বোলার বল করল শর্ট পিচ অফ স্টাপের এক হাত বাইরে। দিলু স্কোয়ার কাট করতে গিয়ে ফসকাল।
”কেন ফসকালে? এমন বলেই তো ব্যাটসম্যানের আহ্লাদ হয়। তুমি পা একদম না নড়িয়ে একই জায়গায় রেখে ব্যাটটা চালিয়েছে। এই দ্যাখো।” এই বলে প্রতাপ দিলুর হাত থেকে ব্যাটটা নিয়ে দেখাল সে কীভাবে ব্যাট চালিয়েছিল। তারপর দেখাল শটটা নেওয়ার সময় ডান পা কোথায় নিয়ে যাবে। ”টিভিতে দেখো টেন্ডুলকর কীভাবে মারে।”
দিলু আবার স্টান্স নিয়ে দাঁড়াল, এবারের বলটা মন দিয়ে লক্ষ করে বুঝল হাফভলি আসছে সোজা তার সামনে। ছয় মারবে কি? মুহূর্তে বিচার বদলে ফেলে সে প্রতাপদার কথামতো ড্রাইভ করল। ঘাসের ডগা ঘষড়ে বিদ্যুৎগতিতে বোলারের বাড়ানো ডান হাতের পাশ দিয়ে বল বেরিয়ে গেল। প্রতাপ হাততালি দিয়ে বলল, ”দ্যাটস ইট।”
আরও কয়েকটা ড্রাইভ করল দিলু, বল উঠল না জমি থেকে। প্রতাপ বলল, ”অনেক তো শট নিলে, ক্রিকেটে শট না নেওয়ারও খেলা দরকার পড়লে খেলতে হয়। এবার তুমি দশটা বল ডিফেন্স করো। এগিয়ে বা পিছিয়ে এমনভাবে বল থামাও যেন ব্যাট লেগে বল সেখানেই পড়ে গাছ থেকে খসে পড়া আপেলের মতো।”
প্রতাপ তিনটি ছেলেকে দিলুর দু’পাশে তিন মিটার দূরে দাঁড় করিয়ে দু’জন অফ স্পিনারকে বল করতে দিল। প্রথম বলটা অফ থেকে একটা ঘুরে এল যে, দিলু একই জায়গায় দাঁড়িয়ে ব্যাট সামনে বাড়িয়ে দিল। ব্যাটে লেগে বল শর্ট লেগের হাতে গেল। সে ফ্যালফ্যাল চোখে প্রতাপের দিকে তাকিয়ে রইল।
”ফুটওয়ার্ক কোথায়? যেখানে পিচ পড়ল পা বাড়িয়ে সেখানেই তো বলটা ব্যাট দিয়ে থাবড়ে দিতে পারতে। আবার বলছি ফুটওয়ার্ক ছাড়া ব্যাট করা যায় না। এতকাল শুধু ছয় মেরে গেছ এটা ব্যাটিং নয়, এবার ব্যাট করাটা শেখো।”
দিলু দশটা বল খেলল তাতে দু’বার ব্যাটের কানায় লাগল, দু’ বার লাগল প্যাডে, একটা ফসকাল, বাকিগুলো ঠিকঠাক আটকাল। বাসু নেটের বাইরে দাঁড়িয়ে খেলা দেখছিল। দিলু যখন পরের ব্যাটসম্যানকে দেওয়ার জন্য প্যাড খুলছে বাসু ডাকল, ”দুলু।” দিলু তখন মুখ নামিয়ে একহাঁটু মুড়ে অন্য প্যাড খোলায় ব্যস্ত, বাসুর দিকে তাকাল না। বাসু এবার একটু জোরে ডাকল, ”অ্যাই দুলাল।” দিলু মুখ তুলে তাকিয়ে কপালে কুঁচকে বলল, ”আমাকে বলছ?” তারপর হো হো করে হেসে উঠল। ”তাই তো ভুলেই গেছলুম আমি দুলাল কর।”
ভবানীপুর মাঠে উত্তরপল্লীর প্রথম লিগ খেলা ইয়াং ফ্রেন্ডসের সঙ্গে। উত্তরপল্লীর ক্যাপ্টেন সনৎ দত্ত যে প্লেয়ার্স লিস্ট আম্পায়ারকে দিলে তাতে এগারো নম্বরে লেখা ডি কর। নতুন ছেলে, বয়স কম, কারও সঙ্গে কথা বলছে না, টেন্টের বাইরে একা চুপচাপ। শুধু প্রতাপ লাহিড়ি ওর সঙ্গে বার দুয়েক কথা বলে সনৎকে ডেকে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বলল, ”সনৎ একে একটু দেখিস, ময়দানে প্রথম ম্যাচ খেলতে নামছে।”
সনৎ স্মিত হেসে দিলুর কাঁধ ধরে ছোট্ট একটা ঝাঁকুনি দিয়ে বলল, ”নার্ভাস লাগছে?”
দিলু মাথা নেড়ে বলল, ”না।”
”আগে কোন ক্লাবে খেলেছ?”
”বিজয়ী সঙ্ঘ।”
সনৎ চোখ কুঁচকে প্রতাপের দিকে তাকাল। প্রতাপ তাড়াতাড়ি বলল, ”মৌলালির অ্যালবার্ট স্কোয়্যারের ক্লাব, খুবই ছোট ক্লাব।”
সনতের খেলোয়াড়—জীবনে এটাই প্রথম ঘটনা তার দলের এগারোজনের সবাইকেই সে চেনে না। এগারো নম্বরের ডি কর ব্যাট করে না বল করে তাইই সে জানে না। গতরাতে সেক্রেটারি প্রতাপ লাহিড়ি বাড়িতে ফোন করে বলেছিল, ”সনৎ একটা নতুন ছেলেকে কাল খেলাব। স্কুলে পড়ে। দেখা যাক টিকতে পারে কি না, পারলে মনে হয় অনেকদূর যাবে, একটু গাইড করিস।”
নতুন ছেলে সম্পর্কে সনৎ তখন কিছু জিজ্ঞেস করেনি। এরকম নতুন ছেলে প্রতিবছরই দু—তিনজন আসে, একটা দুটো ম্যাচ খেলিয়ে বসিয়ে দেওয়া হয়, এই ছেলেটাও হয়তো সেই রকম একটা দুটো ম্যাচের জন্য এসেছে। প্লেয়াস লিস্টে নামগুলো লিখে দিয়েছে প্রতাপ। ডি কর নামটা এগারো নম্বরে। দেখেই সনৎ ধরে নেয় বোলার।
”কী বল করো?” সনৎ জিজ্ঞেস করল। দিলু তাকাল প্রতাপের দিকে।
”দুলাল বোলার নয়।” প্রতাপ স্বর নামিয়ে বলল। সনৎকে জিজ্ঞাসু চোখে তাকিয়ে দেখে সে যোগ করল, ”সাত নম্বরে ব্যাট করবে।”
টস হল। জিতেছে ইয়াং ফ্রেন্ডস, তারা প্রথম ব্যাট করবে। মাঠে নামল সনতের সঙ্গে দশজন। ধর্মতলায় মাঠটা শহিদ মিনারের ধারেই বাসস্ট্যান্ডের লাগোয়া, আশেপাশে খাবারের দোকান, লোকজনের ভিড় লেগেই আছে। মাঠের আউটফিল্ডের বহু জায়গায় ঘাস নেই, যেখানে আছে ঘাস সেখানে বড় বড়। জমি অসমান, কাগজ, ফলের খোসা, ভাঁড়ের টুকরো, শালপাতা ইতস্তত ছড়িয়ে। দুধঘাটের মাঠ পলকের জন্য দিলুর চোখে ভেসে উঠল আর তখনই সনৎ তাকে আঙুল দিয়ে লং লেগের দিকটা দেখিয়ে বলল, ”ওখানে।”
যে ওপেন করল সে প্রথম তিনটি বল অফস্টাম্পের অনেকটা বাইরে দেখে ছেড়ে দিল। চতুর্থ বল মিড অফে ঠেলে দিয়ে একটা রান নিল। এবার বল পড়ল শর্ট পিচ, ব্যাটসম্যান সপাটে ঘুরিয়ে বাট চালাল। দিলু দেখল বল তার দিকেই আসছে। ফিল্ড করার সময় বলের জন্য সে অপেক্ষা করে না, তা করলে ব্যাটসম্যান রান নেওয়ার সময় পেয়ে যায়। তাই সে বলের দিকে ছুটে গিয়ে সময় কমিয়ে দেয়। এখনও সে তাই করল। বলটা ডান হাতে কুড়িয়েই ছুড়বে বলে সে নিচু হয়েছে আর তখনই অপ্রত্যাশিত জমির একটা উঁচু জায়গায় ঠোক্কর খেয়ে বলটা লাফিয়ে তার নাক আর কপালের মাঝে লাগল।
