”তুমি কি এই সিজনেই দিলুকে মাঠে নামাতে চাও?”
”পারলে তাই নামাব, কিন্তু যে বাধার কথা বললেন তাতে তো হিতে বিপরীত হয়ে যেতে পারে। কী যে মুশকিল হল!” প্রতাপের গলা নেতিয়ে পড়ল।
”দেখি একটু ভেবে, তুমি বিকেল পর্যন্ত আছ তো, একবার ঘুরে যেও।”
প্রতাপ চলে যাওয়ার পর পঞ্চানন দোতলায় এলেন। দিলু টেবলে ঘাড় নিচু করে লিখে চলেছে, বাসুও লেখায় ব্যস্ত। ওরা মুখ তুলে তাকাল না। পঞ্চানন রেলিং ধরে পুকুরের দিকে তাকিয়ে রইলেন। মনে মনে ভেবে যাচ্ছেন দিলুর খেলার জন্য কী করতে পারেন।
”এভাবে দাঁড়িয়ে কী ভাবছ দাদু?”
দিলুর প্রশ্নে চমকে উঠে পঞ্চানন ফিরে তাকালেন। বই খাতা বন্ধ করে দিলু উঠে দাঁড়াল। বাসুও লেখা বন্ধ করল।
”হয়ে গেছে তোমাদের?”
বাসু ঘাড় নাড়ল। পঞ্চানন বললেন, ”বিকেলে খাতা দেখে দোব, এখন থাক।”
”মনে হচ্ছে আপনি খুব চিন্তায় পড়ে গেছেন।” ভ্রূ কুঁচকে বাসু বলল।
”তা একটু পড়ে গেছি।” এই বলে পঞ্চানন প্রতাপের সঙ্গে তাঁর যা কথাবার্তা হয়েছে ওদের বললেন। শুনে দিলুর মুখ অন্ধকার হয়ে গেল। বাসু চুপ করে রইল।
একতলা থেকে হর্ষর গলা শোনা গেল ”অ দিলু—বাসু তোরা নাইতে যাবি না?” রবিবার দুপুরে বাসু এই বাড়িতে ভাত খায়। ওরা গামছা নিয়ে তেল মাখতে মাখতে পুকুরঘাটের দিকে যাচ্ছে, হঠাৎ বাসু দাঁড়িয়ে পড়ে বলল, ”দিলু একটা কাজ করলে হয় না, তোমার নামটা যদি বদলে দেওয়া যায়?”
অবাক হয়ে দিলু তাকিয়ে রইল, ”সে কী! নাম বদলাব?”
”হ্যাঁ বদলাবে। তা হলে কাগজে নাম বেরোলেও বাড়ির কেউ ধরতে পারবে না।”
”য্যাহহ, এভাবে কি খেলা যায়! খেলবে একজন আর নাম হবে আর একজনের।”
”নামটা শুধু বদলে নেওয়া, তাতে অসুবিধের কী আছে। কত লোকই তো ছদ্মনাম নেয়। এই তো যে অভিধানটা দাদুর ঘরে রয়েছে, চলন্তিকা, ওটা লিখেছেন রাজশেখর বসু, আবার উনিই গল্প লিখেছেন পরশুরাম নামে। দুটো নাম নেওয়া অনেক লোকই আছে তুমিও নয় থাকবে, তাতে অসুবিধে কী, বরং সুবিধের কথাটা ভাবো।”
বাসুর কথায় দিলু দ্বিধায় পড়ে গেল। মন থেকে বাসুর যুক্তি সে মানতে পারছে না, আবার খেলার সুযোগ তৈরি করার জন্য এই চালাকিটাও তার মন্দ লাগছে না। তাকে দোনামনার মধ্যে থাকতে দেখে বাসু বলল, ”আসল ব্যাপার তো ধরা না পড়ে খেলে যাওয়া, তুমি তো চুরি—ডাকাতি করার জন্য নাম বদলাচ্ছ না, বদলাচ্ছ একটা ভাল উদ্দেশ্যেই। যখন নাম হয়ে যাবে, দেখবে তোমার বাবা—মা কিছু বলবেন না। বরং গর্ব করে বললেন, দিলু আমাদের ছেলে, আমাদের মুখ উজ্জ্বল করেছে।”
বাসুর কথা শুনতে শুনতে চকচক করে উঠল দিলুর চোখ। সে মনের চোখে নিজেকে দেখতে পেল ইডেনের মাঠ থেকে ক্লাব হাউসের ড্রেসিংরুমে ফিরছে, হাততালি দিতে দিতে পেছনে আসছে শচীন, সৌরভ, রাহুল। লোকে দাঁড়িয়ে উঠে হাততালি দিচ্ছে, দিলু, দিলু নাম ধরে সারা স্টেডিয়াম থেকে চিৎকার ভেসে আসছে, ততদিনে লোকে অবশ্য জেনে গেছে তার আসল নামটা। নকল থেকে আসল নামে ফেরাটা কী আর এমন শক্ত ব্যাপার!
”দিলু, মানুষ বাঁচার জন্য অনেক সময় অন্য নাম নেয়, তোমার খেলাকে বাঁচাবার জন্য একটা কোনও নাম নিলে তাতে মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে না।” কথাটা বলেই বাসুর কী যেন মনে পড়ে গেল, বলল, ”জানো তো পাণ্ডবরাও অজ্ঞাতবাসের সময় বিরাটরাজের বাড়িতে এক—একজন ছদ্মনাম নিয়ে থেকেছিলেন। ওরা নিতে পারলে তুমিই বা পারবে না কেন?”
”ঠিক আছে, নোব।” বলেই দিলু দু’হাত বাড়িয়ে জলে ঝাঁপ দিয়ে হাত পাড়ি দিতে শুরু করল।
বিকেলে প্রতাপ এল। পঞ্চানন বারান্দা থেকে তাকে দোতলায় উঠে আসতে বললেন।
”ভেবে দেখলেন?” প্রতাপ দোতলায় উঠেই বলল।
”দেখেছি। তবে আমি নয়, বাসু।” পঞ্চানন হাসিমুখে বললেন। বাসু খেয়েদেয়ে দুপুরেই ছোট হুড়ায় ফিরে গেছে। ”ছেলেটার সত্যিই মাথা আছে।”
পঞ্চাননের মুখ দেখে প্রতাপ আশান্বিত হল। ”ব্যাপার কী বলুন তো! মনে হচ্ছে রাস্তা বের করে ফেলেছেন।”
”দিলুর নামটা বদলাতে হবে। কাগজে নাম বেরোলেও বাড়ির লোক ধরতে পারবে না। শুধু দেখতে হবে ছবি যেন না বেরোয়।”
প্রতাপ চোখ বুজে রইল কয়েক সেকেন্ড। চোখ খুলল বিশাল একটা হাসি মুখে মাখিয়ে। ”ছবি নিয়ে আপনাকে চিন্তা করতে হবে না মেসোমশাই। লোকাল ক্রিকেটের ছবি খবরের কাগজে কখনও বেরোয় না।”
.
উত্তরপল্লী সঙ্ঘ বরানগরের ক্লাব, সেখানে একটা ছোট মাঠে তাদের নেট প্র্যাকটিস হয়। দিলু প্র্যাকটিস করে দুধঘাট স্কুলের মাঠে। প্রতিদিন স্কুল ছুটির পরই মাঠে নেমে পড়ে ফিল্ডিং ঝালিয়ে নিতে। তারপর নেটে ব্যাটিং।
”ও কী ও কী, ড্রাইভ করলে কিন্তু বলটা উঠে গেল কেন? শর্ট একস্ট্রা কভার তো বুকের কাছে ক্যাচটা পেয়ে যাবে। আগের বলটাতেও দেখলাম এই ব্যাপার হল, লং অফে পল্লব ক্যাচটা নিল। অল অ্যালং দ্য কার্পেট বল যাবে এমনভাবে ড্রাইভ করো। মারার সময় মুখ উঠে যাচ্ছে, বডি থেকে ব্যাট দূরে থাকছে। পিচের কাছে পা পৌঁছচ্ছে না বলে।”
দিলু মুখ নামিয়ে প্রতাপের কথাগুলো শুনল। ব্যাট হাতে ক্রিজে আবার স্টান্স নিয়ে বলল, ”ঠিক আছে।” মনে মনে স্মরণ করল প্রতাপদার কথাগুলো: মাথা নড়বে না, স্থির রাখবে, সামনের পা বলের পিচের কাছে নিয়ে যাবে, মাথা একটু নামাবে। এর পর যদি শট কভারে দিকে মারতে চাও তা হলে বাঁ কাঁধটা সেই মুখো করে শরীরের ভর সামনের পায়ে আনবে। ফলো থ্রুটা হবে সোজা যেদিকে বল মেরেছ।
