”জেঠু দিয়ে গেলুম তোমার ফেল—করা নাতিকে। ” প্রণাম করে মল্লিকার এটাই প্রথম কথা, ”এবার পাশ করিয়ে দাও দেখি।”
পঞ্চানন একগাল হেসে দিলুর দিকে তাকিয়ে চোখ বন্ধ করে বললেন, ”এবার থেকে দু’বেলা শুধু পড়া, পড়া আর পড়া।”
”নিশ্চয়। বি—এ—টা পাশ না করলে লোকে বলবে কী! স্কুলের মাঠে দেখলুম খুউব খেলা চলছে, বোকাদা বলল গোলাপের চাষ করে বেঞ্চি সারাবার টাকা তুলবে ওই মাঠ থেকে। তুলুক, তুলুক।”
”আমাকেও বোকা বলেছে। আমি বললুম খুব ভাল কথা, টাকা তো আসবেই। তা ছাড়া সামনে গোলাপ বাগান থাকলে স্কুলটাও কত সুন্দর দেখাবে। বোকার মাথায় বুদ্ধি আছে।” পঞ্চানন মিটিমিটি হাসতে লাগলেন।
”নীচে যাই, বউদি তো রান্নাঘরে ঢুকল, কী রাঁধছে দেখি গিয়ে। বউদির এই এক বাতিক, কাউকে পেলেই ধরে বেঁধে খাওয়াবে।” মল্লিকা বলতে বলতে সিঁড়ির দিকে এগোলেন।
”পরশু নারকেল পাড়িয়েছি। যাওয়ার সময় চন্দ্রপুলি নিয়ে যাবি কিন্তু।”
মা সিঁড়ি দিয়ে অদৃশ্য হওয়ামাত্র দিলু উৎকণ্ঠিত স্বরে বলল, ”দাদু, স্কুলের মাঠে গোলাপের চাষ, কী ব্যাপার?”
মাছি তাড়াবার মতো নাকের সামনে হাত নেড়ে পঞ্চানন বললেন, ”রাখ তো গোলাপ, ধানচাষ হবে বলেনি এটাই স্কুলের ভাগ্যি।”
কথার অর্থ বুঝতে পেরে দিলুর মুখ নিঃশব্দ হাসিতে ভরে গেল। গেঞ্জিটা খুলে জিনসের প্যান্ট খুলল। জাঙিয়া পরা অবস্থায় সিঁড়ির দিকে এগোচ্ছে তখন পঞ্চানন বললেন, ”যাচ্ছ কোথায়?”
”পুকুরে। মাকে দেখাব সাঁতরে ওপার পর্যন্ত যেতে পারি। আমাদের বাড়িতে কেউ সাঁতার জানে না, খুব অবাক হয়ে যাবে।”
”খবরদার নয়। সাঁতারও খেলার মধ্যে পড়ে। মা দেখলে এখুনি গাড়িতে তুলে কলকাতায় ফিরিয়ে নিয়ে যাবে। সাঁতার টাতার সব কাল থেকে।”
সন্ত্রস্ত দিলু প্যান্ট পরে নিল চটপট।
”দাদু, বোকামামাও তা হলে মিথ্যে কথা বলে।”
”শুধু বোকামামা? যুধিষ্ঠির পর্যন্ত বলেছিলেন। বোকাকে তো একবার নরক দর্শন করতেই হবে।”
হরিসাধন ক্লাস এইটেই ভর্তি করালেন দিলুকে। ইচ্ছে করলে ক্লাস নাইনেও করাতে পারতেন। কিন্তু তা করালেন না একটা কারণে, আর সেটা শুধু বাবাকেই তিনি বলেছিলেন। ”দিলুর যা বিদ্যের বহর তাতে ওকে ক্লাস সিক্সে ভর্তি করালে ঠিক হত। ওর আত্মসম্মানে আঘাত লাগবে বলে সেটা আর করলুম না। কী করে যে এইট পর্যন্ত উঠল, ভেবে পাচ্ছি না। তবে ক্লাস নাইনে উঠতে হলে ওকে আদাজল খেয়ে প্রথম থেকেই লাগতে হবে, বাবা তুমি একটু কড়া হও।”
প্রথম দিন বাসু ক্লাস ঘরের বাইরে দিলুর জন্য অপেক্ষা করে থেকেছিল, ওকে সঙ্গে নিয়ে বাসু ক্লাসে ঢোকে, দু’জনে পাশাপাশি বসে। দিলুকে ইতিমধ্যেই অনেক ছেলে চিনে ফেলেছে তার অবিশ্বাস্য ফিল্ডিং ক্ষমতার গল্প শুনে। সে যে একদিন নামকরা ক্রিকেটার হবে এমন একটা ধারণা স্কুলের ছাত্রদের মধ্যে চাউর হয়ে গেছে ইতিমধ্যেই। ফলে সবারই নজর তার ওপর। এটা তাকে অস্বস্তিতে ফেলে দিল। শিক্ষকরা ক্লাসে তার প্রতি একটু বেশি মনোযোগী, কারণ দিলীপ হরিসাধনবাবুর ভাগ্নে, এটা তাকে বিপদে ফেলে দিয়েছে।
প্রতি সারই পড়াতে পড়াতে তার দিকে তাকিয়ে বলবেন, ”বুঝতে পেরেছ? না পারলে জিজ্ঞেস করো, বারবার করো যতক্ষণ না মাথায় ঢুকছে।” দিলু ঘাড় নেড়ে জানায় সে বুঝেছে। কিন্তু আসলে সে বিন্দুবিসর্গও বোঝেনি। আর সেটা বুঝতে পারে তার পাশে বসা বাসু। সে ফিসফিস করে দিলুকে বলে, ”ঘাড় নাড়লে যে কিছুই তো বোঝনি, সারকে জিজ্ঞেস করো।” জিজ্ঞেস করতে হলে বিষয়টি সম্পর্কে কিছুটা জানা থাকা চাই, তাও সে ভাল করে জানে না। কলকাতার স্কুলে তার এই ঝামেলা ছিল না। সাররা জানতেন তাকে জিজ্ঞেস করে লাভ নেই। শুধুই সময় নষ্ট, তাই কেউ তার দিকে দৃকপাতও করতেন না।
অন্ধকার ঘরে পঞ্চাননের পাশে রাত্রে চিত হয়ে শুয়ে সে ফিসফিস করে বলল, ”দাদু জেগে আছ?”
”আছি, কিছু বলবে?”
”হ্যাঁ। আমার খুব অসুবিধে হচ্ছে স্কুলে। সারেরা যা পড়ান আমি বুঝতে পারি না।”
”কেন পারো না সেটা কি ভেবে দেখেছ?”
”হ্যাঁ। পড়ায় আমি মন দিতে পারি না। সবসময় শুনি আমার মাথা নেই মাথা নেই, আমার দ্বারা লেখা পড়া হবে না, আমি মুখ্যু হয়ে থাকব। আচ্ছা দাদা, কী করলে পড়াশুনোয় ভাল হওয়া যায়, তুমি জানো?”
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে পঞ্চানন বললেন, ”জানি।”
”জানো?” দিলু পাশ ফিরে দাদুর মুখোমুখি হল।
”বল ধরে উইকেটে ছোড়ার সময় গোটা মাঠটা চোখের নজরে থাকে না, শুধু তিনটে স্টাম্প নজরে থাকে?”
”শুধু তিনটে স্টাম্প ছাড়া আর কিছু দেখি না। অন্য কিছু তখন দেখতে গেলে বলটা এধার—ওধার হয়ে যাবে।”
”অর্জুন পাখির চোখ ছাড়া আর কিছুই দেখেননি, গল্পটা তো জানো।”
”জানি।”
”রোজ যেমন ফিল্ডিং প্র্যাকটিস করো তেমন রোজ দু’বেলা পড়া নিয়ে বসবে আর বোলারের হাত থেকে বেরিয়ে আসা বলটা সারা মনপ্রাণ দিয়ে যেভাবে বুঝতে চেষ্টা করো ঠিক সেইভাবে পড়ায় মনপ্রাণ আটকে দেবে, বুঝতে চেষ্টা করবে পড়াটা, তা হলেই পারবে।”
”বলছ পারব?” বালিশ থেকে দিলুর মাথা উঠে গেল।
”নিশ্চয় পারবে। পড়াশুনো ব্যাপারটা একদমই শক্ত জিনিস নয়। বাসুকে দেখো না, যখন পড়ে কি লেখে তখন ওর কানের পাশে অ্যাটম বোমা ফাটলেও শুনতে পাবে না।”
