর স্কোরারকে ধমকে বলল, ”হাঁ করে আমার দিকে তাকিয়ে না থেকে তিনটে রান আউটের পাশে লেখো ডাইরেক্ট থ্রো বাই ডি কর।”
ইয়াং ফ্রেন্ডসের রান তিন উইকেটে পঁচাত্তর। এর পর দু’জন ব্যাটসম্যানের কেউই আর রান নিতে ভরসা পেল না, যেদিকে দিলু রয়েছে। কভারে দিলুকে রেখে সনৎ বোলারদের নির্দেশ দিল অফস্টাম্পের বাইরের দিকে বল করতে। তারা সেইভাবেই বল করে যেতে লাগল। ব্যাটসম্যানরা যা মারে সবই মিড অফে বা কভারে যাচ্ছে। দিলুকে ছুটে যেতে দেখলেই তারা রান নিতে আর দৌড়য় না। শেষে বেপরোয়া হয়ে এক নম্বর ব্যাটসম্যান অফ স্টাম্পের বাইরের একটা ওভারপিচ বল ঘুরিয়ে মিড উইকেটে মারল, ব্যাটে ঠিকমতো বলটা না—লাগায় ক্যাচ উঠে গেল কভারে, দিলু সহজেই ধরে নিল। ইয়াং ফ্রেন্ডস চার উইকেটে আশি।
দশ রান যোগ হওয়ার পর আর একটি উইকেট পড়ল। বোল্ড। পরের ব্যাটসম্যান, দিলু—ভীতি কাটাবার জন্য তুলে ছয়—চার মেরে তিরিশটা রান করল এগারো বলে। শেষ পর্যন্ত সে স্টাম্পড হল। ছয় উইকেটে একশো কুড়ি। আট নম্বর ব্যাটসম্যান এসে দ্বিতীয় বলটা ঠেলল পয়েন্টে দিলুর পাশ দিয়ে, বল কুড়োতে সে ছুটল প্রায় পঁচিশ মিটার, ব্যাটসম্যান সেইদিকে তাকিয়ে, এর পরই সে আবিষ্কার করল নন—স্ট্রাইকার তার পাশে উত্তেজিত স্বরে বলছে, ”ছোট ছোট।” স্ট্রাইকার বলল, ”এখন আর ছুটে কী হবে।” দিলুর ছোড়া বল ধরে বোলার ততক্ষণে বেল ফেলে দিয়েছে। ”বলটা কে চেজ করছে আগে সেটা দেখবি তো।” বলতে বলতে সে মাঠ ছাড়ল।
সাত নম্বর ব্যাটসম্যান এখনও রয়ে গেছে এবং ইনিংসের শেষ পর্যন্ত নট—আউট রয়ে গেল ছত্রিশ বলে ছয় রান করে। শেষ তিন ব্যাটসম্যান একটি লেগবাই বাউন্ডারি সহ তোলে আট রান। এগারো নম্বরের ক্যাচ দিলু নেয় ব্যাকোয়ার্ড পয়েন্টে। ইয়াং ফ্রেন্ডস এক উইকেটে ছিল পঁচাত্তর রানে, সেখান থেকে অল আউট একশো তেত্রিশে, দিলু মাঠে ফিরে আসার পর দশটা উইকেট পড়ে আটান্ন রানে।
