”তা হলে?” প্রতাপ ঝুঁকে আশার আলো দেখতে পাওয়ার মতো চোখে তাকিয়ে রইল।
”তা হলে আর কী!” পঞ্চাননের স্বর বদলে গেল, কঠিন ভঙ্গিতে সোজা হয়ে বসলেন, ”দিলু যদি এখানে থাকে তা হলে আমার ইচ্ছানুযায়ী তাকে পড়াব, শেখাব। এটা ওর বাবা—মাকে মানতে হবে।”
”তা হলে দিলুর খেলা বন্ধ হচ্ছে না।” প্রতাপ নিশ্চিত স্বরে বলল।
পঞ্চানন জবাব না দিয়ে মুখ ফিরিয়ে পুকুরের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
চারদিন পর রবিবার দুপুরে বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার জন্য হরিসাধন দিলুকে নিয়ে বাইগাছি স্টেশনে সাইকেল ভ্যানরিকশা থেকে নামলেন। নেমেই দিলু বলল, ”বোকামামা, তোমার বিশ্ববিখ্যাত জিনিসটা আর একবার চেখে দেখতে ইচ্ছে করছে।”
দারুণ খুশি হলেন হরিসাধন, ”নিশ্চয় হবে। তার আগে পদসেবা, এই হাওয়াই চটি পরে বাড়িতে গেলে তোর মা বলবে দাদাটা কিপ্টে হয়ে গেছে, একজোড়া ভাল চটিও ভাগ্নেকে কিনে দিলে না। আগে চটি, তারপর ছানার জিলিপি।”
দু’জনে পদসেবায় ঢুকল। সেই সেলসম্যানটি একা দোকানে বসে, ওদের দেখেই চিনতে পেরে হেসে বলল, ”বুড়ো আঙুলের নখটা ঠিক হয়ে গেছে?”
হরিসাধন বললেন, ”এখন একদম নতুন নখ। এবার বের করো তো সেই চটি জোড়া, প্রথম যেটা দেখিয়েছিলে।”
ছেলেটি বাক্স আনল। দিলু চটি পরে হাঁটল। হরিসাধন দেড়শো টাকা গুনে দিয়ে বললেন, ”হাওয়াইটা বাক্সে ভরে নে।”
এর পর তারা এল যশোহর মিষ্টান্ন ভাণ্ডারে। যে টেবিলটায় ওরা বসে ছিল সেটাতেই বসল। একটা ছেলে টেবলে এসে দাঁড়াল। হরিসাধন জিজ্ঞেস করলেন, ”ক’টা বলব?” দিলু আঙুল দিয়ে ‘ভি’ দেখাল, ”হরিসাধন ছেলেটিকে বললেন, ”দুটো করে দাও।”
দিলু মোট তিনবার ‘ভি’ দেখায়। বোনের জন্য কুড়িটা ছানার জিলিপি দড়িবাঁধা হাঁড়িতে হাতে ঝুলিয়ে হরিসাধন টিকিট কেটে প্ল্যাটফর্মে এসে দাঁড়াবার দশ মিনিটের মধ্যেই ট্রেন এসে গেল।
ট্রেনে হরিসাধন একবার জিজ্ঞেস করলেন, ”দিলু, আবার কবে আসবি?”
”শিগগিরই আসব, তবে এবার আসব থাকার জন্য। নীচের ক্লাসের ছেলেদের সঙ্গে বসা আমার দ্বারা হবে না।” এই বলে সে পায়ের পাতা উঁচু করে নতুন চটি ঘুরিয়ে—ফিরিয়ে দেখতে লাগল।
.
হরিসাধনের সামনে গরম ফুলকো লুচি আর বেগুনভাজার প্লেট টেবলে রেখে মল্লিকা বললেন, ”বোকাদা একটা লোক এসেছিল, নাম বলল প্রতাপ লাহিড়ি, চেনো নাকি?”
”চিনি।” আহার্য বিষয় সামনে থাকলে হরিসাধনের কথাবার্তা সংক্ষিপ্ত হয়ে যায়।
”কী করে বলো তো? এই ক’দিন আগে হঠাৎ এসে বলল, দিলুকে মামার বাড়িতে রেখে পড়ান। আমি তো অবাক, গায়ে পড়ে পরামর্শ দিতে এসেছে, ব্যাপার কী! বলল, তোমার স্কুলে নাকি খেলার ব্যবস্থা খুব ভাল, দিলুর মতো ফিল্ডার এখন পৃথিবীতে নেই, এইসব হাবিজাবি আমাকে বোঝাতে চাইছিল। আমি পরিষ্কার বলে দিয়েছি আগে পড়া, তারপর খেলা। দুধঘাটে যদি যায় তো লেখাপড়াই করতে যাবে, খেলতে নয়।”
”প্রতাপ এইসব বলেছে নাকি?”
”বলেছে ওর ক্লাবে দিলুকে খেলাবে। স্কুলে পড়া ছেলে ক্লাস না করে মাঠে গিয়ে খেলবে?”
”দূর দূর, যেতে দেবই না।” বেগুনভাজা লুচি দিয়ে মুড়তে মুড়তে হরিসাধন উত্তর দিয়ে মুখের মধ্যে ঢুকিয়ে দিলেন। মলুকে প্রতাপ কী বলেছে তা তিনি জানেন না। কিন্তু এটা বুঝে গেছেন প্রতাপের কথায় মলু বিগড়ে গেছে। ওকে খুশি করা দরকার।
”দারুণ লুচি, তোর করা?”
”নয় তো কে করবে, রাঁধুনি তো আসবে সন্ধেবেলায়।”
”আরও দুটো দে।” হরিসাধন আড়চোখে বোনের মুখটা দেখে নিলেন। কাজ হয়েছে।
মল্লিকা গোটাছয়েক লুচি আর গরম বেগুনভাজা নিয়ে এল। ততক্ষণে হরিসাধন কী বলবেন ভেবে নিয়েছেন। তিনি জানেন মল্লিকা স্কুলের এখনকার অবস্থা দেখেনি।
”মলু আমি ভাবছি স্কুলের মাঠটায় গোলাপ চাষ করব। স্কুলের বেঞ্চিগুলো ভেঙে ঝরঝর করছে। গভর্নমেন্ট টাকা দিতে পারে না। সারাবার খরচ তোলা যাবে গোলাপ ফুল বেচে। আগে খেলা না আগে ক্লাসে বসে পড়া?”
”আগে পড়া তো বটেই। তোমার স্কুলের অত ভাল রেজাল্ট, ভাল করে বসে পড়া না শুনলে রেজাল্ট কি ভাল থাকবে! তুমি খেলার মাঠ তুলে দিয়ে গোলাপ চাষই করো।”
”তুই তা হলে দিলুকে পাঠিয়েই দে।” বেগুন ভাজা ঠাণ্ডা হয়েছে কিনা আঙুল ছুঁইয়ে দেখে হরিসাধন কাজ শুরু করে দিলেন।
”কিন্তু দাদা, প্রতাপ যে বলল—”
”ও কিছু নয় কিছু নয়, ভাগিয়ে দোব। ক্লাবে খেলবে কী এইটুকু ছেলে!”
মল্লিকা প্লেটে চারটে সন্দেশ আনলেন।
”পারব না রে পারব না, ছ’টা ছানার জিলিপি খেয়ে ট্রেনে উঠেছি। হরিসাধন কাতর চোখে তাকালেন। পরেরবার এসে খাব। তরুণ কখন ফিরবে?”
”দশটার আগে তো নয়ই, তাসের আড্ডায় বসলে ওর বাড়ির কথা মনে থাকে না। পরশু দিলুর রেজাল্ট বেরোবে, কী হবে সে তো সবার জানাই আছে। বংশে এই প্রথম একটা মুখ্যু ছেলে হল, মুখ দেখানো দায় হবে।”
খাওয়া শেষ করে হাত ধুয়ে হরিসাধন বললেন, ”চলি রে।”
”সামনের রোববারই ওকে দুধঘাটে পৌঁছে দিয়ে আসব।”
সবার যা জানা, দিলু সেটাকে অজানা হতে না দিয়ে পরীক্ষায় ফেল করল। একটা বড় সুটকেস এবং দিলুকে সঙ্গে নিয়ে পরের রবিবার সকালে মল্লিকা মোটরে রওনা হলেন দুধঘাটের উদ্দেশ্যে। তাসের আড্ডা ফেলে তাঁর স্বামী সঙ্গে যেতে রাজি হননি। জাতীয় সড়ক থেকে পিচের সরু ভাঙাচোরা একটা রাস্তা চলে গেছে দুধঘাটের দিকে। সেই রাস্তার ওপরে দুধঘাট স্কুল। মল্লিকার নির্দেশমতো ড্রাইভার গাড়ি চালিয়ে যখন স্কুলবাড়ির সামনে দিয়ে যাচ্ছে তখন স্কুলের মাঠে খেলার মেলা বসে গেছে। শিউরে উঠে মল্লিকা দেখলেন ক্রিকেট ব্যাট দিয়ে একটি ছেলে বলটা আকাশের দিকে তুলে মারল। দুটো ছেলে ছুটল ক্যাচ ধরতে। মল্লিকা আড়চোখে পাশেবসা ছেলের দিকে তাকালেন, দিলু তখন অন্য জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে।
