”বাসু তো খেলে না, আমি কি খেলা বন্ধ করে দোব?”
”একদম নয়। বাসু একধরনের, তুমি আর—এক ধরনের। ওর মনের ডিসিপ্লিনটা তুমি লক্ষ করবে, ওটা তোমার খেলাতেও লাগবে। গল্প শুনেছি গাওস্করের এই ডিসিপ্লিনটা ছিল, বিশ্বব্রহ্মাণ্ড ভুলে গিয়ে শুধু বলটাকেই দেখত। এই দেখাটাকে রোজ অভ্যাস করতে হয়, তুমি কখনও তা করোনি।”
দিলু চুপ করে রইল। পঞ্চানন আর কথা বাড়ালেন না, তিনি চাইলেন দিলু ভাবুক। লেখাপড়ায় পিছিয়ে থাকাটা ওর আত্মসম্মান বোধকে আঘাত করেছে, এটাই ভাল লক্ষণ।
পঞ্চানন ভোরে ঘুম থেকে ওঠেন। বারান্দায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করেন সূর্য ওঠার, সূর্যকে প্রণাম করে দিনের কাজ শুরু করেন। সেদিনও অন্ধকার থাকতে থাকতে উঠে বারান্দায় এলেন। রেলিং ধরে পুকুরের দিকে তাকিয়ে রইলেন। বাতাস এই সময় স্তব্ধ থাকে। পাখিদের ডাক ছাড়া প্রকৃতিতে কোনও সাড় নেই। নিজের মধ্যে মগ্ন হওয়ার এটাই ঠিক সময়। পঞ্চানন মগ্ন হয়ে গেলেন।
”দাদু।”
পঞ্চানন চমকে তাকালেন প্রায়ান্ধকার বারান্দার অপর প্রান্তে। চেয়ারে দিলু বসে, পঞ্চানন কাছে এলেন, ”দাদু তুমি! এখনও তো ভোর হয়নি।”
”শুধুই পাখির চোখ দেখার জন্য অর্জুন কী করেছিলেন সেটাই খুঁজছি। গাওস্কর বিশ্বব্রহ্মাণ্ড ভুলে যায় কী করে সেটা আমায় জানতে হবে।”
”খোঁজে, জানো। এটা তোমাকে নিজে—নিজেই করতে হবে।” পঞ্চানন ঝুঁকে দিলুর কানের কাছে মুখ এনে বললেন, ”দাদু তুমি পারবে, তুমি আমার সেরা নাতি হবে।”
কয়েকদিন পর রবিবার সকালে মোটরবাইকে প্রতাপ এসে হাজির। দিলু তখন দোতলার বারান্দায় টেবলে বাসুর মুখোমুখি বসে ‘আধুনিক যুগ’ বিষয়ে ছোট ছোট দশটি প্রশ্নের উত্তর তৈরি করার জন্য ইতিহাসের বই পড়ে যাচ্ছে। বাসুকে লিখতে হচ্ছে রচনা। ক্লাসে বাংলার সার যেসব পয়েন্ট বলে দিয়েছেন খাতা থেকে সেগুলো দেখে সে ‘সংবাদপত্রের প্রয়োজনীয়তা’ সম্পর্কে লিখছে। পঞ্চানন একতলায় ছেলের বসার ঘরে তাকে খোঁজাখুজি করছেন বই। মোটরবাইকের শব্দ শুনে বেরিয়ে এলেন।
”মেসোমশাই দিলু আজ প্র্যাকটিসে যায়নি, কী ব্যাপার?”
”স্কুলে টাস্ক দিয়েছে তাই করছে।”
”ওকে একবার কলকাতা যেতে হবে সি এ বি—তে নামটা রেজেস্ট্রি করাতে, আমিই নিয়ে যাব।”
”কবে?”
”কাল কি পরশু।”
”প্রতাপ একটা কথা মনে রেখো, ওর বাবা—মা কিন্তু খেলার ঘোর বিরোধী। যদি জানতে পারে কলকাতার মাঠে খেলছে তা হলে আমাদের মুখ আর দর্শন করবে না মলু। আমি এই নিয়ে খুবই চিন্তার মধ্যে আছি।”
শুনে প্রতাপও চিন্তায় পড়ে গেল। সে বলল, ”তা হলে কি আপনি পিছিয়ে যাচ্ছেন? দিলুকে কি কলকাতায় খেলতে দেবেন না?”
”না, না, তা বলছি না। তবে এমন একটা কিছু ভাবো যাতে ওর বাড়ির লোকেরা যেন জানতে না পারে। পড়া নিয়ে এখন ও খুব খাটছে, মোটামুটি ধরে ফেলেছে। এখন ওর মানসিক উৎসাহটা চাই আর সেটা পাবে ওর সবচেয়ে প্রিয় জিনিসটা থেকে।”
”তা হলে তো ওকে মাঠে যেতে হবে।”
পঞ্চানন শঙ্কিত স্বরে বললেন, ”হবে, কিন্তু লুকিয়ে। যদি দিলু চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে, আমার ধারণা করবেই, তা হলে তো খবরের কাগজ ঝাঁপিয়ে পড়বে।”
”নিশ্চিত থাকুন মেসোমশাই, ময়দানে আমাদের খেলায় কোনও রিপোর্টার আসে না, সাধারণ পাবলিক তো আসেই না। প্লেয়ারদের আত্মীয় কি বন্ধুবান্ধব দু—চারজন হয়তো খেলা দেখে, আমরা তো মোহনবাগান—ইস্টবেঙ্গল নই। খবরের কাগজ দিলুর কথা জানবেই না।” প্রতাপকে নিশ্চিন্ত দেখাল।
পঞ্চানন অবাক হয়ে বললেন, ”বলছ কী, খবরের কাগজে না বেরোলে দিলুর ট্যালেন্টের কথা দেশের লোক জানবে কী করে? ওটাই তো আসল ব্যাপার। দিলুকে তো বাংলার ক্রিকেট কর্তাদের চোখে পড়তে হবে, নইলে ও উঠবে কী করে?”
”এ তো মহা সমস্যায় পড়া গেল। কাগজে নাম বেরোনো চাই অথচ বাড়ির লোক জানবে না, তা কী করে হয় মেসোমশাই। বাড়ির লোকেরা মুখ্যু তো নয়, খবরের কাগজ পড়বেই, খেলা পছন্দ করে না বলে হয়তো খেলার পাতা পড়বে না কিন্তু পাড়ার লোকজন কি বন্ধুবান্ধবদের কাছ থেকে শুনে ফেলতে তো পারে।”
”তা তো পারেই, আর তা হলেই সর্বনাশটা হয়ে যাবে। তুমি এ বছরটা বাদ দাও প্রতাপ, পড়াশুনোয় একটু ভাল রেজাল্ট করলে ওর বাপ—মাকে তখন বুঝিয়ে সুঝিয়ে নরম করতে পারব।”
প্রতাপ হতাশ হয়ে বলল, ”একটা বছর নষ্ট হবে। ভেবেছিলুম পনেরো বছরেই ওকে ফার্স্ট ক্লাস ম্যাচ খেলাব।”
”অত কম বয়সে এদেশে কেউ খেলেছে নাকি?” পঞ্চানন কৌতূহলী হয়ে উঠলেন।
”বলেন কী? পাঞ্জাবের ধ্রুব পাণ্ডভ! কী ট্যালেন্টেড ব্যাটসম্যান যে ছিল। দিল্লি থেকে ট্যাক্সিতে পাটিয়ালায় বাড়ি ফেরার পথে অ্যাক্সিডেন্টে মারা গেল এই তো ক’বছর আগে বিরানব্বুই সালে। ছেলেটা তো পনেরো বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই রঞ্জি ট্রফিতে সেঞ্চুরি করেছিল।”
”আমি তো জানতুম শচীন টেন্ডুলকর সবচেয়ে বাচ্চচা বয়সে রঞ্জি ট্রফিতে সেঞ্চুরি করে।”
”না মেসোমশাই, ধ্রুব পাণ্ডভ মারা না গেলে ওর কথাই মনে রাখতেন, শচীন সেঞ্চুরি করে সাড়ে পনেরো বছর বয়সে। পাণ্ডভের আর একটা রেকর্ড, সবচেয়ে কম বয়সে এক মরশুমে হাজার রান ও—ই করেছে আঠারো বছর তখনও পূর্ণ হয়নি। রেকর্ড ছিল শচীনেরই। লক্ষ করে দেখবেন যারা বড় হয় তারা মাথাচাড়া দেয় পনেরো ষোলো সতেরো বছর বয়সেই। দিলুর কিন্তু এক্সপোজারটা এখনই হওয়া দরকার। পুজোর পরই নেট পড়বে তখন নজর দিতে হবে ওর ব্যাটিংয়ে। অন্তত চল্লিশ—পঞ্চাশটা রান করার মতো না হলে শুধু ফিল্ডিং দিয়ে কতটা আর এগোবে।”
